কিছু ব্যতিক্রম নিশ্চয়ই রয়েছে। কিন্তু, তারপরেও রাজ্যের প্রায় সর্বত্রই তৃণমূল কংগ্রেসের স্থানীয় নেতাদের বিরুদ্ধে মানুষের তিনটি অভিযোগ - দুর্নীতি, গুন্ডামি, ঔদ্ধত্য। সবচেয়ে বড় কথা হল, এইসব অভিযোগ করারও উপায় নেই। শাসক দলের বিরুদ্ধে কথা বললেই, তার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে শাসকের হায়নারা। বেশ কয়েকটি রাস্তা আছে - কখনও শারীরিক আক্রমণ, মিথ্যা মামলা দায়ের, সরকারি প্রকল্পের সুবিধা থেকে বঞ্চিত করা।

কংগ্রেস এবং বিজেপি কর্মীরা এই অত্যাচারের মুখোমুখি হলেও, এর অধিকাংশটাই সইতে হয়েছে স্থানীয় বাম নেতৃত্ব এবং সমর্থকদেরই। ২০১৮ সালের পঞ্চায়েত নির্বাচনের আগে-পরের সময়ে এই অবস্থা চরমে উঠেছিল। বস্তুত ২০১৬ সালের পর থেকেই রীতিমতো নিয়মতান্ত্রিকভাবে তৃণমূল কংগ্রেস সরকার চেয়েছিল তাদের প্রাথমিক শত্রু সিপিএম-কে একেবারে নির্মূল করে দিতে। আর সেই পথেই এগোতে এগোতে নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছিল তৃণমূল। অলক্ষ্যেই তৈরি হয়ে গিয়েছিল আরও বড় শত্রু বিজেপি।

২০১৮ সালের পঞ্চায়েত ভোটের পর থেকেই সিপিএম এবং কংগ্রেস সমর্থকরা মুখ ফেরাতে শুরু করেছিলেন তাঁদের দলের দিক থেকে। বুঝে গিয়েছিলেন, সংগঠন দুর্বল হতে হতে এমন জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে, যে রাজ্যের নেতারা তাঁদের নিরাপত্তা দিতে পারবেন না। আর সেই সময়ই তাঁদের সামনে বিকল্প হিসাবে দেখা দিয়েছিল বিজেপি। কেন্দ্রে গেরুয়া দলের সরকার রয়েছে। তারা রাজ্যের শাসকদের হাত থেকে তাঁদের বাঁচাতে পারবেন, এই ভরসা থেকেই দলে দলে বাম সমর্থকরা গেরুয়া শিবিরে যোগ দিতে শুরু করেছিলেন।

আর, এই প্রবণতাকেই কাজে লাগিয়েছিলেন বিদেপির কেন্দ্রীয় ও রাজ্য স্তরের নেতারা। মোদী-শাহ জুটির ক্যারিশমাকে কাজে লাগিয়ে সেই যোগদান মেলাকে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন তাঁরা। অর্থাৎ মানুষের মনে তৃণমূলের বিরুদ্ধে যে ঘৃণা, রাগ জমেছিল, কেন্দ্রে সরকার থাকার সুবাদে ফোকটে তার লাভ তুলেছে বিজেপি। আর মানুষ এমনই এককাট্টা, যে বিজেপির সাংগঠনিক দুর্বলতা, স্থানীয় নেতার অভাবকেও তারা বিশেষ গায়ে মাখছেন না। ব্যক্তি নয়, প্রতীক দেখেই বিজেপিকে ভোট দিতে তৈরি তারা।

সমর্থকদের এই দলে দলে দলবদলের পর বর্তমানে রাজ্যে দেখা যাচ্ছে দলে দলে বিজেপি নেতাদের বিজেপিতে যোগদানের মেলা। মানুষ গেরুয়া শিবিরে ভিড় করার পর এখন নেতারাও জনগণের মেজাজ বুঝে জয়ের তরীতে উঠতে চাইছেন। তার উপর সামনেই নির্বাচন। পুরোনো দলের বিরুদ্ধে মানুষের রাগ-ঘৃণার দায় কে যেচে মাথায় নিতে চাইবেন? কাজেই কয়েক মাসের মধ্যেই বিজেপি পেয়ে গিয়েছে শুভেন্দু অধিকারী, রাজীব বন্দ্যোপাধ্যায়দের মতো দক্ষ সংগঠক তথা জননেতাদের।

বাংলার রাজনীতিতে বিজেপির কাছে তৃণমূল জমি হারাতে শুরু করেছিল, 'আগে রাম, তারপর বাম' - এই স্লোগানকে ঘিরে। তবে বর্তমানে অবস্থা এমন জায়গায় চলে এসেছে যে, সেই স্লোগান পিছনে চলে গিয়ে পড়ে থাকছে শুধুই 'জয় শ্রী রাম'।