ছবি কি কখনও নির্বাক হয়?  মুহুর্তকে ফ্রেমে ধরে ফেলা হয়ত সহজ, কিন্তু তার পিছনে থেকে যায় অনেক কথা। গোটা পৃথিবীর হয়ে শান্তি ঘোষণা করা যে ছবিটিকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী দুনিয়া আজও ভুলতে পারেনি।

আজ থেকে ৭৫ বছর আগের ঘটনা। তবু চুম্বনের কথায় ভেসে ওঠে ১৯৪৫ সালের ১৪ অগস্ট নিউ ইয়র্কের টাইমস স্কোয়ারের সেই দৃশ্য। নাবিক যুবকটির পড়নে কালো ব্লেজার আর মাথায় টুপি। আচমকা  চলে এলেন এক তরুণীর একেবারে কাছে। তার পরনে সাদা অ্যাপ্রন। বোঝা যাচ্ছিল পেশায় তিনি একজন নার্স। তার পরেই সেই অমর হয়ে যাওয়া মুহূর্ত। সাদা আর কালো ডুবে গেলেন গভীর চুম্বনে।  দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার পরেই তোলা সেই ছবি আজও অমর চিত্রকথা। 


বহুকাল পর্যন্ত ওই নাবিক এবং নার্সের পরিচয় অজানা থেকে গিয়েছিল। ২০১২ সালে লরেন্স ভেরিয়ার লেখা ‘দ্য কিসিং সেলর: দ্য মিস্ট্রি বিহাইন্ড দ্য ফটো দ্যাট এন্ডেড ওয়ার্ল্ড ওয়ার টু’ বইতে পাওয়া যায় ওই দু’জনের নাম এবং পরিচয়।

১৯৪৫ সালে আমেরিকার সেনার কাছে আত্মসমপর্ণ অন্যতম বড় শরিক জাপান। খবর পেয়েই রাস্তায় নেমে পড়ে নিউইর্কের মানুষ। তাঁদেরই একজন ২১ বছরের গ্রেটা। মেন্ডোসা তখন ২১। সেই বিজয়ের উল্লাসের মধ্যেই আচমকা দৌড়ে এসে আনন্দে আত্মহারা জর্জ মেন্ডোসা চুমু খেয়েছিলেন গ্রেটার কোমর জড়িয়ে ধরে। টাইমস স্কোয়ারের কাছে রেডিও সিটি মিউজিক হলে একটি কনসার্ট শুনতে গিয়েছিলেন তিনি। আনন্দে সেখান থেকেই দৌড়ে বেরিয়ে আসেন তিনি। গ্রেটা ও জর্জের সেই গভীর চুম্বনের ছবিটি তুলেছিলেন চিত্রসাংবাদিক আলফ্রেড আইজেনস্টাট। 

এক সপ্তাহ পর ছবিটি মার্কিন সাময়িকী লাইফ-এ প্রকাশিত হয়। ছবির ক্যাপশন ছিল ‘ভিজে ডে ইন টাইমস স্কয়ার’। কিন্তু ছবিটির কথা তখনই জানতে পারেননি গ্রেটা। প্রায় ১৫ বছর পরে, আলফ্রেডের ছবির বইতে দেখেছিলেন তিনি।  

মজার ব্যাপার হল, ওই সময়েই সেখানে উপস্থিত ছিলেন মেন্ডোসার প্রেমিকা রিটা পেট্রিও, তিনিও পেশায় নার্স ছিলেন। এমনকি ওই ছবিতে রিটাও ক্যামেরাবন্দী হন। চুম্বনরত মেনডোনসা ও গ্রেটার ঠিক পেছনেই ছিলেন তিনি। অবশ্য প্রেমিকের এমন কাণ্ডে রিটা মোটেই বিরক্ত হননি। সাত দশক মেনডোনসার সঙ্গে কেটেছে। 
বছর তিনেক আগে ৯২ বছর বয়সে প্রয়াত হন সেই ছবির নায়িকা গ্রেটা ফ্রিডম্যান। তারপর মারা যান সেদিনের সেই নাবিক জর্জ মেন্ডোসা। কিন্তু স্মৃতি হয়ে রয়ে গিয়েছে টাইমস স্কোয়ারে দাঁড়িয়ে থাকা ২৫ ফুট দীর্ঘ সেই চুম্বন মুহূর্তের ভাস্কর্য— 'আনকন্ডিশনাল স্যারেন্ডার'; যার অর্থ, নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ। 

গ্রেটার বাবা মা দুজনেই জার্মান হলোকাস্টের শিকার। ১৫ বছর বয়সে অস্ট্রিয়া ছেড়ে পালিয়ে আসেন তিনি। বিংশ শতাব্দীর অন্যতম আইকনিক সেই ছবির নায়িকা হওয়া নিয়ে তাঁর কি বিশেষ কোনও অনুভূতি ছিল? তবে ফটোগ্রাফির ইতিহাসে অক্ষয় হয়ে রয়েছে ‘দ্য কিস’-এর অন্যতম চরিত্র গ্রেটা। যুদ্ধশেষে ঘরে ফেরার বাঁধনহারা আনন্দর অন্যতম প্রতীক হিসেবে।