আগামী ৬ অক্টোবর নন্দীগ্রাম উপনির্বাচনে বিজেপি প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন জমা দিলেন প্রয়াত চন্দ্রনাথ রথের মা হাসিরানি। তাঁর সমর্থনে আয়োজিত সভায় চন্দ্রনাথ হত্যায় 'ভাইপো গ্যাং'-এর দিকে ২ কোটি টাকার সুপারি দেওয়ার বিস্ফোরক অভিযোগ তোলেন শুভেন্দু অধিকারী।
নন্দীগ্রামে বিজেপি প্রার্থী ছিলেন শুভেন্দু অধিকারীর আপ্তসহয়াক চন্দ্রনাথের মা হাসিরানি। উপনির্বাচনের প্রার্থী তালিকা ঘোষণা করা হয় মঙ্গলবার সকালেই। মঙ্গলবারই মনোনয়ন জমা দেন হাসিরানি। মনোনয়ন জমা দেওয়ার পাশে ছিলেন স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রী। নন্দীগ্রাম থেকে তাঁর জয় নিয়ে আশাবাদী শুভেন্দু। তিনি জানান, ভোটের ফলাফল আকর্ষণীয় হতে চলেছে। এ ছাড়া চন্দ্রনাথের খুনের সঙ্গে ভাইপো গ্যাং জড়িত আছেন বলে জানান মুখ্যমন্ত্রী।
গত বিধানসভা নির্বাচনে নন্দীগ্রাম ও ভবানীপুর থেকে প্রার্থী হয়ে ভোটে দাঁড়ান শুভেন্দু অধিকারী। দুই কেন্দ্র থেকেই তাঁর জয় হয়। তবে ভোটের পরে নন্দীগ্রাম আসনটি ছেড়ে দেন তিনি। ফলে ওই কেন্দ্রে উপনির্বাচন হয়। আগামী ৬ অক্টোবর ভোটোর দিন ঠিক করা হয়েছে ওই কেন্দ্রে।
নন্দীগ্রাম ও রেজিনগর বিধানসভা উপনির্বাচন ঘিরে ইতিমধ্যেই সরগরম বঙ্গের রাজনীতি। মঙ্গলবার নন্দীগ্রামে বিজেপি প্রার্থী হাসিরাণী রথের মনোনয়ন জমা দেওয়ার সময় তাঁর সঙ্গে ছিলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। হাসিরাণী রথ প্রয়াত চন্দ্রনাথ রথের মা। নন্দীগ্রাম উপনির্বাচন হবে আগামী ৬ অক্টোবর।
মঙ্গলবার হাসিরাণীর সমর্থনে পদযাত্রাও করেন শুভেন্দু। প্রায় এক কিলোমিটার হেঁটে হলদিয়া মহকুমাশাসকের দফতরে পৌঁছন তিনি। সেখানেই হাসিরাণীর মনোনয়ন জমা দেওয়ার সময় উপস্থিত ছিলেন মুখ্যমন্ত্রী।
মনোনয়ন পর্ব মিটতেই নন্দীগ্রামের প্রার্থীকে সামনে রেখে সভা করেন শুভেন্দু। সেখান থেকে সরাসরি সংখ্যালঘু ভোটারদের উদ্দেশে বার্তা দেন তিনি। তাঁর দাবি, নন্দীগ্রামের উপনির্বাচনে বিজেপি এমন ব্যবধানে জয়ী হবে, যা আগে কেউ কল্পনাও করেননি।
এরপরই সংখ্যালঘু ভোটারদের উদ্দেশে প্রশ্ন ছুড়ে দেন শুভেন্দু। তিনি বলেন, “আপনারা মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে থাকতে চান কি না?” পাশাপাশি ৬ অক্টোবরের ভোটকে নন্দীগ্রাম ও রেজিনগরের সংখ্যালঘু ভোটারদের জন্য ‘পরীক্ষা’ বলেও উল্লেখ করেন। তাঁর বক্তব্য, এই পরীক্ষায় তাঁরা পাশ করবেন, না ফেল করবেন—সিদ্ধান্ত তাঁদেরই নিতে হবে।
শুধু নন্দীগ্রাম নয়, একই দিনে রেজিনগর বিধানসভা কেন্দ্রেও উপনির্বাচন হবে। ওই কেন্দ্রে বিজেপি প্রার্থী করেছে দলের প্রাক্তন মুর্শিদাবাদ জেলা সভাপতি তথা রাজ্য কমিটির সদস্য শাখারভ সরকারকে। দুই কেন্দ্রেই সংখ্যালঘু ভোটের গুরুত্ব রয়েছে বলে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা চলছে।
এদিকে নন্দীগ্রামে হাসিরাণী রথকে প্রার্থী করার পিছনে রয়েছে তাঁর ছেলে চন্দ্রনাথ রথের হত্যাকাণ্ডের প্রসঙ্গও। চন্দ্রনাথ ছিলেন শুভেন্দুর ঘনিষ্ঠ সহযোগী। মে মাসে তাঁকে গুলি করে হত্যা করা হয়। বর্তমানে সেই মামলার তদন্ত করছে সিবিআই।
