গায়িত্রী গোপাকুমার, এইচআর, এশিয়ানেট নিউজ ডট কম- 
মানব সম্পদ নিয়ে কাজ করার ইচ্ছে থেকেই এই ক্ষেত্রে কাজ করা শুরু। এইচআর নিয়ে পড়াশোনার সময় বিশ্ববিদ্যালয়ে র্যাঙ্ক হোল্ডার ছিলাম। ফলে এইচআর-এর পেশায় আসাটা খুব একটা অসুবিধা হয়নি। আসলে মানুষকে নিয়ে কাজ করা, তাদের পরিস্থিতি বোঝা এবং তাদের পিছন থেকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেওয়াটা আমি খুবই পছন্দ করি। আমার জন্ম এক সাংবাদিক পরিবারে। যেখানে রাতদিন ডেটলাইনের তাড়া লেগে থাকত। বাবা-কে দেখতাম অক্লান্ত পরিশ্রম করে কীভাবে একের পর এক খবর তুলে আনছেন। তিনি ছিলেন দেশের এক বিশ্বস্ত এবং নির্ভিক সংবাদ পরিবেশনের জন্য বিখ্যাত একটি মিডিয়া হাউসের এডিটর। ফলে, সংবাদমাধ্যমের আচার-আচরণ, তার কাজের চরিত্র এবং মানুষজন আমার কাছে খুব পরিচিত ছিল। স্বাভাবিকভাবেই এইচআর-কে পেশা হিসাবে নেওয়ার পর মিডিয়া হাউসে আমার কাজ করাটা প্রায় স্বাভাবিক হয়ে পড়েছিল। আমি একটি মিক্সড কালচারকে প্রত্যক্ষ করতে পেরেছিলাম। কারণ আমার বাবা ছিলেন গোড়া ব্রাহ্মণ পরিবারের সন্তান। আর মা ছিলেন অ্যাংলো ইন্ডিয়ান কেরালাইট। চাকরিজীবনে প্রবেশের সময় থেকে এখন পর্যন্ত অনেকটা সময় কেটে গিয়েছে। এখন আমার নিজের একটা সংসার হয়েছে। আমার স্বামীও একজন কেরালাইট। আমার দুই সন্তান। পেশাগত জীবনের প্রেসারের সঙ্গে সঙ্গে পারিবারিক দায়বদ্ধতাও পালন করতে হয়। দুটো দিককে কীভাবে ব্যালান্স করতে হয় তা শিখে গিয়েছি। প্রবল ব্যস্ততার মাঝে কোথায় দিয়ে দিন কেটে যায় বুঝতেই পারি না। তবু লড়াই করে চলি এই সমাজের বুকে। একটা পুরুষ যতটা শক্তি দিয়ে প্রতিনিয়ত লড়াই করে জীবনযুদ্ধে টিকে থাকতে, তার থেকে কোনও অংশে কম লড়াই আমাদের মেয়েদের করতে হয় না। যারা নারীদেরকে যোগত্যতা ও কর্মদক্ষতার মাপকাঠিতে না মেপে এক ভ্রান্ত ধারনা নিয়ে বিচার করতে যান- তাদের উদ্দেশে একটাই বার্তা- 'মেয়েরা অবলা ও অসহায়- কথায় কথায় এটা ভাবা বন্ধ করুন।'

দেবলিনা দত্ত, এশিয়ানেট নিউজ বাংলা- 
ছোটবেলা থেকেই শুনে আসছি, ‘মেয়ে-মানুষ হয়ে যখন জন্মেছো, তখন একটু কষ্ট সহ্য করতে শেখো।’ তখন কথাটার মানে বুঝতাম না, আজ বুঝি! ঘুম থেকে উঠে রান্না সেরে টিফিন গুছিয়ে বাড়ি থেকে বেরানোর সময় রোজ একটাই প্রার্থণা করি, ‘আজ বাসে যেন বসার জায়গা পেয়ে যাই...’