শ্রীশ্রী ঠাকুর রামকৃষ্ণের জন্মতিথিতে তাঁকে ‘স্বামী’ সম্বোধন করে প্রধানমন্ত্রী মোদীর পোস্ট ঘিরে বিতর্কে চরমে উঠেছে। মোদীর এই সম্বোধন নিয়ে আপত্তি তুলেছেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
শ্রীশ্রী ঠাকুর রামকৃষ্ণের জন্মতিথিতে তাঁকে ‘স্বামী’ সম্বোধন করে প্রধানমন্ত্রী মোদীর পোস্ট ঘিরে বিতর্কে চরমে উঠেছে। মোদীর এই সম্বোধন নিয়ে আপত্তি তুলেছেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এবার মুখ্য়মন্ত্রীকে পাল্টা জবাব দিল বিজেপি। রামকৃষ্ণ পরমহংসদেবকে 'স্বামী' সম্বোধনের পিছনে ব্যাখ্যা দিয়েছেন বিজেপির আইটি সেলের প্রধান অমিত মালব্য। মমতাকে কটাক্ষ করে তিনি লিখেছেন, "আপনার অজ্ঞতায় আমরাও হতবাক!"
গোটা বিতর্কের সূত্রপাত সকালে। রামকৃষ্ণদেবের জন্মতিথি উপলক্ষে এক্স হ্যান্ডেলে পোস্ট করেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। হিন্দিতে করা পোস্টে রামকৃষ্ণ পরমহংসের নামের আগে ‘স্বামী’ জুড়ে দেন। প্রধানমন্ত্রী লেখেন, "স্বামী রামকৃষ্ণ পরমহংসের জন্মবার্ষিকীতে তাঁর প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি। তিনি যেভাবে আধ্যাত্মিকতা এবং আধ্যাত্মিক অনুশীলনকে জীবনীশক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, তা প্রতিটি যুগে মানবতার কল্যাণে অব্যাহত থাকবে। তাঁর সৎ চিন্তাভাবনা এবং বার্তা সর্বদা অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে।"
সরব মমতা
সবই ঠিক ছিল। কিন্তু বিতর্ক তৈরি করে রামকৃষ্ণ পরমহংসের নামের আগে ‘স্বামী’ সম্বোধন। এনিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় নিজের ক্ষোভ প্রকাশ করেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। রামকৃষ্ণদেবের জন্মতিথিতে মোদীর পোস্টের কিছু ক্ষণ পরেই প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে তোপ দেগে একটি পোস্ট করেন মমতা। প্রধানমন্ত্রীকে নিশানা করে মুখ্যমন্ত্রী লেখেন, "আমি আবারও স্তম্ভিত! বারবার একই ঘটনা ঘটে চলেছে। বাংলার মনীষীদের প্রতি আমাদের প্রধানমন্ত্রীর অবহেলা, অসংবেদনশীলতা, আজ তা আবার প্রকট হল। আজ যুগাবতার শ্রীশ্রী রামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের জন্মতিথি। এই পুণ্য লগ্নে তাঁকে প্রণাম জানাতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী তাঁর নামের আগে একটা অশ্রুতপূর্ব, অপ্রযোজ্য তকমা জুড়ে দিলেন— 'স্বামী'! সবাই জানেন, শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ আপামর মানুষের কাছে 'ঠাকুর' হিসেবে পূজিত। তাঁর দেহাবসানের পর তাঁর সন্ন্যাসী শিষ্যরা রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশন তৈরি করেন এবং ভারতীয় ঐতিহ্য মেনে সেই সন্ন্যাসীদের নামের আগে 'স্বামী' উপাধি বসে। কিন্তু স্বয়ং আচার্যদেব সব সময় 'ঠাকুর' নামেই পরিচিত। রামকৃষ্ণ সংঘের যে পবিত্র ত্রয়ী - ঠাকুর-মা-স্বামীজি - সেখানেও তিনি ঠাকুর; মা সারদা 'মা' এবং বিবেকানন্দ হলেন 'স্বামীজি'। ঠাকুরকে 'স্বামী' বলার মানে বাংলার সংস্কৃতি ও ইতিহাস সম্পর্কে চরম অজ্ঞতা ও অবহেলা ছাড়া আর কিছুই না। আমি প্রধানমন্ত্রীকে সনির্বন্ধ অনুরোধ জানাচ্ছি, আধুনিক ভারতের রূপকার বাংলার এই নবজাগরণের মহাপুরুষদের অপমান করা দয়া করে বন্ধ করুন। তাঁদের জন্য রোজ নতুন নতুন বিশেষণ আবিষ্কার করার কোনও প্রয়োজন নেই। দয়া করে, বাংলার আবেগকে এভাবে বারবার আঘাত করা বন্ধ করুন।"
কী জানাল বিজেপি?
পাল্টা বিজেপির আইটি সেলের প্রধান অমিত মালব্য এক্স হ্যান্ডেলে মুখ্য়মন্ত্রী মমতা বন্দ্য়েপাধ্যায়ের একটি ভিডিও ক্লিপ পোস্ট করেন। তাতে মুখ্যমন্ত্রীকে বলতে শোনা যাচ্ছে, "শ্রীকৃষ্ণ পরমহংস দেব কী বলেছিলেন। তিনি বলেছিলেন ধর্ম মানে ধারণ। ধর্ম মানে মাববতা। ধর্ম মানে পবিত্রতা। ধর্ম মানে বিদ্বেষ নয়, ধর্ম মানে শান্তি। এটা বলেছিলেন শ্রীকৃষ্ণ পরমহংসদেব। যিনি গতায় বাণী লিখেছিলেন, উপদেশ দিয়েছিলেন।"
ভিডিও-র ক্যাপশনে অমিত মালব্য লিখেছেন, "আপনার অজ্ঞতায় আমরাও হতবাক! প্রধানমন্ত্রী শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণ পরমহংস দেব, যাঁকে তাঁর শিষ্যরা শ্রী রামকৃষ্ণ এবং 'ঠাকুর' নামেও ডাকতেন, তাঁকে স্বামী রামকৃষ্ণ পরমহংস জি বলে উল্লেখ করে তাঁর জন্মবার্ষিকীতে ভারতের সর্বজনীনভাবে সম্মানিত মহান দ্রষ্টা এবং সন্তকে শ্রদ্ধা জানান। ‘স্বামী’ উপসর্গের ব্যবহার রামকৃষ্ণ মিশনের সন্ন্যাসীদের দ্বারা ব্যবহৃত উপাধির সঙ্গে সম্পর্কিত নয়, যারা সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ ‘স্বামী’-এর বার্তা এবং শিক্ষা ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য তাঁদের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন। আধ্যাত্মিকতার একটি বৃহত্তর রূপক এবং আধিভৌতিক ধারণা রয়েছে, যা ‘অদ্বৈত বেদান্ত’ নামে পরিচিত, যা ব্যক্তি এবং ঈশ্বরের অদ্বৈতবাদ, যা রামকৃষ্ণ মিশন দ্বারা অনুশীলন এবং প্রচারিত হয়। এটি শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণ পরমহংসের অভিজ্ঞতামূলক, রহস্যময় এবং সর্বজনীন দৃষ্টিভঙ্গির মূল গঠন করে। এই প্রসঙ্গে, 'স্বামী' সেই মহান গুরুকে বোঝায়, যার কথামৃত আজও ততটাই অপ্রতিরোধ্য, বিস্ময়কর এবং মনকে বিমোহিত করে, যতটা তিনি এই নশ্বর জগতে চলার সময় ছিলেন।"
