তাপস দাস, প্রতিনিধি- সাধারণ মানুষ। আম আদমি। ভারতের অগণিত মানুষের জন্য বহুবিধ প্রকল্পের কথা ঘোষণা করেছে বর্তমান কেন্দ্রীয় সরকার। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য ১৫টি প্রকল্পের কথা এখানে আলোচিত হল।

১. আয়ুষ্মান ভারত- স্বাস্থ্যই সম্পদ। ভারতবাসীর চিকিৎসার জন্য কেন্দ্রীয় সরকারের এই প্রকল্প। প্রকল্পর পুরো নাম আযুষ্মান ভারত প্রধানমন্ত্রী জন আরোগ্য যোজনা। ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বর মাসে দেশের স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রক এই প্রকল্পের সূচনা করে। প্রকল্পের দেখভালের জন্য পরবর্তী কালে গঠিত হয় জাতীয় স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ। এটি বিশ্বের বৃহত্তম সরকারি স্বাস্থ্য প্রকল্প, যার আওতায় ৫০ কোটি ভারতবাসীকে বিনা খরচে হেলথকেয়ারের সুযোগ দেওয়া হবে। এই প্রকল্পের আওতায় তালিকাভুক্ত হাসপাতাল থেকে প্রতিটি পরিবার বছরে ৫ লক্ষ টাকার বিনা খরচে চিকিৎসার সুযোগ পাবেন। এর মধ্যে সরকারি ও বেসরকারি দু ধরনের হাসপাতালই রয়েছে। ২০১১ সালের সেন্সাসের হিসেবে আর্থসামাজিক ও জাতিগত অবস্থান বিবেচনা করে কারা এই সুবিধা পাবেন তা স্থির করা হয়। 

২. অটল পেনশন যোজনা- ২০১৫ সালে কলকাতায় এই প্রকল্পের কথা ঘোষণা করেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। মূলত যেসব মানুষ অসংগঠিত ক্ষেত্রের কর্মী, তাঁদের পেনশনের জন্য এই প্রকল্প। যাঁরা করদাতা নন এবং যাঁরা অন্য কোনও রকম সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্পের আওতাধীন নন, তাঁদের জন্যই এই প্রকল্প। এই প্রকল্পের আওতায়, সরকার বছরে ১০০০ টাকা বা ওই কর্মীর রোজগারের ৫০ শতাংশ প্রতি বছরে জমা করবে। অটল পেনশন যোজনায় অন্তর্ভুক্তির ন্যূনতম বয়স ১৮ বছর ও ঊর্ধ্বতম বয়স ৪০ বছর। ৬০ বছর বয়সে পৌঁছলে ওই পেনশন পাওয়া যাবে। 

৩. প্রধানমন্ত্রী জন ধন যোজনা- ২০১৪ সালের ২৮ অগাস্ট প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এই প্রকল্প ঘোষণা করেছিলেন। এ প্রকল্পের স্লোগান- মেরা খাতা, ভাগ্যবিধাতা। এই প্রকল্পের উদ্দেশ্য সমস্ত ভারতবাসীর অন্তত একটি করে ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট। প্রথম সপ্তাহেই এই প্রকল্পের সাফল্য ছিল সাড়া জাগানো। রেকর্ড সংখ্যক ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট খুলেছিলেন ভারতবাসী। গিনেজ বুক অফ ওয়ার্লড রেকর্ডও তা স্বীকার করেছে। শুধু শুরুতে ভাল পারফরম্যানস করেই মুখ থুবড়ে পড়েনি এই প্রকল্প। ২০২১ সালের জানুয়ারি মাস পর্যন্ত এই প্রকল্পের আওতায় ৪১.৭৫ কোটি ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট খোলা হয়েছে। 