। আরামে বসে অফিস পৌঁছে যাব বলে নয়, ভিড়ের সুযোগ খোঁজা মানুষগুলোর কনুইয়ের গুঁতো, গায়ে গা ঘেঁসে দাঁড়ানোর ক্রমাগত চেষ্টার হাত থেকে বাঁচার জন্য। বসার পরেও সতর্ক থাকতে হয়। জামা কাপড়ের ফাঁক-ফোকড় গলে আমার শরীরের ভিতরে কেউ উঁকি মারছে না তো! পাশে বসে থাকা লোকটা কি একটু বেশিই গায়ের উপর উঠছে...ইত্যাদি। অফিসে পৌঁছেও যোগ্যতা প্রমাণের লড়াই। আসলে আমার মতো বেশির ভাগ মেয়ের কাছেই হয়তো চাকরি করা বা উপার্জনের চেষ্টা করাটা শুধু মাত্র টাকা রোজগার করা নয়। সমাজে সমান অধিকার আর সম্মান অর্জনের লড়াই চালিয়ে যাওয়া। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই অফিসের পুরুষ সহকর্মীদের অভিযোগ, ‘কর্মক্ষেত্রে উন্নতির জন্য মেয়েদের পরিশ্রম করতে হয় না, শুধু আপোষ করলেই হয়!’ উন্নতির জন্য আপোষেই এই ‘সর্ট কাট’ এই সমাজই শিখিয়েছে মেয়েদের। তাই আমার লড়াইটা প্রতিদিন ‘মেয়ে মানুষ’থেকে সমাজের চোখে শুধু ‘মানুষ’ হয়ে ওঠার লড়াই। 

জয়িতা চন্দ, এশিয়ানেট নিউজ বাংলা- 
ছোট থেকে চেয়েছিলাম সাংবাদিক হতে। কারণ, ১০-৫টার ঘড়ির কাঁটায় আটকে না থাকা এই কাজটায় আমার ছিল প্রবল আকর্ষণ। সাংবাদিকদের স্মার্টনেস, যে কোনও খবরের জন্য যে কোনও স্থানে পৌঁছে যাওয়া, সকলের সঙ্গে কথা বলা- এই বিষয়টা আমার খুবই ভালো লাগত। মনে হতে যে কাজ একটা নির্দিষ্ট ঘণ্টার মধ্যে আটকে থাকে তাতে কি মজা, কারণ এতে তো নিজেকে পুরোপুরি নিংড়ে দেওয়া যায় না। বরং ফ্রি-বার্ড হওয়ার মধ্যে একটা আনন্দ আছে। একটা অ্যাডভেঞ্চার রয়েছে। সবচেয়ে বড় কথা একটা পেশাগত থ্রিল- যার জন্য আমি বাজি লাগাতেও প্রস্তুত। যে কাজের আমার এমন আবেগ তার থেকে দূরে থাকতাম কী করে! কপাল ঠুকে একদিন নেমে পড়েছিলাম। প্রথম-প্রথম সবধরনের বিটে কাজ। আস্তে আস্তে সেটা পরিবর্তিত হল বিনোদন এবং স্পেশাল ফিচার স্টোরি-র বিটে। আমি আমার পেশাগত জীবনে অনেককিছু শিখেছি। আমার সহকর্মীরা হাতে ধরে অনেক কাজ শিখিয়েছে, মেয়ে বলে কোনওদিনই তাঁরা আমার অবহেলা করেননি। আমি তাঁদের কাছে কৃতজ্ঞ। অনেকে কাজ শেখাতে গিয়ে বকা-ঝকাও করেছেন। প্রথমে ভুল বুঝেছি। পরে বোধ জেগেছে- পেশাগত জীবনে এই বকা খাওয়াটাও একটা শিক্ষা। যেমন ছোটবেলায় পড়াশোনা করতে করতে বাবা-মা-এর বকা খাওয়াটা একটা নিয়ম শৃঙ্খলার মধ্যে বেধে দেয়। এটাও তেমনি। আমার এই সফল কর্মজীবনে আমার পরিবারের ভূমিকা মারাত্মকরকমের। বিশেষ করে আমার মা-যিনি আমাকে কখনও ভেঙে পড়তে দেন না। তিনি একটা শিক্ষা খুব বেশি করে দিয়েছেন, আর সেটি হলে মেয়ে বলে আপোস না করার শপথ। আমি সেটা অক্ষরে অক্ষরে পালন করি। আমার এক শিক্ষকের কথা না বলে কিছু পাত্র খালি যেকে যাবে। কারণ তাঁর নিয়ত উৎসাহ আমাকে একজন সেরা সাংবাদিক হিসাবে গড়ে ওঠার এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের টপার হওয়ার প্রেরণা জোগায়। 

