শ্রাবণ মাসে আমিষ খাওয়া বন্ধ করার কারণ: ধর্মীয়, বৈজ্ঞানিক ও সাংস্কৃতিক তথ্য
মুম্বাই - শ্রাবণ ২৫ জুলাই থেকে শুরু হচ্ছে। অনেকের মনে প্রশ্ন জাগে, শ্রাবণ মাসে আমিষ খাওয়া কেন বন্ধ করতে হয়? শুধু ধর্মীয় কারণেই কি? নাকি এর পেছনে বৈজ্ঞানিক ভিত্তিও আছে? আজ পূর্বপুরুষদের ঐতিহ্যকে শাস্ত্র এবং বিশ্বাসের দৃষ্টিকোণ থেকে বুঝে নেওয়া যাক।

শিবভক্তদের জন্য অত্যন্ত পবিত্র
শ্রাবণ মাস এলেই বিশ্বাস, ভক্তি এবং সাত্ত্বিকতার পরিবেশ সৃষ্টি হয়। এবার শ্রাবণ ২৫ জুলাই থেকে শুরু হয়েছে। এই মাসটি বিশেষত শিবভক্তদের জন্য অত্যন্ত পবিত্র বলে মনে করা হয়। এই সময়ে লুচি, আলুর তরকারি, সাবুদানার খিচুড়ি, বড়া, ইত্যাদি উপবাসের ঐতিহ্যবাহী খাবার ঘরে ঘরে তৈরি করা হয়। এই মাসে আমিষ খাওয়া শুধু বন্ধই করা হয় না, এমনকি এই বিষয়ে চিন্তা করাও ভুল বলে মনে করা হয়।
হিন্দু ধর্ম অনুযায়ী কারণ কি?
হিন্দু ধর্মে আমিষ খাওয়া সম্মতি দিয়ে নিষিদ্ধ বলে মনে করা হয়। তবে অনেকে নিয়মিত আমিষ খান। কিন্তু শ্রাবণ মাসে আমিষ সম্পূর্ণরূপে বর্জন করতে হবে, এমনটাই শাস্ত্রে বলা হয়েছে। এর পেছনে বিশ্বাস, সংযম এবং আধ্যাত্মিক শুদ্ধির উদ্দেশ্য রয়েছে।
ভগবদ্গীতায় শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন:
"যে কেউ আমাকে ভালোবেসে পাতা, ফুল, ফল বা জল অর্পণ করে, আমি তা গ্রহণ করি।" এই বাক্যটিতে শুদ্ধ নিরামিষ জীবনযাত্রার গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে। বেদ, পুরাণ এবং মহাভারতেও আমিষ খাওয়াকে অস্বীকার করা হয়েছে। এছাড়াও, শ্রাবণ মাসে অনেক পবিত্র উৎসব আসে, যেমন কৃষ্ণ জন্মাষ্টমী, রাখি বন্ধন, নাগ পঞ্চমী, হরিতালিকা তীজ। এই সমস্ত উৎসবের উদ্দেশ্যও শুদ্ধতার সাথে সম্পর্কিত, তাই আমিষ বর্জন করা প্রত্যাশিত।
বৈজ্ঞানিক কারণ কি?
শ্রাবণ মাস বেশিরভাগ সময় বর্ষাকালের মাঝামাঝি সময়ে আসে এবং সেই সময়ে আবহাওয়ায় আর্দ্রতা বেশি থাকে। এর ফলে আমাদের শরীরের হজম ক্ষমতা কমে যায়। শরীর হালকা খাবার গ্রহণ করে, তাই লোকেরা উপবাসে সাবুদানা, ফল, আলু, দুধ ইত্যাদি খায়। এই সমস্ত খাবার সহজেই হজম হয়।
বৃষ্টির কারণে জলেতে জীবাণুর বৃদ্ধি ঘটে। ফলে জলবাহিত রোগ হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়। মাংস, মাছ ইত্যাদি খাবার থেকে সংক্রমণ হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে। তাছাড়া তাজা মাংস পাওয়ার সম্ভাবনা কম থাকে। আবহাওয়ার কারণে মাংস দ্রুত নষ্ট হয়ে যায়। এর ফলে খাদ্যে বিষক্রিয়া হতে পারে।
জলজ প্রাণীর প্রজননের জন্য সুরক্ষা:
বর্ষাকাল জলজ প্রাণী, বিশেষ করে মাছ এবং সামুদ্রিক প্রাণীর প্রজননের সময়। আগে যখন মাছ চাষ খুব একটা হত না, তখন লোকেরা প্রাকৃতিক প্রজাতির সংরক্ষণের জন্য শ্রাবণে মাছ খাওয়া বন্ধ করত। এই ঐতিহ্য একপ্রকার পরিবেশ এবং জীববৈচিত্র্য রক্ষার প্রাচীন ভারতীয় পদ্ধতি ছিল।
শ্রাবণ - প্রেম, সংযম এবং আধ্যাত্মিক সাধনার মাস:
শ্রাবণ মাসে ভক্তি এবং ধ্যানের প্রভাব বেশি থাকে। এই সময়ে শিবভক্তরা কাঁওয়ার যাত্রা করেন। শিবলিঙ্গে জলাভিষেক করেন। এবং উপবাস পালন করেন। হিংসাত্মক কাজ (আমিষ খাওয়া, প্রাণী হত্যা) আধ্যাত্মিকতার পথে বাধা সৃষ্টি করে বলে মনে করা হয়। তাই শ্রাবণে জীব হত্যা বর্জনীয় বলে মনে করা হয়।
উপবাসের মানসিক ও শারীরিক উপকারিতা:
শরীর থেকে বিষাক্ত উপাদান বের করে দেয়
মন একাগ্র হয়
আধ্যাত্মিক শুদ্ধতা এবং সংযম বৃদ্ধি পায়
প্রকৃতির সাথে সংযোগ স্থাপিত হয়
আইনে নিষিদ্ধ নয়, তবে সংস্কৃতিতে সীমাবদ্ধ
মনে রাখা দরকার, শ্রাবণে আমিষ খাওয়ার উপর কোনও জোরপূর্বক নিষেধাজ্ঞা নেই। এটি রীতিনীতি এবং ব্যক্তিগত বিশ্বাসের উপর নির্ভর করে। প্রত্যেকে নিজের পদ্ধতিতে শ্রাবণ পালন করে। কেউ উপবাস করে, কেউ ভক্তি-পূজা করে।
প্রকৃতি এবং নিজের আত্মার সাথে একাত্ম হওয়ার উৎসব
শ্রাবণে আমিষ বর্জনের ঐতিহ্য শুধু ধর্মীয় অন্ধবিশ্বাসের উপর ভিত্তি করে নয়, বরং বাস্তব বৈজ্ঞানিক, পরিবেশগত এবং আধ্যাত্মিক কারণের উপর ভিত্তি করে। আজকের আধুনিক বিশ্বেও, এই ঐতিহ্য স্বাস্থ্য, প্রকৃতি-বান্ধব জীবনযাত্রা এবং আধ্যাত্মিক উন্নতির জন্য পথপ্রদর্শক হতে পারে। শ্রাবণ মানে প্রকৃতি এবং নিজের আত্মার সাথে একাত্ম হওয়ার উৎসব, এতে সাত্ত্বিকতার গ্রহণই আসল ভক্তি!
Get the latest updates on Puja, Brata, and Utsav (পুজো, ব্রত ও উৎসব) in Bangla. Discover stories, traditions, and celebrations on Asianet News Bangla.

