শ্রীলার জন্ম ও বেড়ে ওঠা শান্তিনিকেতনে। সুতরাং ব্রাহ্মসমাজের সঙ্গে তাঁর নাড়ির যোগ। ব্রাহ্মণ পরিবারে বড়ো হওয়াতে ছোটোবেলা থেকে ব্রহ্মোপাসনার সঙ্গে তাঁর পরিচয়। সে-যুগের শান্তিনিকেতনের ভাবগম্ভীর পরিবেশ তাঁকে ব্রাহ্ম আদর্শে আরো অনুপ্রাণিত করেছিল। শ্রীলার শাশুড়ি প্রতিভা চট্টোপাধ্যায় নিজে উপাসনা করতেন ও উপাসনা লিখে রাখতেন। 

Add Asianetnews Bangla as a Preferred SourcegooglePreferred

শ্রীলা চ্যাটার্জি ও অমিতাভ রক্ষিত একটি দারুণ কাজ করেছেন। প্রবাসে অর্থাৎ বিশদভাবে দেখতে গেলে বিদেশে অনেক ব্রাহ্ম বিশেষ বিশেষ সামাজিক অনুষ্ঠানে ব্রাহ্ম পদ্ধতি হাতড়ে বেড়ান। আজকাল কসমোপলিটন যুগে বিভিন্ন সংস্কৃতির মেলবন্ধন একটি নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার— বিভিন্ন ধর্মাবলম্বী মানুষজন পরিণয় সূত্রে আবদ্ধ হচ্ছেন। এইসব ক্ষেত্রে ব্রাহ্মমতে শ্রাদ্ধ, নামকরণ, বিবাহ ইত্যাদি অনুষ্ঠান করার কোনও পদ্ধতি বা ম্যানুয়াল ছিল না। একমাত্র উল্লেখযোগ্য সূত্র ছিল সীতানাথ তত্ত্বভূষণ-এর— ম্যানুয়েল অফ ব্রাহ্ম রিচুয়ালস অ্যান্ড ডিভোশনস। এখানেই শ্রীলা চ্যাটার্জী ও অমিতাভ রক্ষিতের কাজ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য— তাঁরা সর্বসাধারণের হাতে একটি সর্বাঙ্গীণ পদ্ধতি বা কম্প্রিহেন্সিভ তুলে দিয়েছেন। 


এই বইটির মুখবন্ধ লিখেছেন প্রবীণ আশ্রমিক সোমেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর লেখনী এই গ্রন্থটিকে বিশেষভাবে আলোকিত করেছে। এই ব্রহ্মোপাসনা যে-শান্তিনিকেতনের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িয়ে আছে— সেই দিকটি ওনার লেখার মধ্যে সুন্দরভাবে উঠে এসেছে। 
এই বইটির মধ্যে বিশেষ প্রাপ্তি হল ক্ষিতিশ রায়ের করা অনুবাদগুলি। রবীন্দ্রনাথের ব্রাহ্মসমাজের সার্থকতার অসাধারণ অনুবাদটি সেই পরিচয় দেয়। ওঁনার করা বেদগানগুলির ইংরাজি অনুবাদ এই বইটির সম্পদ। তাছাড়াও একদা ইন্দিরা দেবী ও সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুরের করা দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের কিছু উপদেশের ইংরেজি অনুবাদ যা এই বইটিতে আছে তা বিশেষ উল্লেখযোগ্য। শর্মিলা রায় প্রমো দীর্ঘদিন ব্রহ্মসংগীত নিয়ে গবেষণা করছেন। তার উজ্জ্বল প্রতিফলন হল তাঁর রচিত ব্রহ্মসংগীত অধ্যায়টি। 


যে-কোনো ম্যানুয়াল সার্থক হয় যখন সেখানে ব্যবহারকারীদের জন্য পর্যাপ্ত উদাহরণ থাকে। এই গ্রন্থে বিভিন্ন অনুষ্ঠানের জন্য বিভিন্ন সময়ে ব্যবহৃত পদ্ধতি এখানে স্থান পেয়েছে। এইরকম একটি অনুষ্ঠান করতে গেলে এই উদাহরণগুলি নিঃসন্দেহে গ্রন্থ ব্যবহারকারীদের সাহায্য করবে। আরও একটি বিষয়ে লেখকদ্বয়দের জন্য সাধুবাদ প্রাপ্য— শুধু গ্রাম্য পদ্ধতিতে আবদ্ধ না-থেকে এঁনারা শ্রীমতী গৌরী ধর্মপালের করা বৈদিক-বিবাহ পদ্ধতিটি এই গ্রন্থের অন্তর্ভুক্ত করেছেন। সকলের জন্য এই অমূল্য রত্নকে তুলে দেওয়ার জন্য রোহিনী ধর্মপালকে আমাদের অসংখ্য ধন্যবাদ। 