রিয়া দাস, এশিয়ানেট নিউজ বাংলা- 
সাংবাদিকতা নিয়ে পড়াশোনা করার সময় থেকেই সাংবাদিক হওয়ার নেশা আমায় তাড়িয়ে বেড়াত। আর সেই মতোই পড়তে পড়তেই চাকরিতে যোগ দিই। সালটা ২০১৪। তখন থেকেই যাত্রা শুরু। প্রথমদিন যখন চাকরিতে জয়েন করি তার এক্সসাইটমেন্টটাই যেন ছিল অন্যরকম। প্রথম অফিস, নতুন কলিগ, প্রথম কাজ সব মিলিয়ে পুরো বিষয়টাই ছিল ভীষণই উপভোগ্য। সেখানে কেটে গিয়েছিল দীর্ঘ ৪ বছর। তারপর নিজের কেরিয়ার, কাজের উত্থান সব মিলিয়ে পুরোনো অফিসকে বিদায় জানিয়ে নতুন অফিসে চাকরি। বর্তমানে এশিয়ানেট নিউস বাংলায় আমি জয়েন করেছি। প্রথমত প্রিন্ট মিডিয়া থেকে ডিজিটাল মিডিয়া। পুরো আলাদা একটা সেক্টর। এটা নিয়ে যথেষ্ঠ এক্সসাইটেড ছিলাম আমি।  প্রথম প্রথম খুব টেনশন হলেও ধীরে ধীরে তা যেন সহজাত হয়ে গিয়েছে। তবে অফিস নিয়ে সমস্যায় না পড়লেও অফিস যাতায়াতটা কিন্তু ভীষণই চাপের। আমাদের প্রত্যেককেই প্রতিদিন অফিসের জন্য ট্রেনে, বাসে চেপে যাতায়াত করতে হয়। আর তা যে কতটা ঝক্কিপূর্ণ সেটা হয়তো অনেকেই জানেন না।  মাত্র কয়েকদিন আগেই আমার সঙ্গে এমনই একটা ঘটনা ঘটেছে যা রীতিমতো অবাক করছে আমাকে। বিধাননগর স্টেশন থেকে ট্রেনে উঠেছি। ট্রেনে ঠাসা ভীড়। অনেকক্ষণ ধরেই দেখছি আমার ব্যাগের পিছনে কিছু একটা হয়েই চলেছে। বেলঘরিয়া স্টেশনে বিষয়টি বুঝতে পেরে ব্যাগটা সামনে নিলাম। আর সোদপুরে যখন নামলাম তখন দেখলাম আমার কুর্তিটা পিছনের দিকে পুরোটা ব্লেড দিয়ে কাটা। এটা দেখে প্রথমে হতবাক তো হয়েছিলাম, কী করব ভেবে পাচ্ছিলাম না। তারপর অনেককিছু ভাবনা -চিন্তা করে কোনওরকমে বাড়ি এলাম। এরকম ঘটনা আমাদের সঙ্গে হামেশাই ঘটে চলেছে। কিন্তু বাড়ি এসে এটাই উপলব্ধি করলাম জেনারেল হোক বা লেডিস কামড়া কোনওটাতেই যে আমরা সুরক্ষিত হয়, তা যেন আবারও পরিষ্কার হয়ে গেল। একজন নারী হয়েই অপরজন নারীকে লজ্জার মুখে ঠেলে দিতে আমাদের বিবেকে একবারও লজ্জাবোধ তো হয়ই না উল্টে কীভাবে সকলের সামনে তাকে অপ্রস্তুতে ফেলতে পারে তারই প্রমাণ দিচ্ছে বারেবারে।  এইভাবেই প্রতিনিয়ত এগিয়ে চলছে আমাদের সংগ্রাম, আমাদের লড়াই। তবে শুধু লড়াই নয়, 'বেঁচে থাকার লড়াই, বাঁচিয়ে রাখার লড়াই' । 

ইন্দ্রাণী সরকার, এশিয়ানেট নিউজ বাংলা- 
নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান। বরাবরই তাই একটা চেষ্টা ছিল পড়াশোনা শিখে কিছু একটা করতে হবে। এই কিছু একটা করতে গিয়েই গ্রাফিক্স ও মাল্টি-মিডিয়ায় হাতেখড়ি। পড়তে পড়তেই খোঁজ একটা ইন্টার্নশিপ যদি মেলে। জি-নিউজের কলকাতা দপ্তরে মিলেও গেল। সালটা ছিল ২০০১। সেখানে শিখলাম কীভাবে ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ায় নিউজ গ্রাফিক্স বানাতে হয়- তার কৌশল। ভালোই রপ্ত করে ফেলেছিলাম কাজটা। তারপরে শান্ত স্বভাবের হওয়ায় এবং কাজ শেখার একটা অদম্য ইচ্ছে ইন্টার্নশিপে-ই সিনিয়রদের কাছে গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করে দিয়েছিল। সবচেয়ে বড় কথা কাজ শেখার জন্য কোনও দিন-ই কোনও কাজে না করিনি। রাস্তা-ঘাটে বা খবরে প্রায়ই লিঙ্গ বৈষম্যের কথা পড়ি এবং শুনি। কিন্তু আমার চারপাশে এমন কোনও পরিস্থিতি-র মোকাবিলা করতে হয়নি। এমন কোনও অভিজ্ঞতাও নেই যে কেউ মহিলা বলে ছোট করেছে। আসলে আমার কাছে কাজ ছাড়া অন্য কিছু বিষয় গুরুত্ব পায়নি। পরবর্তি সময়ে দেশের একসময়ের এক নম্বর নিউজ চ্যানেলের গ্রাফিক্স টিমেও কাজ করেছি। সকলের কাছেই নিজের কাজের প্রশংসা পেয়ে গর্ব হয়েছে। আমার স্বামীও সাংবাদিকতা পেশায়। ফলে, দুজনের মধ্যে ভাবনার আদান-প্রদান অনেক সহজ। আমার  ৭ বছরের মেয়েও যেন এতদিনে তাঁর মা-কে বুঝে গিয়েছে। আমার স্বামী এবং মেয়ে যেভাবে আমাকে সাহায্য করে, মনোবল বাড়ায় আরও ভালো কাজ করতে, তাতে আমি ধন্য। তবে, এটাও জানি যে এই সমাজে আরও অনেক মহিলাই রয়েছেন যারা লিঙ্গ বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন নিয়ত। তাঁদের উদ্দেশে একটাই কথা বলব, যেটা অনৈতিক এবং অন্যায় তাতে প্রতিবাদ করুন, সেচ্চার হন। আর কিছু কিছু সময় না-কে 'না' বলুন। দেখবেন সমস্যা অনেক কমে যাবে। 

সুমনা সরকার, এশিয়ানেট নিউজ বাংলা- 
ছোটবেলা থেকেই সাংবাদিকতার প্রতি আলাদা একটা ভালবাসা ছিল। স্কুল থেকে বাড়ি ফিরেই টিভি খুলে খবর দেখতাম। তখন অবশ্য এখনকার মত এত নিউজ চ্যানেলের রমরমা ছিল না। দূরদর্শন ছাড়া হাতে গোনা অন্য কয়েকটি চ্যানেল ছিল বিনোদনের মাধ্যম। মনে আছে কার্গিল যুদ্ধের সময় বরখা দত্তকে সীমান্তে গিয়ে নিউজ কভার করতে দেখে মুগ্ধ হয়েছিলাম। তাই স্কুল-কলেজের গণ্ডী পেরোনোর পর বাবা-মা যখন চেয়েছিলেন মেয়ে শিক্ষিকা হোক তখন সেই কথায় পাত্তা না দিয়ে আমি ছুটেছিলাম এক খবরের চ্যানেলে ইন্টার্নশিপ করতে। সরকারি পরীক্ষা দেওয়ার জন্য বাবা এক