গোটা বিশ্বে এখন আলোচনার একটাই বিষয়, করোনাভাইরাস। এইরকম করোনাময় পৃথিবীতেই মঙ্গলবার হঠাৎ একটা অন্য বিষয় নিয়ে আলোড়ন পড়ে গিয়েছে। মোটামুটিভাবে বলা যায়, মঙ্গলবারের পর থেকে সরকারিভাবে জানা গেল, মানুষ এই মহাবিশ্বে একমাত্র বুদ্ধিমান প্রাণী তো নয়ই, অন্যবিশ্ব থেকে ভিনগ্রহী বুদ্ধিমানেরা পৃথিবীতে হানাও দিচ্ছে গত বেশ কয়েক বছর ধরে। এদিন, পেন্টাগন আনুষ্ঠানিকভাবে তিনটি স্বল্পদৈর্ঘ্যের ভিডিও প্রকাশ করেছে যেখানে উফএফও অর্থাৎ 'আনআইডেন্টিফায়েড ফ্লাইং অবজেক্ট', বাংলায় 'অজ্ঞাতপরিচয় উড়ন্ত বস্তু' দেখা গিয়েছে।

এই ভিডিওগুলি অবশ্য এর আগেই একটি বেসরকারি সংস্থা প্রকাশ করেছিল। তবে সরকারিভাবে ভিডিওগুলি স্বীকৃতি পায়নি বলে, ভিডিওগুলি আসল না নকল, তাই নিয়ে প্রশ্ন ছিল জনমানসে। এদিন সব দ্বিধা দ্বন্দ্বের অবসান ঘটল। ইনফ্রারেড ক্যামেরায় রেকর্ড করা ভিডিওগুলিতে যে অজ্ঞাতপরিচয় উড়ন্ত বস্তুগুলি-কে দেখা গিয়েছে, তার প্রত্যেকটিই অত্য়ন্ত দ্রুতগামী। ভিডিওগুলির দুটিতে মার্কিন নৌসেনার বিমানচালকদের এই গতিতে বিস্মিত হওয়ার প্রতিক্রিয়া পাওয়া গিয়েছে। তবে একজন সেই ভিডিওতে সন্দেহ করেছেন বস্তুটি কোনও ড্রোন হতে পারে।

নৌবাহিনী এর আগে গত বছর সেপ্টেম্বর মাসে ভিডিওগুলি সত্যি বলে মেনে নিয়েছিল। পেন্টাগনের মুখপাত্র সু গফ এদিন জানান, ফুটেজগুলি প্রকাশিত হয়ে যাওয়ার পর থেকে জনমানসে অসীম কৌতূহল তৈরি হয়েছে। অনেকের সন্দেহ ভিডিওগুলিতে হয়তো আরও কিছু রয়েছে। সেইসবের অবসান ঘটানোর জন্য এবং এই সম্পর্কে যাতে কোনও ভ্রান্ত ধারণা তৈরি না হয়, তার জন্য এই ভিডিওগুলির আনুষ্ঠানিক মুক্তি দেওয়া হল।

তার আগে অবশ্য মার্কিন নৌসেনার পক্ষ থেকে ভিডিও ফুটেজগুলি পুঙ্খানুপুঙ্খ পর্যালোচনা করা হয়েছে। ভিডিওগুলির প্রকাশ করলে মার্কিন প্রতিরক্ষা বিভাগের কোনও সংবেদনশীল ক্ষমতা বা তথ্য প্রকাশ পাবে না, সেই বিষয়ে নিশ্চিত হয়েই এই ভিডিওগুলির আনুষ্ঠানিক মুক্তি দেওয়া হয়েছে। তবে তাঁরা একে ইউএফও বলছেন না, তাঁদের মতে এগুলি 'ইউএফপি' অর্থাৎ 'আনআইডেন্টিফায়েড ফ্লাইং ফেনোমেনা', বাংলায় 'অজ্ঞাত উড়ন্ত বস্তুর ঘটনা'। একটি ভিডিও ২০০৪ সালের নভেম্বর মাসে এবং বাকিদুটি ২০১৫ সালের জানুয়ারি মাসে নৌসেনাবাহিনীর বিমানচালকরা তুলেছিলেন। গফ আরও জানিয়েছেন, এখন থেকে এই ধরণের 'অজ্ঞাতপরিচয় উড়ন্ত' ব্যাপার-স্যাপার অর্থাৎ সম্ভাব্য ইউএফও দেখলে নৌবাহিনীর বিমানচালকদের রিপোর্ট করার বিষয়ে আনুষ্ঠানিক নির্দেশিকা জারি করা হয়েছে।

