প্রতি বছর বর্ষায় জল জমে ট্রেন লেটের ভোগান্তি। এবার সেই সমস্যা রুখতে কোমর বাঁধল পূর্ব রেল। হাওড়া ডিভিশনে ড্রেন পরিষ্কার, পাম্প বসানো, ট্র্যাক পেট্রোলিং থেকে শুরু করে কন্ট্রোল রুম সক্রিয়— একাধিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। রেলের দাবি, এবার বর্ষায় সময় মেনেই চলবে হাওড়া থেকে ছাড়া লোকাল ও দূরপাল্লার ট্রেন।
বর্ষা এলেই হাওড়া স্টেশন থেকে ট্রেন লেট, জল জমে লাইন বন্ধ— এটা যেন নিয়ম হয়ে গিয়েছিল। গত বছর টানা বৃষ্টিতে সাঁতরাগাছি-লিলুয়া সেকশনে ৩-৪ ঘণ্টা ট্রেন দাঁড়িয়ে গিয়েছিল। অফিস-স্কুল-হাসপাতাল, সবেতেই ভোগান্তি। যাত্রীদের সেই দুর্ভোগের কথা মাথায় রেখে এবার আগে থেকেই প্রস্তুতি সেরে ফেলল পূর্ব রেলের হাওড়া ডিভিশন। পূর্ব রেলের GM-এর নির্দেশে ইতিমধ্যেই ‘মনসুন অ্যাকশন প্ল্যান ২০২৬’ চালু হয়েছে। হাওড়া থেকে বর্ধমান মেন ও কর্ড, তারকেশ্বর, ব্যান্ডেল ও খড়গপুর লাইনের মোট ৩২টি নীচু ও জল জমার প্রবণতা আছে এমন জায়গা চিহ্নিত করা হয়েছে। এই সব জায়গায় ২৪ ঘণ্টা নজরদারির জন্য স্পেশাল ‘মনসুন টিম’ তৈরি করা হয়েছে। প্রতিটি টিমে থাকবেন ইঞ্জিনিয়ার, সিগন্যাল ও বৈদ্যুতিক বিভাগের কর্মীরা।

কী কী পদক্ষেপ নিয়েছে পূর্ব রেল?
১. ড্রেন ও কালভার্ট সাফাই: হাওড়া-ব্যান্ডেল ও হাওড়া-খড়গপুর শাখার ২০০ কিমি-র বেশি ড্রেন ও ১২০০টি কালভার্ট পরিষ্কার করা হয়েছে। জল নিকাশি দ্রুত করতে সাঁতরাগাছি, লিলুয়া, বালি, বেলুড় ও হিন্দমোটরে নতুন ১৫টি শক্তিশালী পাম্প বসানো হয়েছে। পরীক্ষামূলক ভাবে সেগুলো চালিয়েও দেখা হয়েছে।
২. ট্র্যাক ওভারহেডের নিরাপত্তা: ভারী বৃষ্টি হলেই রাত ১০টা থেকে সকাল ৬টা পর্যন্ত প্রতি ২ ঘণ্টা অন্তর ট্র্যাক পেট্রোলিং করবে রেলকর্মীরা। লাইনের পাশে ঝুঁকিপূর্ণ গাছের ডাল ছাঁটাইয়ের কাজ শেষ। ওভারহেড তারে যাতে শর্ট সার্কিট না হয়, তার জন্য ইনসুলেটরে বিশেষ কভার লাগানো হয়েছে।
৩. কন্ট্রোল রুম ও যোগাযোগ: হাওড়া স্টেশনে ২৪ ঘণ্টার ‘মনসুন কন্ট্রোল রুম’ খোলা হয়েছে। আবহাওয়া দপ্তর, জেলা প্রশাসন ও সিভিল ডিফেন্সের সাথে সরাসরি যোগাযোগ থাকবে। কোথাও জল জমলে বা গাছ পড়লে ৩০ মিনিটের মধ্যে বিকল্প ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া আছে।
৪. যাত্রী পরিষেবা ও তথ্য: প্ল্যাটফর্মে অতিরিক্ত ফ্যান, পানীয় জলের কাউন্টার ও মেডিকেল ক্যাম্পের ব্যবস্থা। ট্রেন লেট হলে SMS, X ও ‘Where is my train’ অ্যাপের মাধ্যমে যাত্রীদের প্রতি ১৫ মিনিট অন্তর আপডেট দেওয়া হবে। হাওড়া স্টেশনে ১০টি ডিজিটাল ডিসপ্লে বোর্ডে লাইভ ট্রেনের খবর দেখানো হবে।
৫. বিদ্যুৎ ও সিগন্যাল: ওভারহেড তার, সাব-স্টেশন ও সিগন্যাল রুমে ওয়াটারপ্রুফিং-এর কাজ শেষ। ঝড়-বৃষ্টিতে পাওয়ার ফেল করলে দ্রুত সারানোর জন্য ৮টি আলাদা রেস্টোরেশন টিম ২৪ ঘণ্টা রেডি থাকবে। সিগন্যালিং সিস্টেমে ডুয়াল পাওয়ার ব্যাকআপ রাখা হয়েছে।
হাওড়া ডিভিশনের DRM দীপক নিগম জানিয়েছেন, “গত বছরের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে এবার আমরা মার্চ মাস থেকেই কাজ শুরু করেছি। লক্ষ্য একটাই, বর্ষাতেও যাতে লোকাল ও এক্সপ্রেস ট্রেন ৯০% সময় মেনে চলে। যাত্রীদের যাতে সমস্যা না হয়।”
রেল সূত্রে খবর, এবার বর্ষায় হাওড়া থেকে ছাড়া ৪৫০টি লোকাল ও ১৩০টি মেল-এক্সপ্রেস ট্রেনের জন্য আলাদা ‘মনসুন টাইমটেবল’ও তৈরি রাখা হয়েছে। অতিরিক্ত ভিড় সামলাতে প্রয়োজনে ১২টি স্পেশাল লোকাল চালানোরও পরিকল্পনা আছে। প্রতি বছর বর্ষায় ১০ লক্ষের বেশি নিত্যযাত্রীর ভরসা হাওড়ার লোকাল ট্রেন। পূর্ব রেলের এই আগাম প্রস্তুতিতে স্বস্তি পাবেন অফিসযাত্রীরা। জল-জ্যাম নয়, এবার সময়েই ঘরে ফেরা— এটাই রেলের প্রতিশ্রুতি।