জায়গায় ভর্তি করে দিয়েছিলেন। কিন্তু মেয়ে সেই ক্লাস না করে পালাত নিউজ চ্যানেলে বিনেপয়সায় কাজ করতে। এভাবেই একদিন ট্রেনি রিপোর্টারের কাজ জুটে গেল এক চব্বিশ ঘণ্টার খবরের চ্যানেলে। সারাদিন খবর ধরানোর জন্য দৌড়। সেই লড়াইটাও যুদ্ধের থেকে কিছু কম নয়। এভাবেই কেটে গেছে মাসের পর মাস। মাস পেরিয় বছরের পর বছর। লড়াই এখনও চলছে। আর খবরের প্রতি ভালবাসা, সেই টানেই তো এখনও ছুটছি। কারণ সেই ভালবাসা হারিয়ে গেলে যে আমিও শেষ হয়ে যাব।

সার্বণী মিত্র, এশিয়ানেট নিউজ বাংলা- 
এক বন্ধু বলেছিল তোর আর চাকরির কী দরকার। আর দুদিন বাদেই বিয়ে হয়ে যাবে। নিশ্চিন্তে ঘর সংসার করবি। কিন্তু সেই বন্ধুর সঙ্গে একই অফিসে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করে মুখ বন্ধ করেও তাকে জবাব দিয়েছিলাম আর্থিক স্বাধীনতা না থাকলে কোনও স্বাধীনতাই থাকে না। তবে লড়াইটা শুরু হয়েছিল অনেক আগে থেকেই। আমরা দুই বোন। বাবা সবসময়ই বলত আমার দুটো ছেলে। চিন্তার আর কিছুই নেই। কিন্তু মায়ের হাত ধরে যখন বেড়াতে যেতাম তখন শুনতে হত দুটোই মেয়ে। একটা ছেলে হল না। গ্রামের গার্লস স্কুলেই পড়াশুনা শুরু। ক্লাস নাইনে শাড়িই নিয়ম। কিন্তু শাড়ি পড়ে সাইকেল চালানোটা ছিল খুবই কঠিন। তা বারো ক্লাসে পৌঁছে গিয়েও দিদিমণিদের বোঝাতে পারিনি। কড়া দিদিমণিরা বলেছিলেন আমরা তো শাড়ি পরেই স্কুলে আসি। তোমাদের সমস্যাটা কোথায়। মেয়ে হয়েছো। এইটুকু তো কষ্ট করতেই হবে।
অর্ধেক আকাশ হয়েও কোন নিয়মে কষ্ট কবর তা কোনও উত্তর এখনও পাইনি। অথচ পুরুষ বন্ধুদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে হাওড়া থেকে বর্ধমান যাতায়াত করে পড়াশুনা করেছি। কর্মক্ষেত্রেও তাই। ডিউটি রোস্টারের সময় দেখা হয়নি আমি মেয়ে। কিন্তু বেশ কয়েক জন বসের কাছে ভালো স্টোরির বেলায় উপেক্ষিত হত যোগ্যতা। কিন্তু এখনও গর্বের সঙ্গে বলতে পারে আমি একজন নারী। যতটা অর্জন করেছি তার পুরোপুরি কৃতিত্ব আমার। তবে এখনও যাওয়া আসার সময় তাড়াহুড়ো করলে শুনতে হয় আপনি তো মেয়ে। এতো তাড়াহুড়ের কী রয়েছে বলুন তো। লেডিস কামরা থাকতেও কেন জেনারেলে উঠলেন। আপনি একজন মেয়ে। কেন এতো ভিড় বাসে ওঠেন। প্রশ্ন সবগুলিই পরামর্শ। আরও খুলে বললে বুঝিয়ে দেওয়া হয় এখনও তিলোত্তমা আর্ধেক আকাশের নয়। 

অদ্রিকা দাস, এশিয়ানেট নিউজ বাংলা- 
