বৃহস্পতিবার বালির জেটিয়াঘাটে একটি কালো ব্যাগের মধ্যে থেকে এক মহিলার কাটা মুণ্ডু- সহ লাশ পাওয়া যায়। মহিলার পরিচয় পেতে তদন্তে নামে পুলিশ। সেই তদন্তেই উঠে এল চাঞ্চল্যকর তথ্য। জানা গেল, স্ত্রীর বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কের জেরেই বাড়িতে কসাই ডেকে তাঁকে খুন করেছিল ওই মহিলার স্বামী। এর পরে স্ত্রীর দেহ তিন টুকরো করে ব্যাগে ভরে গঙ্গার পাড়ে ফেলে যাওয়া হয়। 

পুলিশ জানিয়েছে, মৃত মহিলার নাম সোনি রজক। তাঁকে খুনের অভিযোগে স্বামী উপেন্দ্র-সহ তিনজনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। ধৃত বাকি দু' জন উপেন্দ্ররই বন্ধু। যার মধ্যে একজন পেশায় মাংস বিক্রেতা। মৃত মহিলা হাওড়ার শিবপুরের গণেশ চ্যাটার্জী লেনের বাসিন্দা। নিজেদের ফ্ল্যাটেই দুই বন্ধুর সঙ্গে স্ত্রীকে খুন করেছিল তার স্বামী উপেন্দ্র রজক।  

কিন্তু কীভাবে হত্যাকাণ্ডের কিনারা করল পুলিশ? তদন্তে নেমে পুলিশ প্রথমেই অনুমান করে ব্যাগটি গঙ্গায় ভেসে আসেনি। কারণ ব্যাগের মধ্যে ছিল বেশ কিছু ভারী অস্ত্র। অত ভারী অস্ত্র সমেত ব্যাগ গঙ্গায় ভেসে আসা সম্ভব নয়। সুতরাং দেহাংশ সমেত ব্যাগ কেউ  ফেলে গিয়েছে, সে বিষয়ে নিশ্চিত হন তদন্তকারীরা। 

তদন্তে নেমে পুলিশ প্রথমেই আশপাশের রাস্তার সিসিটিভি ফুটেজ খতিয়ে দেখে।  সেখানেই পাওয়া যায় খুনের প্রথম সূত্র। দেখা যায়, তিন ব্যক্তি রিক্সায় চাপিয়ে ওই ব্যাগ নিয়ে গঙ্গার দিকে গিয়েছিল। অন্য একটি ফুটেজে দেখা যায়, রিক্সায় তোলার আগে একটি ট্যাক্সি থেকে ব্যাগ নামানো হচ্ছে। যা দেখে তদন্তকারীরা বুঝে যান যে অন্য কোথাও খুন করে ওই দেহ বালিতে আনা হয়েছে।  সেই মতো আশপাশের থানাতেও ওই তিন ব্যক্তির ছবি পাঠিয়ে খোঁজ শুরু করে পুলিশ।

অন্যদিকে স্ত্রীকে খুনের পর পুলিশের নজর ঘোরাতে শিবপুর থানায় সোনির নামে একটি মিসিং ডায়েরি করে তাঁর স্বামী উপেন্দ্র। মৃত মহিলার ছবি এবং সিসিটিভি ফুটেজ থেকে পাওয়া ছবি দেখে এরপর উপেন্দ্রকে ডেকে পাঠায় শিবপুর থানার পুলিশ। কিন্তু সোনির মৃতদেহের ছবি দেখে তাঁকে নিজের স্ত্রী বলে শনাক্ত করতে অস্বীকার করে উপেন্দ্র। এতে পুলিশের সন্দেহ আরও দৃঢ় হয়। এর পরেই উপেন্দ্রকে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করে পুলিশ। শেষ পর্যন্ত জেরার মুখে ভেঙে পড়ে খুনের কথা স্বীকার করে নেয় সে। 

উপেন্দ্র তদন্তকারীদের জানায়, খুনের পুরো পরিকল্পনা তারই মস্তিষ্কপ্রসূত। আর সেই পরিকল্পনা মতোই বুধবার রাতে শিবপুরের ফ্ল্যাটে দুই বন্ধু দিলওয়ার ও শামিমের সঙ্গে মিলে স্ত্রীকে খুন করে সে। দিলওয়ার এবং শামিম পেশায় মাংস বিক্রেতা। খুনের পর তারাই সোনির দেহ কেটে তিন টুকরো করে। পরদিন ভোরবেলা একটি বড় ব্যাগে দেহ ভরে প্রথমে একটি ট্যাক্সি ভাড়া করে বালিতে যায় তারা।  সেখান থেকেই একটি রিক্সায় করে দেহ সমেত ওই ব্যাগ নিয়ে গঙ্গার ঘাটে গিয়ে রেখে আসে ওই তিনজন। সেই ছবি ধরা পড়ে যায় সিসিটিভি- তে। 

উপেন্দ্রকে  জেরা করে শুক্রবার রাতেই দিলওয়ার  খান নামে আর এক অভিযুক্তকে গ্রেফতার করে পুলিশ। এর পর শনিবার সকালে হুগলির ভদ্রেশ্বর থেকে সাকলিন শামিম ওরফে শাকিলকে গ্রেফতার করা হয়। পেশায় কসাই ওই দু' জনকে খুনের জন্য উপেন্দ্র তিরিশ হাজার টাকা দিয়েছিল বলে জানতে পেরেছে পুলিশ। কিন্তু বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কের জেরেই এই খুন, নাকি অন্য কোনও কারণ রয়েছে, তা খতিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা। এ দিন শিবপুরের ফ্ল্যাট এবং বালির জেটিয়া ঘাটে যায় ফরেন্সিক দলের প্রতিনিধিরা।