৪. প্রধানমন্ত্রী উজ্জ্বলা যোজনা- ২০১৬ সালের মে মাসে এই প্রকল্প উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। দারিদ্র্যসীমার নিচে অবস্থিত ৫ কোটি মানুষের কাছে বিনামূল্যে রান্নার গ্যাস দেওয়া এই প্রকল্পের অন্তর্ভুক্ত। পরিবারের একজন মহিলা সদস্যের নামে এই গ্যাসের সংযোগ দেওয়া হয়। গ্যাসের ভরতুকির অর্থ জমা পড়ে ওই মহিলার ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে। গ্যাসের কানেকশনের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ দেয় সরকারই। গ্রাহককে কিনতে হয় সিলিন্ডার ও ওভেন। সেই ওভেন ও প্রথম সিলিন্ডারের দাম ভর্তুকির টাকা থেকে কিস্তিতে মেটানোর সুযোগ মেলে। প্রথম ছ’টি সিলিন্ডারের ভর্তুকি ব্যাঙ্কে জমা পড়ে। সপ্তম সিলিন্ডারের ভর্তুকি থেকে ঋণের কিস্তি শোধ শুরু। এক্ষেত্রে নিয়মাবলী হল, পরিবারের আগে কোনও গ্যাস সংযোগ থাকা চলবে না। রেশন কার্ড ও আধার কার্ড থাকা বাধ্যতামূলক। বাধ্যতামূলক ব্যাঙ্কে অ্যাকাউন্ট থাকাও। 

৫. অমৃত বা অম্রুত- অটল মিশন ফর রেজুভিনেশন অ্যান্ড আরবান ট্রান্সফরমেশন প্রকল্পের ডাকনাম। এই প্রকল্পের মুখ্য উদ্দেশ্য শহরাঞ্চলের প্রতিটি বাড়িতে কলের মাধ্যমে পর্যাপ্ত জল পৌঁছনো ও যথাযথ নিকাশির বন্দোবস্ত করা। পশ্চিমবঙ্গের মোট ৫৫টি শহর এলাকা এই প্রকল্পের আওতায়। এই শহরগুলির গড় জনসংখ্যা এক লক্ষের উপর। এই প্রকল্প সম্পূর্ণ হবার প্রাথমিক সময়সীমা ২০২২ সাল। 

৬. ডিজিটাল ইন্ডিয়া- ২০১৫ সালে এই প্রকল্প ঘোষণা করা হয়। এর উদ্দেশ্য প্রতিটি ভারতবাসীকে সমস্ত সরকারি সুযোগসুবিধা ইলেকট্রনিক মাধ্যমে পৌঁছে দেওয়া, এবং টেলিকম দুনিয়ায় ভারতের ক্ষমতা প্রতিষ্ঠিত করা। ২০২১ সালে এসে দাঁড়িয়ে স্পষ্টতই বলা যায়, এই প্রকল্প বহুলাংশে সফল হয়েছে। সার্বিক ডিজিটাল সাক্ষরতা, নিরাপদ ডিজিটাল পরিকাঠামো, এবং সরকারি পরিষেবা ই মাধ্যমে মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া- যে তিন উদ্যোগ নিয়ে এই প্রকল্প সূচিত, তা সাধারণ্যে পৌঁছিয়েছে এ কথা নিশ্চিত ভাবেই বলা চলে। আধার, প্যান, ইপি এফও, এরকম সমস্ত পরিষেবাই এখন মানুষের নাগালের মধ্যে স্রেফ ডিজিটাল মাধ্যমেই। 

৭. স্বচ্ছ ভারত মিশন- ২০১৪ সালে এই প্রকল্পের সূচনা হয়। এর উদ্দেশ্য ছিল ২০১৯ সালের মধ্যে খোলা জায়গায় বর্জ্যত্যাগ পরিহার। স্বচ্ছ ভারত অভিযানের দুটি পর্যায়, একটি গ্রামীণ ও অন্যটি শহরাঞ্চলের জন্য। পাঁচ বছর সময়কালে স্বচ্ছ ভারত প্রকল্পে মোট সাড়ে ন কোটি শৌচাগার তৈরি হয়। 