আন্তর্জাতিক নারী দিবসের শুভেচ্ছায় ভরছে সোশ্যাল মিডিয়া। সোশ্যাল মিডিয়ায় চোখ রাখলেই নানা পোস্ট, নানা বার্তা। উইমেন এমপাওয়ারমেন্টের কথা, তো কোথাও নারীদের যোগ্য সম্মানের অধিকার নিয়ে বিভিন্ন নীতি। নারী দিবস উদযাপিত হচ্ছে, বেশ ভালো, তবে সত্যি কি এতে কোনও লাভ আছে? আগামিকাল আবার কোথাও ধর্ষণের খবর, গৃহবধূকে নির্যাতনের খবর, কাজের জায়গায় উঠতে বসতে "মেয়েদের দিয়ে এই কাজটা হবে না" শুনতে হবে। নিত্যদিন কী কী সহ্য করতে হয় একজন মহিলাকে তা কয়েকটা শব্দ সাজিয়ে গুছিয়ে লিখলেও বোঝানো যাবে না। পিতৃতান্ত্রিক সমাজে নারীদের অবস্থা যে এরকমই হবে সেটাই স্বাভাবিক, এই কথাই ছোট থেকেই বিশ্বাস করে এসেছি আমরা। প্রত্যেক বছর ৮ মার্চ অনেকেই আপনাকে নারী দিবসের শুভেচ্ছা জানাবে ঠিকই, কিন্তু মন কতটা নারীদের কতটা সম্মান করে পৃথিবী তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। যেমন আজও মহিলাদের জন্য বেশ কয়েকটি ডু'জ আর ডোন্ট'স এর তালিকা রয়েছে। আমারও জীবনে সেই তালিকার কিছু বিষয় ইমপ্লিমেন্ট করার চেষ্টা করেছেন অনেকেই। যেমন, 'একটু মানিয়ে নে না মা! তুই তো বুঝদার। জানিসই তো ছেলেরা কেমন হয়', রাস্তাঘাটে ইচ্ছাকৃত কনুইয়ের গুঁতো খেতে হয় প্রায় প্রত্যেক মেয়েকে। তার জন্য উপায় একটাই সঠিক পোশাক পরো। পোশাকই নাকি ধর্ষণ কিংবা মলেস্টেশন থেকে বাঁচার উপায়। অথচ আসিফার ধর্ষণের কারণ এখনও কেউ বলতে পারে না। যাই হোক আমি এই ধরণের সহ্য করার মহিলাদের তালিকায় কখনই পরি না। গুঁতো খেলে পাল্টা গুঁতোটা বেশ জোরেই দিতে অভ্যস্ত আমি। সম্পর্ক বাঁচানোর দায় হারাইনি নিজের ইচ্ছা-আকাঙ্খা। আর এর জন্য আমার জীবনের অনুপ্রেরণা কিন্তু বাবা। বাবা আমায় এভাবে চোখে আঙুল দিয়ে ঠিক-ভুলের বিচার করতে সেখাননি। ছোট খাটো আচরণে এই জিনিসগুলি তাঁর থেকে রপ্ত করেছি আমি। ভিক্টিম বলে নিজেকে পরিচয় দেওয়া নট মাই কাপ অফ টি। আজ আন্তর্জাতিক নারী দিবসে আমি আলাদা করে কিছুই ভাবছি না, করছিও না। কারণ প্রত্যেক দিনই নারীদের, সকলের। 

বর্ষা চট্টোপাাধ্যায়, এশিয়ানেট নিউজ বাংলা- 

৮ মার্চ। আন্তর্জাতিক নারীদিবস। আজকের দিনে নিজের এবং নিজের পেশা সম্পর্কে ছোট্ট কয়েকটা কথা লেখার সুযোগ করে দিয়েছে এশিয়ানেট নিউজ বাংলা, যে পরিবারের সঙ্গে খুব কম সময়েই আমি জড়িয়ে গিয়েছি ওতোপ্রোতভাবে। কীভাবে সাংবাদিকতায় প্রবেশ? সাংবাদিকতা- এই বিষয়ে লেখার ধৃষ্টতা আমি করতে পারি না। তবে যেটা বলতে পারি তা হল, অনেকের মতোই আমার কাছেও এটা ছিল স্বপ্নের মতোই। আর কখন যে এই স্বপ্ন দেখাটা একটা অভ্যাস, আর ধীরে ধীরে জেদ হয়ে দাঁড়িয়ে গিয়েছিল, বুঝতে পারিনি। আর সেই জেদকে সামনে রেখে এগিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যে সামিল হওয়া। চাকরি করে নিজের পা-এ নিজে দাঁড়ানো, নিজের ছোট-বড় ইচ্ছে নিজেই পূরণ করা, এই সহজ বিষয়টা মাথার মধ্যে ছোট থেকে মা-বাবাই ঢুকিয়ে দিয়েছিলেন। 