Asianet News BanglaAsianet News Bangla

ঈশ্বরচন্দ্রকে নিয়ে কলকাতার এই বাড়িতেই প্রথমে উঠেছিলেন তাঁর বাবা, এরপর ঠিকানা বদলেছেন বারবার

  • ১৮২৮ সালে বাবার সঙ্গে বিদ্যাসাগর প্রথম কলকাতায় আসেন
  • ওই রাস্তার নাম দিগম্বর জৈন টেম্পল রোড
  • ঠাকুরদাস বাসা বদল করে চলে আসেন বউবাজারে
  • সেখনে তাদের ঠিকানা ছিল ১৫, হিদারাম ব্যানার্জি লেন
The untold facts about Vidyasagar in Kolkata and the story of change his address one after another TMB
Author
Kolkata, First Published Sep 26, 2020, 1:15 PM IST

বিদ্যাসাগর প্রথম কলকাতায় আসেন ১৮২৮ সালের নভেম্বর মাসে তাঁর বাবার সঙ্গে। সংস্কৃত কলেজে পড়বার সময় বিদ্যাসাগর, বাবা ঠাকুরদাস ও তাঁর অন্য ভাইদের সঙ্গে উত্তররাঢ়ী কায়স্থ জমিদার জগদুর্লভ সিংহ-র বড়বাজারের বাড়ি ১৩, দয়েহাটা স্ট্রিট; এখন ওই রাস্তার নাম দিগম্বর জৈন টেম্পল রোডে থাকতেন। এরপর ঠাকুরদাস বাসা বদল করে চলে আসেন বউবাজার অঞ্চলে। সেখনে তাদের ঠিকানা ছিল ১৫, হিদারাম ব্যানার্জি লেন। আসল নাম হৃদয়রাম বন্দ্যোপাধ্যায়। ওই গলিতে আনন্দ সেনের বাড়িতে  বিদ্যাসাগর ঠাকুরদাসও তাঁর অন্য ভাইদের সঙ্গে তিন বছর বাস করেছিলেন। এখানে বিদ্যাসাগরের কোনও স্মৃতি চিহ্ন খোঁজা বোকামি কারণ, সেই বাড়ির অনেকেই যেমন বিদ্যাসাগরের নাম শুনে অবাক হন, তেমনই হৃদয়রাম বন্দ্যোপাধ্যায়ের বর্তমান প্রজন্মও এখানে বিদ্যাসাগর তিন বছর ছিলেন শুনে আকাশ থেকে পড়েন। হৃদয়রাম বন্দ্যোপাধ্যায়ের একটি নয়, একাধিক বাড়ি ছিল। এখন সবই ভাগাভাগি হয়ে গিয়েছে। অনেকে বলেন ১৫ নম্বর বাড়িটা প্রেমচাঁদ বড়ালের বসতবাটী।

বছর তিন ১৫, হিদারাম ব্যানার্জি লেনের বাড়িতে থাকার পর ঠাকুরদাস আট টাকা ভাড়ায় ৫৪, হিদারাম ব্যানার্জি লেনের দু’কামরার বাসা নেন। এখানেই বিদ্যাসাগরের সঙ্গে হৃদয়রাম বন্দ্যোপাধ্যায়ের পৌত্র এবং ‘নববাবুবিলাস’ ‘নববিবিবিলাস’ খ্যাত ভবানীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের পুত্র রাজকৃষ্ণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের আলাপ হয়। রাজকৃষ্ণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের সুকিয়া স্ট্রিটের বাড়িতে বিদ্যাসাগর প্রায়ই বেড়াতে যেতেন। ১৮৫৬ এর ৭ ডিসেম্বর বিদ্যাসাগরের উদ্যোগে প্রথম বিবাহ হয় রাজকৃষ্ণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ১২, সুকিয়া স্ট্রিটের বাড়িতে। বিদ্যাসাগর নিজেও কিছুদিন এই বাড়িতে ছিলেন। ১২, সুকিয়া স্ট্রিটের বর্তমান ঠিকানা ৪৮এ, কৈলাস বসু স্ট্রিট। 

