সকালে নরেন্দ্র মোদীর সভা তো বিকেলবেলা তার জবাব দিচ্ছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়I আবার গরমাগরম ভাষণে ভোটের লড়াই জমিয়ে দিচ্ছেন অনুব্রত মণ্ডল, দিলীপ ঘোষরাI ভোটের মরশুমে কোন নেতার কখন সভা, কবে কোথায ভোট, গত দেড় মাস ধরে সেসব খবর রাখতেই ব্যস্ত ছিলেন আমজনতাI কিন্তু গত দু' দিনে সেসব থেকে নজর পুরোপুরি ঘুরিয়ে দিয়েছে সেI কখন তার আগমণ ঘটছে, কত গতিতে সে আঘাত হানবে, তা নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণে ব্যস্ত সংবাদমাধ্যম থেকে সাধারণ মানুষI ভোটের উত্তেজনা যখন তুঙ্গে, সেই সময় তাবড় নেতাদের পিছনের সারিতে ঠেলে দিয়ে যাবতীয় লাইমলাইট কেড়ে নিয়েছে ফণীI সোশ্যাল মিডিয়া থেকে টিভি-সংবাদপত্র, নেতা-নেত্রী, ভোটের খবর সরিয়ে দাপাচ্ছে শুধু ফণীI

ভোটের বাজারে বিগ বাজেট সিনেমা রিলিজ করার আগে দশবার ভাবেন পরিচালকরাI এমনিতেই ভোট নিয়েই মেতে থাকে জনতাI  তার উপরে ভোটেই এখন সিনেমার নায়ক-নায়িকারা অনেকে প্রার্থীI ভোট চাইতে তাঁরাই চলে আসছেন দর্শকদের ঘরের দুয়ারেI সেখানে টিকিট কেটে সিনেমা হলে যাওয়ার দরকারI এক আইপিএল ছাড়া ভোটের এই ভরা মরশুমে অন্য বিষয় নিযে বিশেষ মাথাব্যথা তাই ছিল না আমজনতা থেকে সংবাদমাধ্যমেরI শ্রাবন্তীর তৃতীয় বিয়ে নিয়ে খানিক ট্রোল হলেও (যা মোটেই সমর্থনযোগ্য নয়) ট্রোলাররা ভোট নিয়ে ব্যস্ত থাকাতেই হয়তো বিষয়টা লাগামছাড়া পর্যায়ে পৌঁছয়নিI ভোট নিয়ে এমন একপেশে উন্মাদনার মধ্যেই আবির্ভাব ফণীরI বিধানসভা, পুরসভা, পঞ্চাযেতের মতো মেজ, ছোট ভোট ঘুরেফিরে প্রতি বছর হলেও লোকসভা ভোট পাঁচ বছরে একবার আসেI আর সেখানে আযলার প্রায় চোদ্দ বছর পরে এমন ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড় দেখবে বাংলা-সহ গোটা দেশI ওড়িশায় আছড়ে পড়ার সময়ে ফণীর গতিবেগ ছিল ঘণ্টায় একশো পচাত্তর কিলোমিটারI বাংলায় আঘাত হানার সময়েও ফণীর গতিবেগ নাকি একশো পার করে দেবেI স্বাভাবিকভাবেই ভোট নিযে উন্মাদনাকে জোরদার চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছে. ফণীI

রাস্তাঘাটে বেরোলে ফণী আতঙ্ক চোখে পড়তে বাধ্যI পুরী, দিঘার সমুদ্রপাড়ের মতো খা খা না করলেও অফিস টাইমে ফাঁকা হয়ে গিয়েছে বনগাঁ লোকালI ভরা এই দুর্যোগ মাথায় নিয়েও যাঁদের নিতান্ত বাড়ির বাইরে বেরোতে হয়েছে, তাঁরা শনিবার ঝুঁকি না নিয়ে বাড়িতে থাকারই সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছেনI অন্তত ট্রেনে, বাসের আলোচনায় তা স্পষ্টI ফোনে কথা বলতে বলতে অনেকেই ফণী পুরীতে পৌঁছল কি না, সকাল থেকে সেই লাইভ আপডেট নিয়েছেনI অন্য সময় হলে উইকএন্ডে টানা তিন দিনের ছুটিতে দিঘা, মন্দারমণি বা বকখালি বেরিয়ে আসা যেত, কিন্তু ফণীর বিপদ যে সেখানেই বেশিI তাই বাড়িতে খিচুড়ি-ভাজা খেয়ে এ যাত্রা কাটিয়ে দেওয়া ছাড়া উপায় নেইI অবশ্যই সবার সেই বিলাসিতার সুযোগ নেইI ভয়াবহ ঝড় যে অনেককেই গৃহহীন করবে, তা নিশ্চিতI

এমন অবস্থায় নেতারাও নিরুপায়। ভোটের হিসেব-নিকেশ ভুলে আপাতত রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী থেকে দেশের প্রধানমন্ত্রী ত্রাণ কাজ এবং ঘূর্ণিঝড়ের জেরে ক্ষয়ক্ষতি কমানোয় মন দিয়েছেনI নির্বাচনের এই ভরা বাজারেও জনপ্রতিনিধিদের তাঁদের আসল কাজে ফিরিয়ে দিয়েছে ফণীI কোমর বেঁধে উদ্ধারকাজে নেমেছে সবাইI কলকাতায় তো পাড়ায় পাড়ায় মাইকে প্রচার শুরু করে দিয়েছে পুলিশI ভালয় ভালয় ফণী পর্ব উতরে গেলে স্বস্তি সবারইI ফের শুরু হবে ভোটের লড়াইI তখন আবার ফণীর হাত থেকে জনতাকে বাঁচাতে কে কতটা পরিশ্রম করলেন, সেই ফিরিস্তি না শুনতে হয়! আসলে দেশের সেনাবাহিনীর কৃতিত্বই যেখানে ভোট চাওয়ার রসদ হয়ে দাঁড়ায়, সেখানে ফণীর বিরুদ্ধে মাঠে নেমে লড়াই করার কৃতিত্ব কি হাতছাড়া করতে চাইবেন জননেতারা, প্রশ্নটা  মনে খচখচ করছেইI

যাই হোক না কেন, ফণীর তাণ্ডব যত কম হয়, ততই মঙ্গলI আমজনতার স্বস্তিI ফণীর দাপটে ভোটের উত্তাপ যেমন আচমকা কমে গিয়েছে, তেমনই হাঁসফাঁস গরম থেকেও অনেকটা নিস্তার পেলেন সাধারণ মানুষI