আজ থেকে ৫২৮ বছর আগে ৩রা আগস্ট ক্রিস্টোফার কলম্বাস সান্তামারিয়া, পিন্টা, নিনা নামে তিনিটি জাহাজ ও ৮৭ জন নাবিক নিয়ে অজানা সমুদ্রের পথে যাত্রা করলেন। তবে সেটা কি অজানা সমুদ্র পথে যাত্রা ছিল? তিনি ভারতীয় উপমহাদেশের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেছিলেন কিন্তু ভুলবশত আমেরিকার ভূখন্ড আবিষ্কার করে ফেলেন।  

কলম্বাসের এই ইতিহাসের তলায় চাপা আছে অসংখ্য নিরপরাধ মানুষের আর্তনাদ। দাসে পরিণত হওয়া অসহায় মানুষের যন্ত্রণা। কারণ, কলম্বাস খুনী ও অত্যাচারী শাসক হিসেবে দুটি ঐতিহাসিক ঘটনা সংঘটিত করেছিলেন। এক; দাস বাণিজ্য ও আমেরিকায় আদিবাসী ইন্ডিয়ানদের গণহত্যা। 

 

 

তাছাড়া কলম্বাস আমেরিকা মহাদেশে পা রাখা প্রথম ইউরোপিয়ান নন। তথ্য অনুযায়ী, তারও ৫০০ বছর আগে লেইফ এরিকসন নামের আইসল্যান্ডের একজন পরিব্রাজক উত্তর আমেরিকায় পা রাখেন। 

লোভী কলম্বাস টাকা ও সুনাম কামানোর জন্য ছিলেন উদগ্রীব। স্পেনের রাজা-রানীকে ভারতীয় উপমহাদেশের উদ্দেশ্যে যাত্রা করবেন বলে সাহায্য চেয়ে আবেদন করেছিলেন। প্রচুর সোনা আর মসলাপাতি এনে দেওয়ার পরিবর্তে স্পেনের শাসক কলম্বাসকে লাভের ১০ শতাংশ ও নতুন আবিষ্কৃত ভূমির গভর্নর পদ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন। 

আরও পড়ুন: ১৫ সেপ্টেম্বরের মধ্যে টিকটক কিনে নিতে চাইছে মাইক্রোসফট, চুক্তি হলে ভারতেও ফেরার সম্ভাবনা

আমেরিকার ইন্ডিয়ান আদিবাসীরা তখন অলংকার পরত। কলম্বাস মনে মনে ভেবেছিলেন, এখানে নিশ্চয়ই অনেক সোনা পাওয়া যাবে। কিন্তু সেই সোনা?  কয়েকজন ইন্ডিয়ানকে বন্দী বানিয়ে জাহাজ নিয়ে গেলেন কলম্বাস। প্রথমে কিউবায়, তারপর হিস্পানিওলাতে বর্তমান হাইতি ও ডমিনিকান ডিপাবলিক। 

স্পেনে ফিরে কলম্বাস রাজা-রানীকে মিথ্যা তথ্য দেন। জানান, তিনি এশিয়া পৌঁছেছেন ও চীনের একটি দ্বীপে ঘাঁটি বানিয়েছেন। সেখানে অনেক সোনা ও মসলা রয়েছে, যার জন্য তার আরো বড় দল প্রয়োজন। এজন্য তিনি ১৭টি জাহাজ ও প্রায় ১,২০০ লোক নিয়ে আমেরিকার উদ্দেশ্যে রওনা দেন। এরপর থেকে শুরু হল আরাওয়াকদের ওপর অত্যাচার।

আরও পড়ুন: আগামী বছরগুলিতে ৫০ শতাংশ বেশি বন্যার ভয়াবহতা দেখবে উপকূলীয় এলাকা, আশঙ্কার মেঘ নতুন গবেষণায়

ফিরে এসে কলম্বাস দেখলেন, তার রেখে যাওয়া লোকেরা সবাই স্থানীয়দের সাথে সংঘর্ষে নিহত হয়েছে। সে যাত্রায় কলম্বাস সোনার খোঁজ না পেলে আদিবাসীদের নিয়ে ক্রীতদাস ব্যবসা শুরু করেন। ১,৫০০ আরাওয়াক নারী, পুরুষ ও শিশুকে ধরে নিয়ে এসে সেখান থেকে ৫০০ জনকে বাছাই করে দাস হিসেবে কলম্বাস স্পেনে পাঠান।  কিন্তু পথেই মারা যায় প্রায় ২০০ জন।

হিস্পানিওলার একটি প্রদেশে ১৪ বছরের উপরের সব স্থানীয় ইন্ডিয়ানকে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ সোনা তিন মাস পরপর জমা দেওয়ার আদেশ করেন কলম্বাস। যারা এতে ব্যর্থ হয় তাদের দুই হাত কেটে ফেলা হয়। অনেকে পালানোর চেষ্টা করলে তাদেরক হিংস্র কুকুর দিয়ে খুঁজে বের করে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে অথবা আগুনে পুড়িয়ে মারা হয়।

এই নির্মমতায় আরাওয়াক গোষ্ঠীর লোকরা বিষ খেয়ে গণ আত্মহত্যা করে। এইভাবে প্রায় ৫০ হাজার আদিবাসী আত্মহত্যা করে। খুন, অঙ্গহানী ও আত্মহত্যার  কারণে মাত্র দুই বছরে হাইতির ২ লক্ষ ৫০ হাজারের অর্ধেক জনসংখ্যা লাশে পরিণত হয়। এই সবকিছুই ঘটে কলম্বাসের সোনার লোভে। 

একদিন কলম্বাস বুঝলেন, এখানে আসলে কোনও সোনা নেই। তখন তিনি আরাওয়াকদের জমি দখল করে তাদের দাসে পরিণত করলেন এবং হাজার হাজার ইন্ডিয়ানকে অমানবিক পরিশ্রম করতে বাধ্য করলেন। যার ফলে হাজার হাজার মানুষ মারা যায়। 

ইন্ডিয়ান আদিবাসীদের ওপর কলম্বাসের নির্মম অত্যাচারের তথ্য মেলে কলম্বাসের নিজস্ব জার্নাল ও বিভিন্ন চিঠির মাধ্যমে। আরও বিশদ ইতিহাস জানা স্প্যানিশ ঐতিহাসিক ফাদার বার্তোলমে দে লাস কাসাসের লেখা ‘হিস্টোরি অব দ্য ইন্ডিস’ বইতে। 

 

এই কারণেই কৃষ্ণাঙ্গ আমেরিকান জর্জ ফ্লয়েড হত্যার প্রতিবাদে আমেরিকা ও ইউরোপজুড়ে প্রতিবাদে উঠে এসেছে কলম্বাসের নাম। আদিবাসী মানুষের ওপর তিনি যে নিষ্ঠুরতা চালিয়েছেন তার প্রতিবাদে তাঁর মূর্তি থেকে মুণ্ড আলাদা করে ফেলা হয়।