The untold facts about Vidyasagar in Kolkata and the story of change his address one after another TMB

১৮৪১ সালে সংস্কৃত কলেজের শিক্ষা শেষ করার পর, ২৯ ডিসেম্বর মাত্র একুশ বছর বয়সে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ বাংলা বিভাগের সেরেস্তাদার বা প্রধান পণ্ডিতের পদে নিযুক্ত হন। সেই সময় বিদ্যাসাগরের বেতন ছিল মাসে ৫০ টাকা। ইতিমধ্যে সংস্কৃত কলেজের রামমাণিক্য বিদ্যালঙ্কারের মৃত্যুতে একটি পদ খালি হলে, তিনি ১৮৪৬ খ্রিষ্টাব্দের ৬ এপ্রিল সংস্কৃত কলেজের সহকারী সম্পাদক হিসাবে যোগদান করেন। কিন্তু কলেজ পরিচালনার ব্যাপারে সেক্রেটারি রসময় দত্তের সঙ্গে মতান্তর হওয়ায় তিনি ১৮৪৭ খ্রিষ্টাব্দের ১৬ জুলাই তারিখে সংস্কৃত কলেজের সম্পাদকের পদ থেকে পদত্যাগ করেন। ওই বছরের ১ মার্চ পাঁচ হাজার টাকা জামিনে মাসিক ৮০ টাকা বেতনে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজে হেডরাইটার ও কোষাধ্যক্ষ পদে যোগদান করেন। ওই বছরেই তিনি স্থাপন করেন সংস্কৃত প্রেস ডিপজিটরি নামে একটি বইয়ের দোকান। 

এখান থেকেই তিনি প্রকাশ করেন হিন্দি  “বেতাল পচ্চিসী” অবলম্বনে রচিত বেতাল পঞ্চবিংশতি গ্রন্থ।  এটিই ছিল তাঁর লেখা প্রথম গ্রন্থ উপন্যাস। ১৮৪৯ সালে তিনি প্রকাশ করেন তাঁর লেখা জীবনচরিত নামক গ্রন্থ। তারপর ১৮৫১ সালের এপ্রিল মাসে প্রকাশ করেন বোধদয়।  সংস্কৃত কলেজের অধ্যক্ষ হওয়ার পর বিদ্যাসাগর কিছুদিন কলেজের একতলার একটি ঘরেই থাকতেন। ওখানে থাকাকালীন তিনি ঘরের সামনেই কোদাল দিয়ে মাটি কুপিয়ে কুস্তির আখড়া তৈরি করেছিলেন। রোজ ভোরে ঘুম থেকে উঠে তিনি সেখানে কুস্তি অভ্যাস করতেন নিঃসংকোচেই। সংস্কৃত কলেজের ওই ঘর ছেড়ে বিদ্যাসাগর একসময় বর্তমান কলেজ স্ট্রিট বাজারের কাছাকাছি একটি একতলা বাড়িতে থাকতেন। সেই বাড়িটির অস্তিত্ব বহুদিন নেই। তবে তখনও পর্যন্ত বউবাজারের ৫৪, হিদারাম ব্যানার্জি লেনের দু’কামরার বাসাটি ছিল। সেখানে তাঁর ভাইরা, আত্মীয়রা থাকতেন। মাঝে মধ্যে গ্রামের পরিচিত কেউ কলকাতায় কোনও কাজে এসেও থাকতেন।   

