শামিকা মাইতি: কথায় বলে লগ্নির টানে লগ্নি আসে। বড় শিল্পের টানে আসে অনুসারী শিল্প। গুজরাটের সানন্দ মনে হয় এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ। পশ্চিমবঙ্গের সিঙ্গুরে জমি অধিগ্রহণ নিয়ে প্রবল বিরোধিতার মুখে পড়ে টাটারা যখন ন্যানো কারখানার জন্য নতুন ঘর খুঁজছে, তখন গুজরাটে সেই সময়ের মুখ্যমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী সরাসরি রতন টাটাকে এসএমএস করে লগ্নির আহ্বান জানিয়েছিলেন। বাকিটা ইতিহাস। ন্যানো উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেলেও ওই কারখানায় এখন ছোট যাত্রিবাহী গাড়ি তৈরি করছে টাটা। দুই শিফটে কাজ করছে প্রায় সাড়ে চার হাজার কর্মী। অনুসারী শিল্প হিসাবে আরও ৩০টি কারখানা গড়ে উঠেছে আশপাশে। সেখানেও দু'হাজারের বেশি কর্মী। সবচেয়ে বড় কথা, সানন্দে টাটা মোটরসের টানে গুজরাটে পরবর্তী কালে এসেছে ফোর্ড ইন্ডিয়া, মারুতি সুজুকি, হোন্ডা। আর সিঙ্গুরে সেখানে পড়ে রয়েছে ধূ ধূ জমি...এখনও সম্পূর্ণ ভাবে চাষাবাদের যোগ্য হয়নি। কাজের খোঁজে এলাকার বেকার যুবকরা পাড়ি জমাচ্ছেন ভিন্‌ রাজ্যে। কারণ সিঙ্গুরের আন্দোলন শুধু নিজের পায়ে কুড়ুল মারেনি, পুরো রাজ্যের শিল্পায়নের সম্ভাবনায় বালি ঢেলে দিয়েছে। 

আরও পড়ুন-সকাল ১১ পর্যন্ত সার্বিক ভোট পড়ল ৩৭ শতাংশ, জেনে নিন ৪ জেলার কি পরিস্থিতি...

২০০৬ সালে টাটাদের কারখানার জন্য হুগলির সিঙ্গুরে ৯৯৭ একর জমি অধিগ্রহণ করেছিল বামফ্রন্ট সরকার। এর মধ্যে ৩০০ একরের মতো জমিতে অধিগ্রহণে সায় দেয়নি চাষিরা। অনিচ্ছুক চাষিদের জমি ফেরানোর দাবিতে তৎকালীন বিরোধী নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আন্দোলন শুরু করেন। শেষমেশ টাটা কারখানা গুটিয়ে চলে যায় সানন্দে। কলকাতা থেকে সিঙ্গুরের যেমন দূরত্ব, আহমেদাবাদ থেকে সানন্দেরও তেমনই। সামনে চওড়া রাস্তা। সেখানে মোট ১,১০০ একর জমির মধ্যে ৭৪১ একর পায় টাটা মোটরস। সহযোগী যন্ত্রাংশ বানানোর জন্য রয়েছে ৩৫৯ একর। দু’বছর পর ২০১০ সালের জুন মাসে সানন্দে কারখানা চালু হয়ে যায়।

 

 

সিঙ্গুরের কী হল?

এক কথায়, কিছু হয়নি। খালি এই আন্দোলনের উপরে ভর করে ২০১১ সালে পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় এসেছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। প্রথমেই তিনি সিঙ্গুর আইন এনে জমি ফেরানোর সিদ্ধান্ত নেন আর চালু করেন সিঙ্গুর প্যাকেজ। ৩৬২৫টি পরিবার সেই সময় থেকে দু’টাকা কিলোগ্রাম দরে মাসে মাথাপিছু আট কেজি চাল, তিন কেজি গম পাচ্ছে। মাসে দু’হাজার টাকা ভাতাও পায় তারা। এদিকে, জমি নিয়ে মামলা গড়ায় সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত। ২০১৬-র ৩১ অগস্ট সুপ্রিম কোর্ট রায় দেয়, সিঙ্গুরে জমি অধিগ্রহণের প্রক্রিয়া যথাযথ অনুসরণ করা হয়নি। তাই এই জমি আগের অবস্থায় ফিরিয়ে দিতে হবে। এরপর কারখানার শেড সরিয়ে নেওয়ার জন্য রাজ্য সরকার টাটাদের নোটিস পাঠায়। কিন্তু টাাটারা আর ঘুরে তাকাতে রাজি ছিল না। ২০১৬ সালে পুজোর মুখে সিঙ্গুরের কারখানার কাঠামো ভেঙে ফেলে রাজ্য। মাটি ভরাট করে। ভেঙে ফেলা হয় পাঁচিল-রাস্তা। ভাঙা লোহার বিম, ইস্পাতের কাঠামো পরে প্রায় সাড়ে ১৭ কোটি টাকায় কিনে নেন কলকাতার এক লোহা ব্যবসায়ী। 

আরও পড়ুন-ঝরঝর করে কাঁদছেন নন্দীগ্রামের তৃণমূল এজেন্টের মা, আতঙ্কে বুথেই যেতে দিলেন না ছেলেকে...

রাজ্য কৃষি দফতর সূত্রে জানা গিয়েছে, সিঙ্গুরে কারখানা প্রকল্পের ৯৯৭ একর জমির মধ্যে কৃষিযোগ্য জমি প্রায় ৮৪৩ একর। সেখানে চাষ হচ্ছে। যদিও এলাকার চাষিদের অভিযোগ, সর্বত্র এখনও চাষযোগ্য হয়নি জমি। ২০২১ সালে বিধানসভা ভোটের প্রাক্কালে সিঙ্গুর ইস্যু নিয়ে বিরোধীরা সরব হওয়ার পর ওখানে অ্যাগ্রো ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্ক তৈরি করার কথা ঘোষণা করেছেন মমতা। বিরোধীরা তাতে আরও রেগে গিয়েছে। বিজেপির রাজ্য নেতৃত্বের দাবি, ‘এতদিন পরে মমতার চৈতন্য হয়েছে যে ওই মাটি আর চাষের উপযুক্ত নেই। তাই অ্যাগ্রো ইন্ডাস্ট্রি করার কথা বলে মানুষকে ধন্দে ফেলছে তৃণমূলের সরকার।‘ 

প্রসঙ্গত,  সিঙ্গুরে এবার তৃণমূলের প্রার্থী রাজ্যের মন্ত্রী বেচারাম মান্না। বিজেপির হয়ে লড়ছেন এই কেন্দ্রের বিদায়ী বিধায়ক তথা কৃষি জমি রক্ষা আন্দোলনের নেতা রবীন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য। তবে, কিনা ভোট আসলে হচ্ছে মোদীর সঙ্গে মমতার। সেই নরেন্দ্র মোদী, যিদি সানন্দে ন্যানো কারখানা ডেকে নিয়ে গিয়ে গুজরাতের শিল্প মানচিত্র বদলে দিয়েছেন এবং দেশের প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন। আর সেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যিনি সিঙ্গুর আন্দোলনের উপর ভর করে পশ্চিমবঙ্গের মসনদে বসে রয়েছেন এক দশক। মোদীর সানন্দ মডেল না মমতার সিঙ্গুর, বাংলার কিসে ভাল, ঠিক করতে হবে বাঙালিকে।