জ্যৈষ্ঠ মাসের অমাবস্যায় বাঙালি ও অবাঙালি বিবাহিত মহিলারা স্বামীর দীর্ঘায়ু ও সংসারের মঙ্গল কামনায় বট সাবিত্রী ব্রত রাখেন। সাবিত্রী যেমন যমের হাত থেকে সত্যবানকে ফিরিয়ে এনেছিলেন, তেমনই বিশ্বাস এই ব্রতে অখণ্ড সৌভাগ্য মেলে।
করবা চৌথ উত্তর ভারতের, আর বট সাবিত্রী ব্রত পশ্চিম ও পূর্ব ভারতের। বিশেষ করে মহারাষ্ট্র, গুজরাট, বিহার, উত্তরপ্রদেশ, বাংলার বিবাহিত মহিলারা জ্যৈষ্ঠ অমাবস্যায় এই ব্রত রাখেন।

পুরাণ মতে, সাবিত্রী বট গাছের নিচেই যমরাজের সাথে তর্ক করে সত্যবানের প্রাণ ফিরিয়ে আনেন। বট গাছ ‘অক্ষয়’ – অর্থাৎ অমর। তাই স্বামীর আয়ু ‘অক্ষয়’ করার জন্য বট গাছকে পুজো করা হয়।
কিন্তু পঞ্জিকা মতে ২০২৬-এ তারিখ ও সময় নিয়ে ধন্দ আছে। সাথে পুজোর নিয়মে ছোট্ট ১টা ভুলে ব্রত নষ্ট হয়। জ্যোতিষী ও পুরোহিত পণ্ডিত রজত শাস্ত্রী জানালেন নির্ভুল গাইড।
বট সাবিত্রী ব্রত ২০২৬ কবে? শুভ ক্ষণ কখন? ২০২৬ সালে জ্যৈষ্ঠ অমাবস্যা পড়েছে দু’দিন। তাই নিয়ে মতভেদ। পঞ্জিকা মতে: ১. অমাবস্যা তিথি শুরু: ১৫ জুন ২০২৬, সোমবার সকাল ১১:০৭ মিনিটে। ২. অমাবস্যা তিথি শেষ: ১৬ জুন ২০২৬, মঙ্গলবার সকাল ৮:২৩ মিনিটে।
উদয়া তিথি মতে, ১৬ জুন ২০২৬, মঙ্গলবারই বট সাবিত্রী ব্রত পালন করুন। কারণ সূর্যোদয়ের সময় অমাবস্যা থাকছে।
পুজোর শুভ সময়: ১৬ জুন সকাল ৫:১৩ থেকে সকাল ৮:২৩-এর মধ্যে। এই ৩ ঘণ্টা ‘ব্রহ্ম মুহূর্ত + অমাবস্যা’ যোগ। সবচেয়ে শুভ। সময় না পেলে সারাদিনই বট গাছ পুজো করতে পারেন, সূর্যাস্তের আগে।
ব্রতের নির্ভুল নিয়ম: ধাপে ধাপে পদ্ধতি
আগের দিন – ১৫ জুন সোমবার: সংযম পালন করুন। নিরামিষ খান, পেঁয়াজ-রসুন বাদ। রাতে মেঝেতে শোয়ার নিয়ম।
ব্রতের দিন – ১৬ জুন মঙ্গলবার: ১. স্নান ও সংকল্প: ভোরে স্নান করে লাল বা হলুদ শাড়ি পরুন। হাতে আলতা, শাঁখা-পলা, সিঁথিতে সিঁদুর। হাতে জল নিয়ে সংকল্প করুন – “স্বামীর দীর্ঘায়ু ও অখণ্ড সৌভাগ্যের জন্য বট সাবিত্রী ব্রত করছি।”
২. পুজোর সামগ্রী: বট গাছের ডাল যদি বাড়িতে আনেন, নয়তো মন্দিরের বটতলায় যান। লাগবে – কাঁচা সুতো/মৌলি, ৭ রকম ফল, ফুল, ধূপ, দীপ, সিঁদুর, আলতা, পান-সুপারি, ভেজানো ছোলা, টাকা, মিষ্টি।
৩. বট গাছ পুজো: - বট গাছে জল দিন। গঙ্গাজল ছিটিয়ে শুদ্ধ করুন। - গাছের গুঁড়িতে হলুদ-সিঁদুরের ফোঁটা দিন, চাল দিন। - সাবিত্রী-সত্যবানের ছবি বা মূর্তি রাখুন। ধূপ-দীপ জ্বালান। - সুতো বাঁধা: কাঁচা সুতো নিয়ে বট গাছকে ৭ পাক বা ১০৮ পাক ঘুরে বাঁধুন। প্রতি পাকে বলুন “অখণ্ড সৌভাগ্যবতী ভব”।