এরপর বিদ্যাসাগর কিছুদিনের জন্য বাসা নেন মেছুয়া বাজার স্ট্রিটের একটি একতলার বাড়িতে। তবে এই বাড়িটির সঠিক খোজ পাওয়া যায় নি। এখানে কিছুদিন বসবাসের পর বিদ্যাসাগর বাসা নেন ৬৩, আমার্হাস্ট স্ট্রিট। এই বাড়িটিতে থাকাকালীনও তাঁর ভাই, আত্মীয় স্বজন বউবাজারের বাড়িতে ছিলেন।  কলকাতার কাশীপুর অঞ্চলে গঙ্গার ধারে বাবু হীরালাল শীলের একটি বাংলো বাড়ি ছিল সেই বাড়িতে ১৮৭১ সালের মে-জুন মাস থেকে বসবাস শুরু করেন  বিদ্যাসাগর মাসিক ১৫০ টাকা ভাড়ায়। এই বাড়িটিতে বিদ্যাসাগর প্রায় পাঁচ বছর ছিলেন। এখানে থাকাকালীন তিনি বাদুর বাগানের বৃন্দাবন মল্লিক লেনে নিজস্ব বাড়ি তৈরি শুরু করেন। নিজস্ব বাড়ি তৈরির ইচ্ছে বিদ্যাসাগরের কোনও দিনই ছিলনা। বিদ্যাসাগর বাংলা, ইংরাজি, সংস্কৃত, হিন্দি, আরবি, ফারসি সহ আরও বহু ভাষার বই সংগ্রহ করতেন। একদিন সেই ব্যক্তিগত সংগ্রহ ১৬ হাজার ছাপিয়ে যায়। বিদ্যাসাগর বইয়ের প্রতি অত্যন্ত যত্নশীল ছিলেন। খুব যত্ন সহকারে এবং বহু ব্যায়ে তিনি বই বাধিয়ে রাখতেন। অত বই ভাড়া বাড়িতে ঠিকমতো রাখা যায় না। শেষমেশ তিনি নিজস্ব বাড়ি তইরি করেন।   
 
সুকিয়া স্ট্রিটের গা-লাগানো রাস্তাতেই ঈশ্বরচন্দ্রের বসতবাড়ি। একদা বৃন্দাবন মল্লিক লেন, অধুনা ৩৬, বিদ্যাসাগর স্ট্রিট। এখন সেখানে ইন্দিরা গান্ধী মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের স্টাডি সেন্টার। অত্যন্ত সাজানো বাড়ির রক্ষণাবেক্ষণ চলে বিদ্যাসাগর কলেজ ফর উইমেন-এর হাতে। গেটের বাইরে লর্ড কার্জনের নির্দেশে বসানো মার্বেলের নামফলক। দেখার মতো দুটি ঘর। এখানে বিদ্যাসাগর ১৪ বছর ছিলেন এবং মারা যান। তাঁর জীবদ্দশায় রামকৃষ্ণ পরমহংসদেব দেখা করতে এসেছিলেন। লোকজন দেখতে আসেন সেই ঘর। বেলুড় থেকেও অনেকে আসেন। ১৮৫৬ সালে রাজকৃষ্ণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের যে বাড়িতে বিদ্যাসাগর বিধবা বিবাহের প্রচলন করেন, সেই ১২ নম্বর সুকিয়া স্ট্রিট যা এখন ৪৮এ কৈলাস বোস স্ট্রিট-এর বাড়িটি বসতবাড়ি থেকে হেঁটে বড়জোর পাঁচ মিনিট। সেই ঐতিহাসিক বাড়ির ইতিহাস বলার মতো তো কেউ সে অঞ্চলে নেই। যেমন বড়বাজারে সত্যনারায়ণ পার্কের উল্টোদিকে রাস্তায় ১৩ নম্বর দয়হাটা স্ট্রিটের বর্তমানে দিগম্বর জৈন টেম্পল রোড বাড়িটার আশপাশে কেউ জানেনই না, কলকাতায় এসে ছেলে ঈশ্বরচন্দ্রকে নিয়ে প্রথমে এই বাড়িতেই উঠেছিলেন ঠাকুরদাস বন্দ্যোপাধ্যায়। পরে সে বাড়ি লঙ্কার গুদাম হয়ে যায়। আর এখন তো বহুতল, ব্যবসা চলে।

Follow Us:
Download App:
  • android
  • ios