নাগরিকত্ব আইন, এনআরসি বিরোধী আন্দোলনে দেশজুড়ে শুরু হয়েছে বিক্ষোভ। অনেক জায়গাতেই রাজনৈতিক স্বার্থে সেই বিক্ষোভে রাজনীতির রং লেগেছে। এমনই বিক্ষোভে মাসখানেক আগেও হিংসার আগুন জ্বলেছিল গোটা মুর্শিদাবাদ জেলা জুড়ে। এই টানাপোড়েনের মধ্যেই আরও একবার মনুষত্বের কাছে হার মানল ধর্মের সীমাবদ্ধতা। মুসলিম পরিবারের সদস্যদের কাঁধে চড়ে শ্মশানে গেলেন এক হিন্দু। যাবতীয় রীতি নীতি মেনেই হলো শেষকৃত্য।

মুর্শিদাবাদের কান্দির প্রত্যন্ত এলাকা মহলন্দী। সেখানেই দীর্ঘদিন ধরে বাস মেরু মিঞার পরিবার। প্রায় চার দশক আগে ওই পরিবারেই আশ্রয় নিয়ছিলেন প্রদীপ মণ্ডল। নিজের বাড়ির পথ ভুলেই কোনওভাবে মেরু মিঞার বাড়ির দরজায় আশয় চেয়েছিলেন প্রদীপ। সেই থেকে শুরু। এর পর আর নিজের বাড়িতে ফেরত যাননি তিনি। মুসলিম পরিবারটিই হয়ে ওঠা তাঁর নিজের। পরিবারের সদ্যরা হয়ে ওঠেন তাঁর আপনজন।

ইংরেজিতে ভাল জ্ঞান থাকায় প্রদীপই মেরু মিঞার সন্তানদের লেখাপড়া শেখানো শুরু করেন। এ ভাবেই কেটে যায় চার দশক। বৃদ্ধ হন প্রদীপ মণ্ডল। শেষ পর্যন্ত শুক্রবার বার্ধক্যজনিত অসুখে ভুগেই মৃত্যু হয় তাঁর।

প্রদীপবাবুর মৃত্য়ুতে শোকের ছায়া নেমে এসেছে মেরু মিঞার পরিবারে।  চার দশকেরও বেশি সময় ধরে মুসলিম পরিবারর সঙ্গে থাকলেও প্রদীপকে কখনওই তাঁর ধর্মাচারণে বাধা দেওয়া হয়নি। তাই প্রদীপ মণ্ডলের মৃত্যু প্রতিবেশীদের সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবেশীদের সঙ্গে কথা বলে হিন্দু মতেই তাঁর শেষকৃত্যের ব্যবস্থা করে মেরু মিঞার পরিবার।  

স্থানীয়রা জানান প্রদীপবাবু কোনওদিনই তাঁর অতীত এর কথা কাউকে জানাননি তেমনই তাঁর বাড়িও আর ফিরে যেতে চাননি। মেরু মিঞার পরিবারকে নিজের মনে করে সেখানেই কাটিয়ে দিয়েছেন বছরের পর বছর। এদিন তাঁর মৃত্যুতে শোকার্ত মেরু মিয়ার পরিবারের এক সদস্য বলেন,'ভাবতেই পারছি না উনি আর আমাদের মধ্যে নেই। সেই ছোট থেকে হাতে খড়ি দেওয়ার সময় উনি আমাদের অ-আ লেখা শিখিয়েছেন। কোনওদিন আলাদা করে হিন্দু মুসলিম বলে কিছু ভাবিনি। উনিও আমাদের পরিবারের একজনকে। তাই আজ দোয়া করছি উনি যেন স্বর্গে স্থান পান।'

এদিন প্রদীপ বাবুর সৎকারে উপস্থিত গ্রামের এক হিন্দু পরিবারের সদস্য গোপাল দাস বলেন, 'আমাদের এই মহলন্দী গ্রামকে গোটা দেশের মধ্যে উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরা হোক। সবাই দেখুক. 'জাতপাত নয়, আমাদের কাছে মানব ধর্মই আসল।'