খুনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত নয়। কিন্তু মুর্শিদাবাদের শিক্ষক বন্ধুপ্রকাশ পাল এবং তাঁর স্ত্রী- সন্তানের হত্যার পরোক্ষ কারণে বন্ধু শৌভিক বণিকই। তদন্তে নেমে পুলিশ নিশ্চিত, শৌভিকের কারণেই দেউলিয়া হয়েছিলেন বন্ধুপ্রকাশ। সরকারি স্কুলের শিক্ষক পাড়ার মুদি দোকানের টাকাও মেটাতে হিমশিম খাচ্ছিলেন। আর সেই কারণেই নিজের গ্রাহকদের বিমার প্রিমিয়ামের টাকাও আত্মসাৎ করতে বাধ্য হয়েছিলেন তিনি। বিমার টাকা নিয়েও জমা না দেওয়ার রাগ থেকেই বন্ধুপ্রকাশ এবং তাঁর পরিবারকে সাগরদিঘির উৎপল বেহরা খুন করেছে বলেই দাবি পুলিশের। 

আর্থিক প্রতারণার অভিযোগে বন্ধুপ্রকাশ পালের বন্ধু রামপুরহাটের বাসিন্দা শৌভিক বণিককে আগেই গ্রেফতার করেছিল পুলিশ। জেরায় শৌভিক তদন্তকারীদের জানিয়েছে, বন্ধুপ্রকাশকে বিলাসবহুল জীবনের সঙ্গে অভ্যস্ত করিয়ে ফেলেছিল সে। নিহত শিক্ষককে ব্যবসার নাম করে মুম্বই নিয়ে গিয়ে বিপুল টাকা খরচ করিয়েছে সে। বাণিজ্য নগরীতে নামী ও অভিজাত হোটেলে তারা বেশ কয়েক রাতও কাটায়। কার্যত মুম্বইয়ের পাঁচ তারা হোটেলে থাকা এবং যাওয়া আসা করতে তাদের ছ' লক্ষ টাকা খরচও হয়ে যায়। মোটা সুদে এই টাকা ধার নিয়েছিলেন বন্ধুপ্রকাশই। কার্যত অভিজাত জীবন যাপনের প্রতি বন্ধুপ্রকাশ পালকে আকৃষ্ট করতে চেষ্টার এতটুকু কসুর করেনি শৌভিক।তবে ব্যবসা করার যে উদ্দেশ্যে নিয়ে মুম্বই গেলেও শেষ পর্যন্ত তা বাস্তবায়িত হয়নি।

পুলিশি জেরায় শৌভিক স্বীকার করেছে, তার পাতা ফাঁদে পা দিয়েই কার্যত সর্বস্বান্ত হন বন্ধুপ্রকাশবাবু । অবশ্য প্রতারণা ছাড়া ওই শিক্ষক খুনের অপরাধে এখনই শৌভিকের যোগ আছে বলে পুলিশ তদন্তে নেমে  প্রমাণ পায়নি।

আরও পড়ুন- জিয়াগঞ্জের শিক্ষক পরিবার খুনে নয়া মোড়, শৌভিককে পছন্দই করত না বিউটি

আরও পড়ুন- জিয়াগঞ্জে পাঁচ মিনিটে তিন খুন, পুলিশের তদন্ত নিয়ে প্রশ্ন তথাগতর

তদন্তে নেমে পুলিশ জানতে পেরেছে,আর্থিক ভাবে দেওলিয়া হওয়ার কারণেই বন্ধপ্রকাশবাবু আমানতকারীদের কাছ থেকে টাকা নিয়েও তা সময় মতো জমা করতে পারতেন না । যেমনটা হয়েছিল সাগরদিঘির উৎপলের বেহরার ক্ষেত্রে। বিমার প্রিমিয়াম বাবদ প্রথম কিস্তির ২৪ হাজার টাকা জমা দিলেও দ্বিতীয় কিস্তির ২৪ হাজার টাকা জমা করেননি বন্ধুপ্রকাশবাবু। সেই টাকা নিয়েই উৎপলের সঙ্গে বিবাদের সূত্রপাত। বন্ধুপ্রকাশবাবু প্রিমিয়ামের টাকা আত্মসাৎ করায় সেই রাগ থেকেই উৎপল সপরিবারে ওই স্কুল শিক্ষককে খুন করেছে বলে দাবি পুলিশের। তদন্তকারীরা জানতে পেরেছেন, প্রতারণার ফাঁদে পড়ে বন্ধুপ্রকাশের আর্থিক অবস্থা এতটাই চরমে পৌঁছেছিল যে স্থানীয় মুদি দোকান , দুধওয়ালার টাকাও সময় মতো পরিশোধ করতে পারছিলেন না ওই শিক্ষক। এমন কী, জিয়াগঞ্জের লেবুবাগানে বাড়ি করতে গিয়ে বন্ধুপ্রকাশবাবু যে ঋণ নিয়েছিলেন, তার কিস্তির টাকা পরিশোধ করতে গিয়েও আত্মীয়স্বজনের থেকে ধার করতে হয়েছিল তাঁকে।  আর এ সবের জন্য শৌভিককেই দায়ী করছেন তদন্তকারীরাও। 

পুলিশ অবশ্য জানতে পেরেছে, একা বন্ধুপ্রকাশবাবু নন, এই ছকে অনেককেই পথে বসিয়েছে শৌভিক। তার মধ্যে বেশ কিছু মহিলাও রয়েছেন। তাঁদের সঙ্গেও পুলিশ যোগাযোগ করছে। তদন্তকারীরা জানতে পেরেছেন, ২০১৬ সালে বন্ধ হয়ে যাওয়া একটি বেআইনি অর্থলগ্নি সংস্থার নামেও টাকা তুলেছেন শৌভিক ও বন্ধুপ্রকাশ। পুলিশি জেরায় ধৃত স্বীকার করেছে, ২০০৪ সাল থেকে বন্ধুপ্রকাশ তার সঙ্গে একাধিক লগ্নিকারী সংস্থা ও মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে কাজ করেন। প্রথম দিকে বন্ধুপ্রকাশবাবুকে লাভের মুখ দেখিয়ে ফাঁদ পাতার কাজ শুরু করে শৌভিক। শেষ পাঁচ বছরে প্রায় দেওলিয়া হয়ে যাওয়ার অবস্থা হয়েছিল নিহত শিক্ষককের। বন্ধুর ভেক ধরে বন্ধুপ্রকাশকে পথে বসিয়েছিল শৌভিকই।