৮. নমামি গঙ্গে- ২০১৪ সালে ম্যাডিসন স্কোয়ারের ভাষণে গঙ্গা সম্পর্কে বলতে গিয়ে মোদী বলেছিলেন, “যদি এই নদীকে আমরা পরিচ্ছন্ন করে তুলতে পারি, তা হলে দেশের ৪০ শতাংশ মানুষের বিরাট উপকার হবে। তাই, গঙ্গাকে পরিষ্কার করার কাজটি এক ধরনের অর্থনৈতিক কর্মসূচিও বটে”। ওই বছর বারাণসী লোকসভা কেন্দ্র থেকে নরেন্দ্র মোদী জয়ী হন। তার পরেই গঙ্গাকে দূষণমুক্ত করতে নমামি গঙ্গে প্রকল্পের ঘোষণা করা হয়। এই প্রকল্পের জন্য বরাদ্দ করা হয়েছে ২০ হাজার কোটি টাকা। 

৯. স্মার্ট সিটি- ২০১৫ সালের ২৫ মে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ১০০ স্মার্ট সিটি প্রকল্প ঘোষণা করেন। ১০০ স্মার্ট সিটি উন্নয়ন ও আরও ৫০০ শহরের পুনরুজ্জীবনের জন্য ধার্য করা হয় ৯৮ হাজার কোটি টাকা। এই প্রকল্পে দেশের বিভিন্ন শহরের উন্নয়ন ও কর্মসংস্থান বাড়ানোর এবং নাগরির পরিষেবার উন্নতির কথা বলা হয়েছে। প্রথম ধাপে ভারতের ১০০ টি শহরকে "স্মার্ট সিটি প্রকল্পের" আওতায় আনা হয়েছে। স্মার্ট সিটি-র কোনও বাঁধাধরা সংজ্ঞা নেই। ইউরোপে স্মার্ট সিটি-র যে চেহারা, ভারতে যে তেমনটাই হবে, তা নয়। আবার ভারতেও এক-একটি স্মার্ট সিটি-র চেহারা এক-এক রকমের হতে পারে। তবে জল ও বিদ্যুৎ সরবরাহ, জঞ্জাল ব্যবস্থাপনা, গণ পরিবহণ, গরিবদের জন্য সস্তায় আবাসন, তথ্যপ্রযুক্তি পরিকাঠামো ও ডিজিটাল সংযোগ, ই-গভর্ন্যান্স, পরিবেশবন্ধু প্রযুক্তি, মহিলা-শিশু-বৃদ্ধদের সুরক্ষা এবং স্বাস্থ্য এবং শিক্ষার মতো দশটি মূল পরিকাঠামোর দিকে বিশেষ নজর থাকতেই হবে।

১০. প্রধানমন্ত্রী আবাস যোজনা- ২০২২ সালের ৩১ মার্চের মধ্যে দরিদ্র মানুষেরা সকলে যাতে নিজস্ব আবাস পান, সেই উদ্দেশ্যে এই প্রকল্প। ২০১৫ সালের জুন মাসে এই প্রকল্প ঘোষিত হয়। এই প্রকল্পের আওতায় অর্থনৈতিক দুর্বল ও নিম্ন আয়ের মানুষদের জন্য ২ কোটি বাড়ির বন্দোবস্ত হবার কথা। এর জন্য কেন্দ্রীয় সরকার ২ লক্ষ কোটি টাকা ব্যয় করবে। ৭০ বছর বয়স পর্যন্ত যে কোনও ভারতীয় এই প্রকল্পের সুবিধা পাবার যোগ্য। 

১১, সুকন্যা সমৃদ্ধি যোজনা- ২০১৫ সালের ২২ জানুয়ারি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এই প্রকল্পের সূচনা করেন। কন্যাসন্তানদের পিতা-মাতার সঞ্চয়ের জন্য এই প্রকল্প। এই প্রকল্পের সুদের হার ৭.৬ শতাংশ। করের সুবিধাও মেলে এই প্রকল্পে সঞ্চয় করলে। দেশের যে কোনও ডাকঘর বা বাছাই কিছু ব্যাঙ্কে এই প্রকল্পে অ্যাকাউন্ট খোলা যায়। কন্যাসন্তান জন্মানোর সময় থেকে শুরু করে কন্যার বয়স ১০ বছর হওয়া পর্যন্ত যে কোনও সময়ে এই অ্যাকাউন্ট খোলা যাবে। দুটি পর্যন্ত অ্যাকাউন্ট কোনও পিতা-মাতা খুলতে পারবেন। অ্যাকাউন্ট খোলার জন্য লাগে ২৫০ টাকা। এর পর ১০০ টাকার যে কোনও গুণিতকে টাকা জমা করা যায়। তবে মোট সঞ্চয়ের ঊর্ধ্বসীমা দেড় লক্ষ টাকা। 

