Hooghly News: এবার স্বাদে ও শিল্পে বিশ্বজয়ের পালা হুগলির। কেন্দ্রীয় সরকারের জিআই রেজিস্ট্রি থেকে সুখবর এল ১৫ এপ্রিল ২০২৬। হুগলি জেলার তিন রত্ন— চন্দননগরের বিখ্যাত জলভরা তালশাঁস সন্দেশ, জনাইয়ের ২০০ বছরের পুরনো মনোহরা মিষ্টি আর বলাগড়ের কারিগরদের হাতে তৈরি পালতোলা কাঠের নৌকা পেল জিওগ্রাফিক্যাল ইন্ডিকেশন বা জিআই তকমা।
GI Tag: বাঙালির রসনাতৃপ্তি আর বাংলার শিল্প— দুই দিকেই জয়জয়কার। জিআই বা ভৌগোলিক সূচক তকমা পাওয়ার দৌড়ে এবার হ্যাটট্রিক করল হুগলি জেলা। চেন্নাইয়ের জিআই রেজিস্ট্রি অফিস থেকে প্রকাশিত গেজেট নোটিফিকেশনে জানানো হয়েছে, হুগলির তিনটি পণ্য জিআই-এর ৭১, ৭১২ ও ৭১৩ নম্বর সার্টিফিকেট পেয়েছে।

১. চন্দননগরের জলভরা তালশাঁস সন্দেশ: শ্রাবণ মাস পড়লেই চন্দননগরের মিষ্টির দোকানে লাইন। কারণ একটাই, জলভরা। বাইরে থেকে দেখলে সাধারণ কড়াপাকের তালশাঁস সন্দেশ। কিন্তু দাঁতে কাটলেই ভিতর থেকে বেরিয়ে আসে তরল নলেন গুড়ের পুর। কারিগররা বলেন, এই ‘জল’ ভরাই আসল কারিগরি। সামান্য গরমে বা চাপে ফেটে যায়। তাই শীতকাল ছাড়া তৈরি হয় না। প্রায় ১৮০ বছর আগে চন্দননগরের সূর্য মোদক এই সন্দেশ প্রথম বানান। জিআই পাওয়ার ফলে এখন থেকে শুধু চন্দননগর ও ভদ্রেশ্বর পুর এলাকার কারিগররাই ‘অরিজিনাল জলভরা’ নামে বিক্রি করতে পারবেন। দাম ৪০-৫০ টাকা পিস।
২. জনাইয়ের মনোহরা: হুগলির জনাইয়ের মনোহরা মানেই বড় বড় বোঁদের নাড়ু, যার উপর চিনির পাতলা আস্তরণ। জনাইয়ের জমিদার বাড়ির মেয়ে মনোহরার নামেই এই মিষ্টি। কথিত আছে, মনোহরা শ্বশুরবাড়ি যাওয়ার সময় এমন মিষ্টি বানিয়ে নিয়ে যান যা গরমে গলবে না। সেই থেকে কড়াপাকের এই মিষ্টির জন্ম। ছানা, চিনি আর ঘি দিয়ে তৈরি হয়। উপরে পোস্ত ছড়ানো থাকে। জিআই-এর শর্ত অনুযায়ী, জনাই, বেগমপুর ও বড়া পঞ্চায়েত এলাকার ২২টি দোকানই ‘জনাই মনোহরা’ লেবেল ব্যবহার করতে পারবে।
৩. বলাগড়ের পালতোলা কাঠের নৌকা: একসময় ব্যান্ডেল থেকে কাটোয়া পর্যন্ত গঙ্গার বুকে ভেসে বেড়াত বলাগড়ের তৈরি ‘ছিপ’ ও ‘পানসি’ নৌকা। শাল, সেগুন কাঠ দিয়ে সম্পূর্ণ হাতে তৈরি এই নৌকা ৪০-৫০ বছর টিকে যায়। এখন ট্যুরিজমের কারণে নতুন করে চাহিদা বাড়ছে। সুন্দরবন, ডুয়ার্সের রিসর্টগুলো বলাগড় থেকে থিম নৌকা কিনছে। জিআই পাওয়ায় এবার ইউরোপ-আমেরিকায় রপ্তানির রাস্তা খুলল। ১২ ফুটের একটা শৌখিন নৌকার দাম শুরু ২.৫ লাখ টাকা থেকে।
জিআই পেলে লাভ কী?
রাজ্যের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি দফতরের কর্তা ড. অমিতাভ বন্দ্যোপাধ্যায় জানালেন, জিআই মানে হল ‘ব্র্যান্ড প্রোটেকশন’। এর ৩টি বড় সুবিধা:
১. নকল আটকাবে: কলকাতার যে কেউ আর ‘জনাই মনোহরা’ বলে মিষ্টি বিক্রি করতে পারবে না। করলে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া যাবে। ২. দাম বাড়বে: জিআই তকমা পাওয়ার পর জয়নগরের মোয়া, বর্ধমানের সীতাভোগের দাম ৩০% বেড়েছে। চাহিদাও বেড়েছে। ৩. রপ্তানি সহজ: বিদেশের সুপারমার্কেটে ‘GI Tagged’ লেবেল থাকলে জিনিসের দাম ও কদর দুইই বাড়ে। সরকার রপ্তানির জন্য বিশেষ সাহায্য করে।
কীভাবে এল এই স্বীকৃতি?
হুগলি জেলা প্রশাসন ও ‘ফাস্টি’ নামের একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা ২০২৩ সাল থেকে এই তিনটি পণ্যের জন্য লড়াই করছিল। ৪০০ পাতার ডকুমেন্ট, ১০০ বছরের পুরনো দলিল, গেজেট, খবরের কাগজের কাটিং জমা দিতে হয়েছে। চন্দননগরের ৮৭টি মিষ্টির দোকান, জনাইয়ের ২২টি দোকান ও বলাগড়ের ৪১ ঘর নৌকা কারিগর এই স্বীকৃতির অংশীদার হবেন।
এরপর কী?
হুগলির জেলাশাসক জানিয়েছেন, সামনের মাসেই চন্দননগর স্ট্র্যান্ডে ‘জিআই মেলা’ হবে। সেখানে জলভরা, মনোহরা আর বলাগড়ের নৌকার মিনি মডেল বিক্রি হবে। রাজ্য সরকার প্যাকেজিং ও ব্র্যান্ডিংয়ের জন্য কারিগরদের ট্রেনিং দেবে। QR কোড স্ক্যান করলেই ক্রেতা জানতে পারবেন মিষ্টিটা আসল চন্দননগরের কিনা। রসগোল্লা, বালুচরী, মাদুরকাঠির পর এবার জলভরা, মনোহরা আর নৌকা। বাংলার জিআই তালিকা এখন ৩৪-এ পৌঁছাল। মিষ্টি আর শিল্প দিয়েই বিশ্ব মাতাচ্ছে বাংলা।
আরও খবরের আপডেট পেতে চোখ রাখুন আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেলে, ক্লিক করুন এখানে।


