ডিজিটাল প্রতারণার শিকার হলে এবার গ্রাহক আর্থিক ক্ষতিপূরণ পাবেন। রিজার্ভ ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়া অনিচ্ছাকৃত জালিয়াতির ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ২৫ হাজার টাকা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ভুল করে ওটিপি শেয়ার করলেও এই সুবিধা মিলবে।
ডিজিটাল লেনদেন আজ আর শহরকেন্দ্রিক কোনও বিলাস নয়—গ্রাম থেকে মহানগর, স্মার্টফোনই এখন ব্যাঙ্ক। কিন্তু এই সুবিধার আড়ালেই ক্রমশ ভয় ধরাচ্ছে ডিজিটাল প্রতারণা। অচেনা কল, ফাঁদে ফেলা লিঙ্ক, কিংবা ‘ব্যাঙ্ক থেকে বলছি’ বলা একটি ফোন—এক মুহূর্তের ভুলেই শূন্য হয়ে যাচ্ছে অ্যাকাউন্ট। এতদিন পর্যন্ত এই ধরনের ঘটনায় ভুক্তভোগীদের সামনে কার্যত কোনও আশ্বাস ছিল না। সেই শূন্যস্থান পূরণ করতেই এবার বড় ও নজিরবিহীন সিদ্ধান্ত নিল রিজার্ভ ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়া (RBI)।
ডিজিটাল জালিয়াতির শিকার হলে এবার গ্রাহক সরাসরি আর্থিক ক্ষতিপূরণ পাবেন—এমনই ঘোষণা করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্ক। আরবিআই জানিয়েছে, অনিচ্ছাকৃত ডিজিটাল প্রতারণার ক্ষেত্রে একজন গ্রাহক সর্বোচ্চ ২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত ক্ষতিপূরণ পাওয়ার যোগ্য হবেন। এখানেই থেমে থাকেনি সিদ্ধান্তের গুরুত্ব। বহু ক্ষেত্রেই দেখা যায়, ভুক্তভোগী অজান্তে বা ভুলবশত ওটিপি শেয়ার করে ফেলেছেন। এতদিন এই কারণ দেখিয়েই ক্ষতিপূরণ থেকে হাত গুটিয়ে নিত ব্যাঙ্ক। এবার সেই যুক্তিও আর চলবে না। আরবিআই স্পষ্ট করেছে, ভুল করে ওটিপি শেয়ার হলেও গ্রাহক এই সুবিধা থেকে বঞ্চিত হবেন না। এই ক্ষতিপূরণের অর্থ আসবে ‘ডিপোজিটর এডুকেশন অ্যান্ড অ্যাওয়ারনেস’ (DEA) ফান্ড থেকে।
এই তহবিল গঠিত হয়েছে ১০ বছরেরও বেশি সময় ধরে পড়ে থাকা দাবিহীন ব্যাঙ্ক আমানত দিয়ে। কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কের হিসেব অনুযায়ী, বর্তমানে এই তহবিলে জমা রয়েছে প্রায় ৮৫ হাজার কোটি টাকা। ডেপুটি গভর্নর স্বামীনাথন জে জানিয়েছেন, এই বিপুল অর্থের একটি অংশ ক্ষতিপূরণে ব্যবহার হলেও দেশের আর্থিক স্থিতিশীলতায় তেমন কোনও নেতিবাচক প্রভাব পড়বে না। তবে এই সুবিধা পুরোপুরি শর্তহীন নয়। একজন গ্রাহক জীবনে মাত্র একবারই এই ক্ষতিপূরণ পাবেন। পাশাপাশি প্রতিটি ঘটনার ক্ষেত্রে খতিয়ে দেখা হবে—গ্রাহকের কোনও অসৎ উদ্দেশ্য ছিল কি না, কিংবা জালিয়াতদের সঙ্গে কোনওরকম যোগসাজশ রয়েছে কি না। আরবিআইয়ের মতে, ডিজিটাল লেনদেনে গ্রাহকদেরও ন্যূনতম দায়বদ্ধতা থাকা প্রয়োজন। সেই কারণেই প্রতারণার মোট অঙ্কের ১৫ শতাংশ গ্রাহককেই বহন করতে হবে। বাকি ৮৫ শতাংশ টাকা ক্ষতিপূরণ হিসেবে দেওয়া হবে, যদিও তার ঊর্ধ্বসীমা ২৫ হাজার টাকার মধ্যেই আটকে থাকবে। কেন এই পদক্ষেপ এত গুরুত্বপূর্ণ? ব্যাঙ্কিং মহলের তথ্য বলছে, দেশে হওয়া ডিজিটাল প্রতারণার প্রায় ৬৫-৭০ শতাংশ ক্ষেত্রেই ক্ষতির পরিমাণ ৫০ হাজার টাকার কম। অর্থাৎ মাঝারি ও নিম্ন আয়ের সাধারণ মানুষই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন। সেই বাস্তবতা মাথায় রেখেই এই সুরক্ষা বলয় তৈরি করা হয়েছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
আরবিআই গভর্নর সঞ্জয় মালহোত্রার বক্তব্য, লেনদেন যদি অনিচ্ছাকৃত হয় এবং গ্রাহক প্রকৃতপক্ষে প্রতারণার শিকার হন, তাহলে অযথা প্রশ্ন বা দীর্ঘসূত্রতার মধ্যে না গিয়ে দ্রুত ক্ষতিপূরণ দেওয়াই লক্ষ্য। এর পাশাপাশি প্রবীণ নাগরিকদের সুরক্ষায় আরও কিছু নতুন ব্যবস্থার ইঙ্গিত দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্ক। বড় অঙ্কের লেনদেনের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত যাচাইকরণ, টাকা অ্যাকাউন্টে জমা হওয়ার আগে সামান্য সময়ের ব্যবধান রাখা, কিংবা সন্দেহজনক লেনদেন হলে তাৎক্ষণিক সতর্কবার্তা—এই সব প্রস্তাব নিয়ে শীঘ্রই খসড়া নিয়ম প্রকাশ করা হবে বলে জানা গিয়েছে। ডিজিটাল ভারতের পথে এগোতে গিয়ে এই সিদ্ধান্ত নিঃসন্দেহে এক গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত। প্রযুক্তির সুবিধা যেমন বাড়ছে, তেমনই বাড়ছে ঝুঁকি। সেই ঝুঁকির বিরুদ্ধে সাধারণ গ্রাহকের পাশে দাঁড়ানোর বার্তাই দিল আরবিআইয়ের এই পদক্ষেপ—যা ডিজিটাল ব্যাঙ্কিংয়ের ওপর মানুষের আস্থা ফেরাতে বড় ভূমিকা নেবে বলেই আশা।
