চিনের করোনাভাইরাস নিয়ে সারা বিশ্ব আতঙ্কিত। ইতিমধ্যে দুশোর বেশী মানুষের মৃত্যু হয়েছে। আক্রান্তের সংখ্যা সাড়ে ৯ হাজার ছাড়িয়ে গিয়েছে। চিনের সঙ্গে যোগাযোগ আপাতত বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে অনেক দেশ। নতুন করোনাভাইরাসের হানায় অ্যাপল-সহ বেশ কয়েকটি বড় মার্কিন কোম্পানি বড় ধরনের লোকসানের হিসাব কষতে শুরু করেছে।

 খোদ আমেরিকাতে নীরবে প্রাণ হরণ করছে আরেকটি ভাইরাস। কিন্তু তা নিয়ে তেমন হইচই নেই। সেই ভাইরাসে এরই মধ্যে দেড় কোটি আমেরিকান আক্রান্ত। মারা গিয়েছেন ৮ হাজার ২০০ জনেরও বেশি। 

আমেরিকায় এক দশকের মধ্যে এই ভাইরাস সবচেয়ে মারাত্মক আকার নেবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব অ্যালার্জি অ্যান্ড ইনফেকশাস ডিজিজেস সেরকমই বলছে। সংস্থাটির হিসাব   অনুসারে এখন পর্যন্ত কমপক্ষে ১ লাখ ৪০ হাজার মানুষ ওই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। সংখ্যা দ্রুত আরও বাড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। 

আমেরিকায় ফ্লু একটি সাধারণ স্বাস্থ্য সমস্যা। যে কারণে এই রোগ ক্রমশ প্রাণঘাতি হয়ে উঠলেও  সবার দৃষ্টি এড়িয়ে যায় বলে জানান ডা. মার্গোট স্যাভয়। টেম্পল ইউনিভার্সিটির লুইস কাৎজ স্কুল অব মেডিসিনের ফ্যামিলি অ্যান্ড কমিউনিটি মেডিসিনের চেয়ারম্যান ডা. মার্গোট বলেন, ‘শীতকালেই আমরা বেশি ভাইরাসজনিত স্বাস্থ্য সমস্যায় পড়ি। এই কারণে একটি প্রবণতা দেখা যায় যে, আমরা সব সমস্যাকেই সাধারণ ঠাণ্ডা লাগা বলে ভেবে বসি। ইনফ্লুয়েঞ্জা যে কতটা মারাত্মক হতে পারে সেটা আমরা ভুলে যাই’। 

ডক্টর স্যাভয় বলেন, প্রতি বছর ইনফ্লুয়েঞ্জায় মৃত্যু বাড়ছে। সেন্টার ফর ডিজিস কন্ট্রোলের বক্তব্য অনুযায়ী, অদূর ভবিষ্যতে আমেরিকায় শুধু ফ্লুতে আক্রান্ত হয়ে প্রতি বছর গড়ে কমপক্ষে ১২ হাজার মানুষ মরবে। যেখানে ২০১৭-১৮তে প্রায় ৬১ হাজার মানুষ মারা গেছে, আক্রান্ত হয়েছে ৪ কোটি ৫০ লাখ। চলতি ২০১৯-২০তে এখন পর্যন্ত ১ কোটি ৫০ লাখ মানুষ ফ্লুতে আক্রান্ত হয়েছে এবং মারা গেছে ৮ হাজার ২০০ জন। এর মধ্যে কমপক্ষে ৫৪টি শিশু। 