৪. ব্রত কথা শুনুন: পণ্ডিত বা বয়স্ক মহিলার কাছে সাবিত্রী-সত্যবানের গল্প শুনুন। নিজে পড়লেও হবে।
৫. ভোগ নিবেদন: ভেজানো ছোলা, কলা, আম, কাঁঠাল, লিচু – ফল ও মিষ্টি দিন।
৬. প্রণাম ও প্রার্থনা: স্বামীর নাম নিয়ে প্রণাম করুন। বয়স্কদের প্রণাম করে আশীর্বাদ নিন।
৭. উপোস ভাঙা: পুজো শেষে ভেজানো ছোলা, ফল খেয়ে উপোস ভাঙুন। দিনে ১ বার নিরামিষ খাবেন। চাল, গম খাওয়া বারণ। সাবু, ফল, দুধ, দই চলবে। সন্ধ্যায় স্বামীকে প্রণাম করে পায়ে হাত দিয়ে আশীর্বাদ নিন।
স্বামীর দীর্ঘায়ু চেয়ে যে ১টা ভুল করলেই বিপদ! ৮০% মহিলা এটা করেন ভুল: বট গাছে সুতো বাঁধার সময় উল্টো দিকে পাক দেওয়া। শাস্ত্র মতে, পুজোর সময় সবসময় দেবতার বাম দিক থেকে ডান দিকে ঘুরতে হয়, অর্থাৎ Clock-wise বা ঘড়ির কাঁটার দিকে। বট গাছকে মা লক্ষ্মী ও ত্রিদেবের বাসস্থান মানা হয়।
অনেকে তাড়াহুড়োয় বা না জেনে Anti-clockwise বা উল্টো দিকে সুতো পেঁচান। পণ্ডিত রজত শাস্ত্রী বলছেন, “উল্টো পাকে সুতো বাঁধলে ফল উল্টো হয়। সৌভাগ্যের বদলে দুর্ভাগ্য আসে। স্বামীর বিপদ বাড়ে। এটা ব্রতের সবচেয়ে বড় ভুল।”
তাই মনে রাখুন: ৭ পাক দিন, কিন্তু সবসময় নিজের ডান হাত গাছের দিকে রেখে ঘড়ির কাঁটার দিকে ঘুরবেন।
আরও ৪টে ভুল একদম নয়: ১. কালো বা নীল শাড়ি: ব্রতের দিন কালো, নীল, সাদা শাড়ি নিষিদ্ধ। লাল, হলুদ, কমলা, সবুজ শুভ। ২. চুল খোলা রাখা: পুজোর সময় চুল বাঁধুন, খোঁপা করুন। খোলা চুল অশুভ। ৩. কাঁচি, ছুরি ব্যবহার: ব্রতের দিন সেলাই, কাটাকুটি করবেন না। নখও কাটবেন না। ৪. স্বামীর সাথে ঝগড়া: উপোস করে মাথা গরম, ঝগড়া করলে ব্রত নষ্ট। সংযম রাখুন।
বট গাছ না পেলে কী করবেন? শহরে বট গাছ কম। বাড়িতে বটের ডাল এনে তামার ঘটে পুঁতে পুজো করুন। বা গুগলে ‘বট গাছের ছবি’ প্রিন্ট করে পুজো করুন। ভক্তি আসল। তুলসী গাছকেও বট রূপে পুজো করা যায়।
স্বামী যদি দূরে থাকে? ভিডিও কলে স্বামীকে দেখে প্রণাম করুন। তাঁর ফটোতে ফুল দিন। মনে মনে সংকল্প করুন। দূরত্ব ব্রত নষ্ট করে না।
শেষ কথা: বট সাবিত্রী শুধু উপোস নয়, স্বামীর প্রতি ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও সংকল্পের উৎসব। সাবিত্রীর মতো তেজ, বুদ্ধি আর ভক্তি থাকলে যমও হার মানে।
২০২৬-এর ১৬ জুন, শুভ ক্ষণে নিয়ম মেনে পুজো করুন। সুতো বাঁধুন ঘড়ির কাঁটার দিকে। দেখবেন, আপনার সত্যবানও দীর্ঘায়ু পাবেন।
কারণ বিশ্বাসে মিলায় বস্তু, তর্কে বহুদূর। অখণ্ড সৌভাগ্যবতী হোন।