'মেয়ে' বলে আলাদা করে কোনও পার্থক্য বোঝার পরিস্থিতি তৈরি হয়নি। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পরিবেশ-পরিস্থিতি সবকিছুই বুঝিয়ে দেয় কোথাও গিয়ে একটা পার্থক্য রয়েছেই। মফঃস্বল থেকে এসে পড়াশোনা, সেখান থেকে এমন একটি জগতে প্রবেশ যেখানে মেয়েদের নিয়ে অনেকেরই কমবেশি দুশ্চিন্তা থাকে বা বলা ভালো অন্য ধরণের ধারণা থাকে..., সে সবকে দূরে সরিয়ে স্রোতের উলটো দিকে যাওয়ার শুরুটা হয়েছিল অনেক আগে থেকেই। বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনার সঙ্গে সঙ্গেই চলেছিল সেই স্বপ্নে শান দেওয়ার কাজ। বহুবার তাল কেটেছে, পড়েছি, আবার উঠেছি, কিন্তু সবকিছুর বাইরে ছোট-বড় অনেকের থেকে শিখেছি অনেক কিছু। আজও শিখে চলেছি। কখনও ক্যামেরার সামনে, কখনও পিছনে, কখনও অডিও ভিজুয়াল, কখনও ডিজিটাল, যেখানে যা শেখার সুযোগ পেয়েছি সবটুকু শিখে নেওয়ার চেষ্টা করেছি। আমার মতে, এটা শুধুমাত্র একটা পেশা হতে পারে না, প্যাশনটাই এখানে সিংহভাগ জুড়ে। মেয়ে বলে আলাদা করে কিছু নয়, এখানে ছেলে-মেয়ে সবাইকেই প্রতিমুহূর্তে পরীক্ষা দিতে হয়, তার মতো করে। দৈনন্দিন জীবনে কর্মক্ষেত্রে যাওয়া, সারাদিনের পর বাড়ি ফিরে ফের ল্যাপটপ নিয়ে বসে পড়া, সঙ্গে রান্নাবান্না, সপ্তাহের একটা দিনের ছুটিতেও বিরামহীন কাজ, ঘুম ভাঙা থেকে ঘুমোতে যাওয়া পর্যন্ত এই নিরন্তর কর্মযজ্ঞ এবং সঙ্গে আরও অনেক ভূমিকা পালন, এই ব্যস্ততাটুকু আমি বেছে নিয়েছি। তাই আজকের দিনটাও আমার কাছে সেলিব্রেট করে নয়, কেটেছে আর পাঁচটা দিনের মতোই। ৮ মার্চ, এই একটা দিনের জন্য নয়, বছরের সব ক'টা দিনের জন্যই বলতে চাই, শুধু নারী-পুরুষ সমান সমানের জন্য সরব হওয়া নয়, মেয়েদেরকেও মেয়েদের পাশে দাঁড়াতে হবে। আমরা মহিলারাই কি মহিলাদের অনেক ক্ষেত্রে অহেতুক সমালোচনা বা ছোট করি না? কর্মক্ষেত্রে অন্যের সাফল্যের পিছনে পরিশ্রমটা না দেখে চট করে 'বিচার' করে ফেলি না? 'মেয়েরাই মেয়েদের শত্রু' এই প্রবাদটা যেদিন শুনতে হবে না, সেদিন চলার পথটা হয়তো আরও একটু সহজ হয়ে যাবে। হয়তো একটা মাত্র দিবস উদযাপনের প্রয়োজন আর পড়বে না। আমার স্বল্প অভিজ্ঞতাই আমি অন্তত এটুকুই বুঝেছি।