সিডিসির প্রতিবেদন অনুযায়ী, টানা ১১ সপ্তাহ ধরে ফ্লু আক্রান্তের সংখ্যা বেড়েছে। সামনে আরও কয়েক সপ্তাহ এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকবে। ডা. স্যাভয় আমেরিকান একাডেমি অব ফ্যামিলি ফিজিশিয়ান বোর্ডের পরিচালকও। তিনি বলেন, চিনের নতুন করোনাভাইরাসের আতঙ্ক আমেরিকার এই ফ্লু-র ভয়াবহতাকে আড়াল করে দিতে পারে। মানুষ ফ্লু নিয়ে ভয় পায় না কারণ স্বাস্থ্য সংস্থা সবসময় এটিকে ‘নিয়ন্ত্রণে আছে’ বলে দেখান। তিনি এও বলেন, আমরা অজানাকে ভয় পাই। যে কারণে নতুন ভাইরাস সংক্রমণ নিয়ে আমাদের মনোযোগ বেশি।  কিন্তু কোনটি সত্যিকার অর্থে আমাদের জন্য বিপদ আর কোনটা নয়, এটা তাৎক্ষণিকভাবে বলা মুশকিল। এই কারণেই আমরা যা নিয়ে আতঙ্কিত হয়ে পড়ি হয়ত সেটি আতঙ্কিত হওয়ার মতো বিষয়ই নয়। 

ফ্লু কীভাবে প্রাণঘাতি হতে পারে তার ব্যাখ্যা দিয়েছেন ইউনিভার্সিটি অব মিনেসোটার মেডিকেল স্কুলের শিশুরোগ বিভাগের অধ্যাপক ডা. নাথান চমিলো। তিনি বলেন, সাধারণ রোগ হওয়ার কারণে ফ্লুর ভয়াবহতাকে ছোট করে দেখা হয়। কিন্তু রোগটিকে গুরুত্ব দেওয়া উচিত। ফ্লু যখন মারাত্মক আকার ধারণ করে তখন কিন্তু অবস্থা সাধারণ থাকে না, বিপজ্জনক রূপ নিতে পারে কারণ, এর ফলে দ্বিতীয় ধাপের সংক্রমণ শুরু হয়ে যেতে পারে। মূলত রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকলে এটি হয়। ব্যাকটেরিয়া এবং ভাইরাস সংক্রমণ একসঙ্গে হলে ফ্লুর উপসর্গগুলো জটিল রূপ ধারণ করে। যাদের নিয়মিত রোগ-বালাই লেগে থাকে ফ্লু তাদের জন্য বেশি বিপজ্জনক। দুর্বল স্বাস্থ্যের লোকেরা ফ্লু আক্রান্ত হলে যেসব জটিলতা দেখা দিকে পারে যার মধ্যে নিউমোনিয়া, হৃৎপিণ্ড ও মস্কিষ্কের প্রদাহ এবং লিভার, কিডনি বিকল হয়ে যাওয়া অন্যতম। এ ধরনের জটিলতায় মৃত্যু পর্যন্ত ঘটতে পারে। 

ভাইরাস কখনও কখনও অ্যান্টিজেনিক শিফট ঘটায়। তখন সম্পূর্ণ নতুন প্রজাতি তৈরি হয়। সেই প্রজাতিকে প্রতিরোধ করার মতো কোনও ব্যবস্থা শরীরে থাকে না। ফলে ওই ভাইরাস তখন মারাত্মক আকার ধারণ করে। সোজা কথায়, মানবশরীর তার পরিচিত জীবাণুর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ব্যবস্থা তৈরি করে রাখে। ফলে সে সব জীবাণু শরীরে প্রবেশ করলেও ক্ষতি করতে পারে না। কিন্তু সম্পূর্ণ নতুন ধরনের জীবাণুর আক্রমণ হলে শরীর তাকে শনাক্ত করতেও ব্যর্থ হয়। 

তাহলে এ ধরনের জটিলতা থেকে বাঁচার উপায় কী? ডক্টর স্যাভয় এবং চমিলো বলছেন, একটাই উপায়- ফ্লুর টিকা নেওয়া। এর ফলে একেবারে নতুন প্রজাতির সৃষ্টি না হওয়া পর্যন্ত কোনও ভাইরাস কারও শরীরের মারাত্মক ক্ষতি করতে পারবে না।