নন্দীগ্রাম উপনির্বাচনের ফল কী হয়, তা এখনই বলা সম্ভব নয়। তবে তার আগেই শুভেন্দুর সংখ্যালঘু ভোটারদের উদ্দেশে এই বার্তা এবং ‘পরীক্ষা’ মন্তব্যকে ঘিরে রাজনৈতিক মহলে জোর চর্চা শুরু হয়েছে। ৬ অক্টোবরের ভোটেই তার রাজনৈতিক প্রতিফলন দেখা যাবে।
নন্দীগ্রাম উপনির্বাচনে বিজেপি প্রার্থী হাসিরানি রথের মনোনয়ন ঘিরে সভা থেকে চন্দ্রনাথ রথ হত্যা মামলা নিয়ে বিস্ফোরক দাবি করলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। তাঁর অভিযোগ, চন্দ্রনাথকে খুন করতে শুটারদের দিয়ে সুপারি দেওয়া হয়েছিল এবং তাঁকে সরাতে খরচ করা হয়েছিল প্রায় ২ কোটি টাকা। এই টাকা সরবরাহের পিছনে ‘ভাইপো গ্যাং’-এর ভূমিকা ছিল বলেও দাবি করেন তিনি।
শুভেন্দুর কথায়, “চন্দ্রনাথকে খুন করতে শুটার এবং তাঁদের যাঁরা সুপারি দিয়েছিলেন, তেমন সাত জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। আমার যেটুকু জানা আছে, ওকে সরিয়ে দেওয়ার জন্য দু’কোটি টাকা খরচ করা হয়েছে। এই টাকা সরবরাহের কাজ ভাইপো গ্যাং করেছে।”
চন্দ্রনাথকে খুন করতে শুটারদের কাছে টাকা পৌঁছে দেওয়ার ঘটনায় ডায়মন্ড হারবারের যোগ রয়েছে বলেও দাবি করেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্য, ওই ব্যক্তিদের কল রেকর্ডও তিনি শুনেছেন। তবে তদন্তের স্বার্থে এর বেশি কিছু প্রকাশ্যে বলতে চাননি শুভেন্দু।
তিনি বলেন, “এর থেকে বেশি কিছু বলতে পারব না। বাকিটা সিবিআই করছে।” পাশাপাশি তাঁর দাবি, এই মামলায় সাত জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে এবং চার্জশিটও দেওয়া হয়েছে। তাঁদের শাস্তি নিয়ে শুভেন্দু বলেন, “আমার বিশ্বাস তাঁদের ফাঁসি হবে।”
কী বলছে সিবিআইয়ের তদন্ত?
চন্দ্রনাথ রথ হত্যাকাণ্ডের তদন্ত করছে সিবিআই। ৬ মে মধ্যমগ্রামে গাড়ির ভিতরে গুলি করে খুন করা হয় চন্দ্রনাথকে। পরে তদন্তে উঠে আসে দীর্ঘ সময় ধরে হত্যার পরিকল্পনার তথ্য। অগস্টে সিবিআই আদালতে চার্জশিট জমা দেয়। বিভিন্ন প্রতিবেদনে চার্জশিটে ১২ জনের নাম থাকার কথা উল্লেখ করা হয়েছে, যাঁদের মধ্যে ১১ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
সিবিআইয়ের তদন্তে সাগর সোনকর এবং তাঁর ভাই সাহেব সোনকরের নামও উঠে এসেছে। তদন্তকারীদের দাবি, শুটারদের সঙ্গে যোগাযোগ, রেকি এবং হত্যার পরিকল্পনায় তাঁদের ভূমিকা ছিল। অন্যদিকে, ধৃতদের একটি বড় অংশ উত্তরপ্রদেশ ও বিহারের বাসিন্দা বলে তদন্ত-সংক্রান্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে চন্দ্রনাথ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে তৃণমূল বা ‘ভাইপো গ্যাং’-এর সরাসরি যোগের অভিযোগ সিবিআইয়ের তদন্তে এখনও প্রতিষ্ঠিত হয়েছে—এমন তথ্য প্রকাশ্যে নেই। শুভেন্দুর ডায়মন্ড হারবার যোগের দাবিও তাঁর রাজনৈতিক অভিযোগ হিসেবেই রয়েছে। ফলে এই দাবির সত্যতা তদন্তের পরবর্তী পর্যায়ে স্পষ্ট হবে।
চন্দ্রনাথ রথ ছিলেন শুভেন্দু অধিকারীর ঘনিষ্ঠ সহযোগী। তাঁর হত্যাকাণ্ডের পর থেকেই ঘটনাটি নিয়ে রাজনৈতিক চাপানউতোর চলছে। এবার নন্দীগ্রাম উপনির্বাচনের প্রচারে সেই মামলাকে সামনে এনে শুভেন্দুর নতুন অভিযোগ ঘিরে রাজ্য রাজনীতিতে ফের জোর চর্চা শুরু হয়েছে।