ব্রাহ্ম আন্দোলন ভারতবর্ষকে বিশেষভাবে পরিস্ফুট করেছে যা আজও প্রাসঙ্গিক— সেটি হল ভিন্ন ধর্মের মধ্যে সমন্বয়। এই সমন্বয় বার্তার সঙ্গে সাযুজ্য রেখে এই গ্রন্থে বিভিন্ন ধর্মের দার্শনিক নির্যাস— শ্লোকসংগ্রহ, এই পুস্তকের অমূল্য সম্পদ। 
প্রথম দর্শনে যা এই পুস্তকটি বিশেষভাবে আকর্ষণ করে তা হল তার উপস্থাপনা। ভালো কাগজ ও উৎকৃষ্ট বাঁধাই এই বইটিকে বিশেষভাবে আকর্ষণীয় করে তোলে। প্রকাশক সম্বুদ্ধ সান্যালের এর জন্য অসংখ্য সাধুবাদ প্রাপ্য। 
এই গ্রন্থে বর্তমান সময়ের বেশ কিছু আচার্যদেব মন্দিরে প্রদত্ত ভাষণের সংকলন আছে। এই উপদেশগুলি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। দেবেন্দ্রনাথকে নিয়ে যে-অধ্যায়টি আছে সেখানে দেবেন্দ্রনাথের ব্রাহ্মধর্ম গ্রহণ ও ব্রাহ্মধর্ম গ্রন্থ রচনায় কথা উল্লেখ থাকলে ভালো হতো। তবে ব্রাহ্মধর্ম নিয়ে বই লেখাতে একটি ব্যাপারে সতর্ক থাকা প্রুফ-দেখা বিশেষভাবে জরুরি; যেমন, ৪৪ পৃষ্ঠায় “ওঁ য একোহবর্ণো” মন্ত্রটির বেশ কিছু ছাপার ভুল আছে; আবার ১০২ পৃষ্ঠায় সেটি সঠিকভাবে মুদ্রিত আছে। কয়েকটি ব্রাহ্মসমাজের ঠিকানাতে ব্রাহ্ম সম্মিলন সমাজকে কলকাতা ব্রাহ্মসমাজ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়াও কয়েকটা ছোটোখাটো মুদ্রণ প্রমাদও আছে। তাছাড়াও ব্রাহ্ম আন্দোলনের আরেক দিকপাল পণ্ডিত শিবনাথ শাস্ত্রীকে নিয়ে একটি অধ্যায় থাকলে ভালো হতো।


ব্রাহ্মধর্মের রূপরেখামূলক তথ্যগুলি যে-দুই মলাটের মধ্যে সংকলিত করা হল— এই কাজ ভবিষ্যতের জন্য একটি দলিল হয়ে রইল। 
বইয়ের নাম: ব্রাহ্মসমাজ দর্শন চর্চা ও পালন
রচনা ও সম্পাদনায়: শ্রীলা চ্যাটার্জী ও অমিতাভ রক্ষিত 
প্রকাশনা: নালক পাবলিকেশন

সংকলনা- জয় ভদ্র, হাজার শতাব্দীর রূপকথা অথবা রাজনৈতিক বিষণ্ণতা-র মতো বইয়ের লেখক তিনি, নয়ের দশকের শেষ লগ্ন থেকে লেখালেখি শুরু। একটা সময় মূলত সাংবাদিকতার সঙ্গে সঙ্গে চালিয়ে গিয়েছিলেন সাহিত্যকর্ম। এই মুহূর্তে পুরোপুরি সাহিত্যেই মনোনিবেশ করেছেন। কবিতা, গল্প, উপন্যাস যেমন তাঁর অবাধ বিচরণ ক্ষেত্র তেমনি পুস্তক সমালোচনা এবং নাট্য-সমালোচক হিসাবেও সমাদৃত হয়েছেন।