হাবভাবে মানুষের সঙ্গে তাদের মিল নিয়ে নতুন কিছু বলার নেই। কিন্তু প্রয়োজন পড়লে যে মানুষের সঙ্গে মিশে গিয়ে নিজের মনের ভাবটুকু তারা প্রকাশ করতে পারে, দেখিয়ে দিল বীরভূমের মল্লারপুরের একটি হনুমান। একেবারে মানুষের মতোই ওষুধের দোকানে গিয়ে প্রয়োজনীয় চিকিৎসাটুকু করিয়ে নিয়েছে সে। হাবেভাবে বুঝিয়ে দিয়ে চেয়ে নিয়েছে প্রয়োজনীয় ওষুধও। 

শনিবার সকালে এই ঘটনা সাক্ষী যাঁরা থেকেছেন, হনুমানের বুদ্ধি দেখে তাঁরা কার্যত থ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিরল হলেও হনুমানের থেকে এমন আচরণ অপ্রত্যাশিত নয়। 

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, শনিবার সকালে মল্লারপুর স্টেশনে অন্য একটি হনুমানের সঙ্গে মারামারি করে জখম হয় ওই পূর্ণবয়স্ক হনুমানটি। শরীরের বিভিন্ন অংশ থেকে চামড়া উঠে মাংস বেরিয়ে আসে তার। আহত অন্য হনুমানটি গা ঢাকা দিলেও এই হনুমানটি স্টেশন চত্বরের বাইরে টোটো স্ট্যান্ডে চলে আসে। সেখান থেকেই একটি টোটোয় উঠে পড়ে সে। 

আচমকা হনুমানকে দেখে আতঙ্কিত হয়ে পড়েন টোটোর যাত্রীরা। হনুমান কামড়ে, আঁচড়ে দেবে এই আশঙ্কা করছিলেন তাঁরা। কিন্তু সে রাস্তায় না হেঁটে কাতর মুখে যাত্রীদের দিকে তাকিয়ে থাকে হনুমানটি। যাত্রীদের গায়ে আলতো করে হাত দিয়ে বুঝিয়ে দেয়, ক্ষতি করার কোনও উদ্দেশ্য নেই তার। 

আরও পড়ুন- মারামারিতে জখম, দোকানে গিয়ে ওষুধ চাইল হনুমান, দেখুন ভিডিও

হনুমান কোথায় যাবে তা টোটোচালক বুঝতে পারেননি। কিন্তু জখম হনুমান নিজের গন্তব্যস্থল জানত। কিছুদূর এসেই একটি ওষুধের দোকানের সামনে টোটো থেকে নেমে পড়ে সে। তখনও প্রত্যক্ষদর্শীরা তার উদ্দেশ্য বুঝতে পারেননি। 

সবাইকে অবাক করে এর পর সোজা ওষুধের দোকানে ঢুকে পড়ে হনুমানটি। সোজা গিয়ে বসে দোকানের সামনের শোকেসের উপরে। সঙ্গে মুখে সেই কাতর চাউনি। দোকানদারও প্রথমে বুঝতে পারেননি সবজি, ফলের দোকান ছেড়ে হঠাৎ ওষুধের দোকানে কেন হনুমানের হানা। 

কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই জখম হনুমানের মনের কথা বুঝতে পারেন দোকানদার। হাত দিয়ে সে নিজের আঘাতের জায়গাগুলি ওষুধের দোকানিকে দেখিয়ে দেয়। হনুমানের সাহায্যে এগিয়ে আসেন সহৃদয় আরও এক যুবকও। লাল ওষুধ, মলম, তুলো দিয়ে হনুমানের আঘাতের জায়গাগুলির শুশ্রুষা করা হয়। ব্যথা, জ্বালা করলেও আগাগোড়া চুপ করে বসেছিল জখম হনমুমানটি। 

সবাইকে অবাক করে দিয়ে শুশ্রুষার পরেও দোকান থেকে বেরোতে চায়নি ওই হনুমান। ফের সে আঘাতের জায়গাগুলি দেখাতে থাকে। আঘাতের জায়গা ব্যথা হচ্ছে অনুমান করে এর পর জলে গুলে হনুমানটিকে একটি ব্যথার ওষুধ দেওয়া হয়। সেটি খেয়ে সঙ্গে কয়েকটি কলা খাওয়ার পরে কিছুটা যেন স্বস্তি ফেরে হনুমানটির চোখেমুখে। চমকের অবশ্য এর পরেও বাকি ছিল। 

দোকান থেকে বেরিয়ে ফের স্টেশনগামী একটি টোটোতে চেপে বসে হনুমানটি। যেন কোথায় আসবে, কোন পথে ফিরবে, সবই তার আগে থেকে ঠিক করা ছিল। 

হনুমানের এ হেন আচরণ বিরল বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। আলিপুর চিড়িয়াখানার অধিকর্তা আশিসকুমার সামন্ত বলেন, 'এমনিতেই হনুমান, শিম্পাঞ্জির মতো প্রাণীরা একটু বেশি মাত্রাতেই মানুষকে অনুকরণ করতে পারে। তবে এই হনুমানটি বন্য হলে সে এমন আচরণ করতে পারত না। হয়তো লোকালয়ের মধ্যেই মানুষের সংস্পর্শে থেকে সে এই বিষয়টি লক্ষ্য করেছে। সেই কারণেই ব্যথা লাগলে ওষুধের দোকানে যেতে হয়, এটা তার জানা ছিল। তবুও হনুমানের এই আচরণ বিরল।'