দীর্ঘ ১৯ বছর নির্বাসনের পর কলকাতায় ফিরে এক লেখক তাঁর যন্ত্রণা, অপেক্ষা এবং কৃতজ্ঞতার কথা ব্যক্ত করেছেন। তিনি নারী শক্তি, মুক্ত চিন্তা এবং সব ধরনের ধর্মীয় মৌলবাদের বিরুদ্ধে তাঁর অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেন।
২০ বছর পর বাংলায় এসেন তসলিমা। আজ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন শুভেন্দু অধিকারী। অনুষ্ঠানে তসলিমাকে স্মারক দিলেন মুখ্যমন্ত্রী। ছিলেন আরও অনেক বিশিষ্টরা। এদিন মঞ্চে তসলিমা বলেন, আজ আমি কলকাতায় ফিরে এসেছি এই একটা বাক্য উচ্চারণ করতে আমার ১৯ বছর সময় লেগেছে। প্রতিটি মাস অপেক্ষা, আজ এই দীর্ঘ অপেক্ষার পর মনে হচ্ছে শুধু কলকাতায় নয় আমার হারিয়ে যাওয়া একটা অধ্যায়ে ফিরে এসেছি। মাননীয় মুখ্যমন্ত্রীর উদরতার জন্য আমি কৃতজ্ঞ। এই এর সম্মান আমি পাব তা আমার কাছে অজ্ঞাত ছিল। একজনকে লেখককে তার ভাষার শহরে আসতে পুলিশি পাহাড়ে লাগে এটাই আমাদের সমাজের সত্য। আমি এমন একটা দিন স্বপ্ন দেখি যাকে চলতে গেলে পুলিশি পাহারার প্রয়োজন হবে না। একজন স্বাধীন লেখককে মত প্রকাশ করতে গেলে নির্বাসিত হতে হবে না।
তিনি আরও বলেন, আমি কোনও রাজনৈতিক দলের হয়ে কথা বলতে আসিনি। আমি এসেছি নারী শক্তি, মুক্ত চিন্তা নিয়ে কথা বলতে। আগস্ট জন্মের মাস, নির্বাসনের মাস, আজ থেকে প্রত্যাবর্তনের মাস। ৮ অগাস্ট আমাকে বের করে দেওয়া হয়েছিল। রাষ্ট্র আমাকে দেশ থেকে সরিয়ে দিয়েছে কিন্তু আমার ভিতর থেকে দেশকে সরাতে পারেনি। ইউরোপ আমাকে নাগরিকত্ব, নিরাপত্তা আশ্রয় দিয়েছে তার জন্য আমি কৃতজ্ঞ।
১৯৭৮ সালে সেঁজুতি নামের পত্রিকায় কবিতা সঞ্চালনের কাজ করি। সেই কবিতা কাটা তার ভেদ করে বাংলাদেশে এসেছিল। রাজনীতি যেখানে দুই দেশকে ভাগ করেছিল সেখানে কবিতা দুই দেশকে এক করেছিল। আমি তো আমার দেশেও আমি কোনও অপরাধ করিনি।
৩২ বছর সাজা দিয়েছিল। কিদোষ করেছিলাম? হত্যা করেছিলাম? কোনও অপরাধ করেছিলাম ? আমি শুধু কয়েকটা সাধারণ কথা লিখেছিলাম। আমি লিখেছিলাম কোনও বিধান যদি মানুষের মর্যাদা ক্ষুণ্ন করে তাহলে সেই বিধান সরাতে হবে। শেষ পযর্ন্ত আমাকে দেশ থেকে বিতাড়িত করল। এই ঘটনা রাষ্ট্রের নৈতিক শাসনের নির্বাসন, ন্যায়ের নির্বাসন। একজন লেখককে সরিয়ে দিলে রাস্তা ঠান্ডা হয় কিন্তু হুমকিদাতাকে আরও সাহস দেয়। একটির যুক্তির পরিবর্তে আরও একটি যুক্তি দিন, একটি বইয়ের পরিবর্তে একটি বই লিখুন কিন্তু কোনও লেখককে হত্যা করবেন না। নারীকে পুরুষের অধীন করে সেই মতামত আমি মানি না। আমিসব ধর্মের মৌলবাদের বিরোধী। ইসলামের মৌলবাদের বিরোধী কারণ এই ধর্মকে আমি কাছ থেকে দেখেছি।
আমি অন্যান্য ধর্মের মৌলবাদের কথা বলে ইসলামী মৌলবাদকে অস্বীকার করি না। আমি চাই মুসলিম সমাজে মুক্ত মানসিকতার চর্চা বাড়ুক। নারীরা সম্মান পাক। ইসলামের সমালোচনা ইসলামের বিরোধী হওয়া নয়। কিন্তু ধর্ম সংস্কার করতে সাহায্য করা।আমরা সমালোচনা করি ধ্বংস করার জন্য নয় পরিবর্তনের জন্য। যে বিধান নারীকে পুরুষের যৌনদাশী করে, অধিনস্ত করে সেই বিধানের বিরুদ্ধে সরব হতে হবে। বিশ্বাসের স্বাধীনতা থাকলে, অবিশ্বাসের স্বাধীনতাও থাকতে হবে। রাষ্ট্রের কাজ ধর্ম রক্ষা করা নয়, রাষ্ট্রের কাজ বিশ্বাসী অবিশ্বাসী মানুষদের রক্ষা করা।
তিনি বলেন, বামফ্রন্ট সরকার আমাকে কলকাতা থেকে যেতে বাধ্য করেছিল। বামপন্থীরা চিরকাল ইসলামিক মৌল্যবাদকে সমর্থন করেছে। তিনি বলেন, কলকাতা আমি এত বছর ধরে তোমাকে প্রশ্ন করেছিলাম আমি তোমার কী ক্ষতি করেছিলাম, আজ আমি কিছু বলতে আসিনি শুধু বলব আমি ফিরে এসেছি