২০১৭ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০১৮-র মার্চ মাসের মধ্যে এই ভিডিও তিনটি প্রকাশ করেছিল 'দ্য স্টার একাডেমি অফ আর্টস অ্যান্ড সায়েন্সেস' নামে এক বেসরকারি সংস্থা, যারা 'ইউএফও' নিয়েই চর্চা করে। ২০১৭ সালেই ওই ভিডিওগুলি রেকর্ড করা পাইলটদের একজন, ইউএস নেভির অবসরপ্রাপ্ত পাইলট ডেভিড ফ্রেভার সংবাদমাধ্যমকে বলেছিলেন, ওই উড়ন্ত বস্তুগুলি এমন মসৃণভাবে উড়ছিল, যা ব্যাখ্যা করা তাঁর সাধ্যের বাইরে। তিনি আরও জানিয়েছিলেন, তাঁর বিমান ওই বস্তুটির কাছাকাছি আসতেই, দেওয়ালে ধাক্কা লেগে একটি পিংপং বল যেমন উল্টো দিকে ছিটকে যায়, সেইরকম আকস্মিকভাবে সেটি দ্রুত দক্ষিণ দিকে ধাবিত হয়ে, দুই সেকেন্ডেরও কম সময়ে অদৃশ্য হয়ে গিয়েছিল।

২০০৭ সালেই পেন্টাগনে এই অজানা উড়ন্ত বস্তুগুলির তথ্য অধ্যয়নের জন্য একটি প্রকল্প চালু করা হয়েছিল। কিন্তু ২০১২ সালে অর্থের অভাবে সেই প্রকল্প বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। ওই প্রকল্পের প্রাক্তন প্রধান লুইস এলিজন্ডো সাফ জানিয়েছেন, তাঁদের কাছে যে জোরালো প্রমাণ ছিল, তা থেকে পরিষ্কার বলা যায় মানুষ একা নয়। এই অজ্ঞাত বিমানগুলিতে এমন সব বৈশিষ্ট্য রয়েছে, বর্তমানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বা অন্য়ান্য কোনও দেশের হাতে সেই ধরণের প্রযুক্তি নেই। পেন্টাগনের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে ভিডিওগুলি প্রকাশের পর তিনি টুইট করে বলেছেন এতে তিনি 'সন্তুষ্ট', কিন্তু এখনও পেন্টাগন 'শুধু গবেষণা এবং উপলব্ধ তথ্যের পৃষ্ঠদেশে আঁচড় কাটছে। তল অনেক গভীরে'।

স্বাভাবিকভাবেই এই ঘটনা শোরগোল ফেলে দিয়েছে নেট দুনিয়ায়। প্রথমে করোনাভাইরাস মহামারি, তারপর গ্রহাণুর সরাসরি পৃথিবীতে আছড়ে পড়ার হুমকি, সেইসঙ্গে অজানা উড়ন্ত বস্তুতে ভিনগ্রহীদের আনাগোনা - অনেকেই বলছেন ২০২০ সালটা যেন পৃথিবী ধ্বংসের মুখে এই থিমে বানানো হলিউডি ফিল্মগুলির মতো।