১২. বেটি বাঁচাও, বেটি পড়াও- ২০১৫ সালের ২২ জানুয়ারি হরিয়ানার পানিপথে বেটি বাঁচাও, বেটি পড়াও প্রকল্পের সূচনা করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। লিঙ্গানুপাতে যে বৈষম্য রয়েছে, তা দূর করাই এই প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য। কন্যাসন্তানের জন্মহার ক্রমশ হ্রাস পাওয়া এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলির কার্যকর মোকাবিলায় এই কর্মসূচিটির কথা চিন্তাভাবনা করা হয়। একইসঙ্গে নারীর ক্ষমতায়নের বিষয়টিকে যুক্ত করা হয় এই কর্মসূচির বিশেষ ধারণাটির সঙ্গে। কেন্দ্রীয় নারী ও শিশুবিকাশ মন্ত্রক, স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রক এবং মানবসম্পদ মন্ত্রকের পারস্পরিক প্রচেষ্টার সমন্বয়ে রূপায়িত হচ্ছে ‘বেটি বাঁচাও, বেটি পড়াও’ কর্মসূচি। 

৩. প্রধানমন্ত্রী কৌশল যোজনা- দিনমজুর ও সম্ভাব্য দিনমজুরদের জন্য এই প্রকল্প। এ ধরনের মানুষদের মধ্যেকার বিশেষ দক্ষতা চিহ্নিত করা এবং তাঁদের প্রশিক্ষণ দেওয়া এই প্রকল্পের উদ্দেশ্য। যাঁদের ইতিমধ্যেই দক্ষতা রয়েছে তাঁদের চিহ্নিত করে পুরস্কার দেওয়া হয় এই প্রকল্পে। পুরস্কার মূল্য ২ থেকে আড়াই হাজার টাকা। যাঁরা এই প্রকল্পে প্রশিক্ষণ নিয়ে যোগ্যতা অর্জন করবেন, তাঁদের মধ্যে সেরাদের ৮ হাজার টাকা করে পুরস্কার দেওয়া হয় এই প্রকল্পে। ২০১৬-২০২০ সময়কালে এক কোটি যুবককে এই প্রকল্পের আওতায় আনার লক্ষ্যমাত্রা স্থির করা হয়েছিল। 

১৪. প্রধানমন্ত্রী সুরক্ষা বিমা যোজনা- কলকাতায় ২০১৫ সালের ৮ মে এই প্রকল্প ঘোষণা করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। ১৮ থেকে ৭০ বছর বয়স্ক যে কোনও ভারতীয় বা অনাবাসী ভারতীয় এই প্রকল্পের আওতায় আসতে পারেন। এই বিমার প্রিমিয়াম বছরে ১২ টাকা ধার্য  করা হয়। এই প্রকল্পভুক্ত কারও মৃত্যু ঘটলে বা সম্পূর্ণত প্রতিবন্ধকতা হলে, ২ লক্ষ টাকা বিমার অঙ্ক পাওয়া যায়। আংশিক প্রতিবন্ধকতার ক্ষেত্রে এই অঙ্ক ১ লক্ষ টাকা। 

১৫. প্রধানমন্ত্রী জীবন জ্যোতি বিমা যোজনা- ওই একই দিনে এই প্রকল্প ঘোষণা করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। ১৮ থেকে ৫০ বছর বয়সী ভারতীয় নাগরিক ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট থাকলে এই বিমার সুবিধা পেতে পারেন। এই বিমার প্রিমিয়াম বছরে ৩৩০ টাকা। যে কোনও কারণে মৃত্যু ঘটলে নমিনি ২ লক্ষ টাকা পাবেন।