আমরা প্যান্ডেলে যে হলুদাভ গৌরবর্ণা দুর্গা দেখি, শাস্ত্রে কি ঠিক তেমনই বর্ণনা আছে? নাকি দেবীর গায়ের রং নীল বা কালোও হতে পারে? জানুন ধ্যানমন্ত্র, মৎস্যপুরাণ ও চণ্ডী অনুযায়ী উমার আসল বর্ণের ব্যাখ্যা।
পুজোর মণ্ডপে আমরা সাধারণত যে দুর্গাকে দেখি, তাঁর গায়ের রং উজ্জ্বল হলুদাভ, পরনে লাল শাড়ি, মুখে সোনালি আভা। ছোট থেকে এটাই আমাদের চোখে দুর্গার চিরাচরিত রূপ। কিন্তু থিমের পুজোর দৌলতে আজকাল কোথাও নীল, কোথাও কালো, কোথাও আবার শ্বেতবর্ণা দুর্গাও দেখা যায়। অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগে, শাস্ত্রমতে আসলে উমার গায়ের রং কেমন হওয়া উচিত? তিনি কি সত্যিই তপ্ত সোনার মতো হলুদ, নাকি কৃষ্ণসম কালো?
এর সঠিক উত্তর খুঁজতে আমাদের ফিরে যেতে হবে দেবীর ধ্যানমন্ত্রে। শাস্ত্রে বলা হয়েছে, প্রতিমা গড়ার আগে ধ্যানমন্ত্রে দেবীকে যেমন কল্পনা করা হয়, প্রতিমা তেমনই হওয়া উচিত। দুর্গার ধ্যানমন্ত্রের প্রথম চার লাইনেই তাঁর রূপের সম্পূর্ণ বর্ণনা দেওয়া আছে।
জটাজুট সমাযুক্তাং অর্ধেন্দু কৃতশেখরাম্। লোচনত্রয় সংযুক্তাং পূর্ণেন্দু সদৃশাননাম্। অতসীপুষ্প বর্ণাভাং সুপ্রতিষ্ঠাং সুলোচনাম্। নবযৌবন সম্পন্নাং সর্ব্বাভরণ ভূষিতাম্।
অর্থাৎ, দেবীর মাথায় জটার মুকুট, কপালে অর্ধচন্দ্র, তিনটি চোখ এবং মুখ পূর্ণিমার চাঁদের মতো। আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ লাইনটি হল ‘অতসীপুষ্প বর্ণাভাং’। মানে তাঁর গায়ের রং অতসী ফুলের মতো। পল্লী বাংলায় অতসী ফুলের রং হয় উজ্জ্বল হলুদ। তাই এই মন্ত্র অনুযায়ী দেবী হলেন পীতবর্ণা বা গৌরবর্ণা। এই কারণেই বাংলার প্রাচীন মৃৎশিল্পীরা দেবীর গায়ে হলুদাভ সোনালি রং-ই ব্যবহার করতেন। তবে মজার বিষয় হল, ভারতের কিছু অঞ্চলে অতসী ফুল নীল রঙেরও হয়। সেখানে নীল বর্ণা দুর্গারও পুজো প্রচলিত আছে।
এই ব্যাখ্যাকে আরও জোরালো করে মৎস্যপুরাণ ও বৃহদ্ধর্ম পুরাণ। সেখানে দেবীকে সরাসরি ‘তপ্তকাঞ্চনবর্ণা’ বলা হয়েছে। অর্থাৎ আগুনে তাতানো সোনা গললে যে উজ্জ্বল তরল সোনার রং হয়, দেবীর অঙ্গকান্তি ঠিক তেমনই। বৃহদ্ধর্ম পুরাণের কাহিনী অনুযায়ী, রামচন্দ্রের অকাল বোধনের জন্য ব্রহ্মা যখন দেবীকে খুঁজতে মর্ত্যে আসেন, তখন তিনি এক দুর্গম স্থানে বেলগাছের সবুজ পাতার মধ্যে ঘুমিয়ে থাকা এক তপ্তকাঞ্চনবর্ণা বালিকাকে দেখতে পান। সেই বালিকাই ছিলেন দুর্গা। ব্রহ্মা বোধন স্তবে তাঁকেই জাগিয়ে তোলেন। তাই বালিকা রূপেও দেবী তপ্ত সোনার বরণ। যুগ যুগ ধরে তাই দুর্গার নামের পাশে গৌরী, স্বর্ণবর্ণা, পীতাম্বরী বিশেষণগুলো জুড়ে গেছে।
তাহলে কালো বা নীল দুর্গা কারা?
আসলে দুর্গা এক এবং অদ্বিতীয়া হলেও, চণ্ডীতে তাঁর তিনটি প্রধান প্রকাশের কথা বলা আছে, যাঁদের গায়ের রং আলাদা।
১. মহাকালী: কল্পান্তে মধু-কৈটভ অসুরকে বধ করার জন্য বিষ্ণুর দেহ থেকে যিনি আবির্ভূতা হন, তিনি মহাকালী। তাঁর বর্ণনা - ঘোর কৃষ্ণবর্ণা, দশমুখী, দশভুজা। ইনিই চণ্ডীর প্রথম চরিত্র।
২. মহালক্ষ্মী: স্বায়ম্ভুব মন্বন্তরে মহিষাসুরকে বধ করার জন্য সমস্ত দেবতার তেজ থেকে যিনি সৃষ্টি হন, তিনি মহালক্ষ্মী। ইনি বিচিত্রবর্ণা বা তপ্তকাঞ্চনবর্ণা, অষ্টাদশভুজা, সিংহবাহিনী। ইনি হলেন আমাদের পরিচিত মহিষাসুরমর্দিনী দুর্গা। চণ্ডীর মধ্যম চরিত্রে এঁরই কাহিনী।
৩. মহাসরস্বতী বা কৌষিকী: শুম্ভ-নিশুম্ভ বধের জন্য পার্বতীর দেহকোষ থেকে যিনি জন্ম নেন, তিনি কৌষিকী। তিনি শ্বেতবর্ণা, অষ্টভুজা। চণ্ডীর উত্তম চরিত্রে এঁর বর্ণনা আছে।
এছাড়া নবদুর্গার নটি রূপের মধ্যে কালরাত্রি দেবী কৃষ্ণবর্ণা, মহাগৌরী শ্বেতবর্ণা, আবার কুষ্মাণ্ডা দেবী সূর্যের মতো উজ্জ্বল।
তাই শাস্ত্রমতে, আমরা শারদীয়ায় যে মহিষাসুরমর্দিনী দুর্গার পুজো করি, তাঁর আসল বর্ণ অতসী ফুলের মতো হলুদ বা তপ্তকাঞ্চনের মতো সোনালি। কিন্তু শক্তি এক হলেও তার প্রকাশ অনন্ত। সেই কারণেই বাংলার মণ্ডপে মণ্ডপে উমা কখনও গৌরী, কখনও কালী, কখনও বা নীল সরস্বতী রূপে ধরা দেন।
