কেশরীনাথ ত্রিপাঠীর বিদায়ের পরে রাজভবনের সঙ্গে নবান্নের সম্পর্ক উত্তাপ কিছুটা কমবে কি না, তা নিয়ে কৌতূহল ছিল রাজ্য রাজনীতিতে। জগদীপ ধনখড়ের নাম এ রাজ্যের রাজ্যপাল হিসেবে ঘোষণা হওয়ার পরে তাঁকে 'সুন্দর রাজ্যে স্বাগত' জানিয়েছিলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও। কিন্তু মাত্র তিন মাসেই ধনখড় বুঝিয়ে দিয়েছেন, ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগে তিনি এ রাজ্যের শাসক দলের কাছে বড় মাথাব্যথার কারণ হয়ে উঠতে চলেছেন। 

জুলাই মাসে যখন পশ্চিমবঙ্গের রাজ্যপাল হিসেবে ধনখড় দায়িত্ব পেয়েছিলেন, তখন ভাটপাড়ার অশান্তি নিয়ে উত্তপ্ত ছিল রাজ্য রাজনীতি। ধনখড় রাজভবনে আসার কিছুদিনের মধ্যেই ভাটপাড়ার গন্ডগোলে মাথা ফাটে বিজেপি সাংসদ অর্জুন সিংয়ের। সেদিন দিল্লিতে ছিলেন ধনখড়। অর্জুনের আহত হওয়ার খবর পেয়েই তড়িঘড়ি কলকাতায় এসে সোজা তাঁকে হাসপাতালে দেখতে ছুটেছিলেন রাজ্যপাল। প্রথম দফায় সরাসরি না বললেও ঘুরিয়ে রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা নিয়ে প্রশ্ন তুলে দিয়েছিলেন রাজ্যপাল। 

কিন্তু তিনি যে শুধুমাত্র রাজভবনের মধ্যেই নিজের সাংবিধানিক ক্ষমতাকে সীমাবন্ধ রাখায় বিশ্বাসী না, তা প্রমাণ করে দিয়ে কার্যত বেনজিরভাবে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী বাবুল সুপ্রিয়কে উদ্ধার করতে সটান যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে হাজির হয়েছিলেন ধনখড়। এবিভিপি-র অনুষ্ঠানে গিয়ে বামপন্থী ছাত্র সংগঠনগুলির হাতে দীর্ঘক্ষণ বন্দি হয়ে থাকা বাবুলকে নিজের গাড়িতে করে উদ্ধার করে নিয়ে এসেছিলেন রাজ্যপাল। এবার অবশ্য আর রাখঢাক করে নয়, বরং সরাসরি পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলে দিয়েছিলেন ধনখড়। এমন কী, ঘটনা চলাকালীন মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলার পরেও পরিস্থিতির কোনও উন্নতি হয়নি বলে বিবৃতি দিয়ে নবান্নের অস্বস্তি আরও বাড়িয়েছিলেন ধনখড়। 

ইটের বদলে যে তিনি পাটকেল মারতে তৈরি, যাদবপুরের ঘটনাতে তা আরও স্পষ্ট করে দিয়েছিলেন প্রাক্তন বিজেপি নেতা ধনখড়। যাদবপুরের ঘটনায় তাঁর সমালোচনা করে পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের মন্তব্যকে খারিজ করে দিয়ে চাঁচাছোলা ভাষায় পাল্টা বিবৃতি জারি করেছিল রাজভবন। রাজ্যপালের সঙ্গে শাসক দলের সম্পর্ক কোন খাতে বইতে চলেছে, তা সেদিনই স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল। 

আরও পড়ুন- তিন মাসেই তিন ধাক্কা, তৃণমূলের নতুন মাথাব্যথার নাম জগদীপ ধনখড়

রাজ্যপালের ভূমিকায় যে নবান্নও অসন্তুষ্ট তাও ইতিমধ্যে স্পষ্ট হয়ে গিয়েছে। উত্তরবঙ্গ সফরে রাজ্যপালের ডাকা বৈঠকে একাধিক পুলিশ, প্রশাসনের কর্তারা গরহাজির থেকেছেন। যা নিয়েও ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন জগদীপ ধনখড়। 

আর সবশেষে তার সঙ্গে যোগ হল মুর্শিদাবাদে সপরিবার শিক্ষকের হত্যাকাণ্ড। ঠিক কী কারণে এই হত্যাকাণ্ড, তা এখনও স্পষ্ট নয়। কিন্তু এমন অপরাধ নিয়ে প্রাক্তন রাজ্য়পাল কেশরীনাথ ত্রিপাঠীও কোনওদিন রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন, তা মনে করা যাচ্ছে না। রাজ্যপালের এই ভূমিকার পিছনে সরাসরি বিজেপি-র হাতই দেখছে শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেস। তাঁর অভিসন্ধি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে শাসক দল। 

কিন্তু শাসক দলের পরামর্শ মেনে নিয়ে জগদীপ ধনখড় সংযত হবেন, এমন আশা না করাই ভাল। বরং ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগে রাজ্য় সরকার এবং রাজ্যের শাসক দলের সঙ্গে রাজভবনের দূরত্ব যে আরও বাড়বে, তা চোখ বুজে বলে দেওয়া যায়। শাসক দলের অনেকেই জগদীপ ধনখড়ের মধ্যে জম্মু কাশ্মীরের রাজ্যপাল সত্যপাল মালিক বা মেঘালয়ের রাজ্যপাল তথাগত রায়দের ছায়া দেখতে পাচ্ছেন। যাঁদের রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা নিয়েই বার বার প্রশ্ন তুলেছে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল। ধনখড়ের পূর্বসূরী কেশরীনাথ ত্রিপাঠীর ভূমিকাতেও তৃণমূল সন্তুষ্ট ছিল না ঠিকই। কিন্তু রাজ্যের আইনশৃঙ্খলার মতো বিষয় নিয়ে মন্তব্য করার ক্ষেত্রে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কিছুটা হলেও মেপে কথা বলতেন তিনি। প্রাক্তন বিজেপি নেতা ধনখড় যে সেই পথে হাঁটবেন না, তা ইতিমধ্যেই স্পষ্ট। পরবর্তী বিধানসভা নির্বাচনের আগে বেশি সময় নেই বলেই নয়া রাজ্যপাল শুরু থেকে এমন চালিয়ে খেলছেন কি না, রাজ্যের রাজনৈতিক মহলে ইতিমধ্যেই সেই প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।