আজ ঠিক মধ্যরাতে পশ্চিমবঙ্গ এক নজিরবিহীন সাংবিধানিক পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে চলেছে। বিদায়ী মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় পদত্যাগ করতে অস্বীকার করলেও বর্তমান বিধানসভার মেয়াদ আজ স্বয়ংক্রিয়ভাবেই শেষ হয়ে যাচ্ছে। বাংলায় ঐতিহাসিক জয় পাওয়া বিজেপি ঘোষণা করেছে যে, নতুন মুখ্যমন্ত্রী আগামী ৯ মে শপথ গ্রহণ করবেন।

আজ ঠিক মধ্যরাতে পশ্চিমবঙ্গ এক নজিরবিহীন সাংবিধানিক পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে চলেছে। বিদায়ী মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় পদত্যাগ করতে অস্বীকার করলেও বর্তমান বিধানসভার মেয়াদ আজ স্বয়ংক্রিয়ভাবেই শেষ হয়ে যাচ্ছে। বাংলায় ঐতিহাসিক জয় পাওয়া বিজেপি ঘোষণা করেছে যে, নতুন মুখ্যমন্ত্রী আগামী ৯ মে শপথ গ্রহণ করবেন। এখন মূল প্রশ্ন হল মধ্যরাত থেকে নতুন সরকার শপথ না নেওয়া পর্যন্ত বাংলার শাসনভার কার হাতে থাকবে? সুপ্রিম কোর্টের প্রাক্তন বিচারপতি সঞ্জয় কিষাণ কৌল স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন যে, বিধানসভার মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে মমতা যদি আনুষ্ঠানিকভাবে পদত্যাগ না করেন, তবে দিনের শেষে তিনি স্বয়ংক্রিয়ভাবেই তাঁর পদ হারাবেন।

সংবিধানের ১৭২ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোনও রাজ্য বিধানসভার মেয়াদ তার প্রথম অধিবেশনের দিন থেকে পাঁচ বছরের জন্য নির্ধারিত থাকে। পাঁচ বছর পূর্ণ হওয়ার পর বিধানসভা স্বয়ংক্রিয়ভাবেই ভেঙে যায়। এর জন্য রাজ্যপালের পক্ষ থেকে কোনও পৃথক আদেশের প্রয়োজন হয় না।

বাংলার নির্বাচনে বিজেপির বিপুল জয়ের ঠিক পরদিনই মমতা দৃঢ়তার সঙ্গে জানান যে, তিনি পদত্যাগপত্র জমা দিতে রাজভবনে যাবেন না। তৃণমূল নেত্রী অভিযোগ করেন যে, বিজেপি এবং নির্বাচন কমিশন ভোট লুঠের উদ্দেশ্যে ষড়যন্ত্র করেছিল। তিনি আরও দাবি করেন যে, ভবানীপুরের ভোট গণনা কেন্দ্রের ভেতরে তাঁকে লাথি মারা হয়েছিল এবং তাঁর উপর হামলা চালানো হয়েছিল। যে কেন্দ্র থেকে তিনি তাঁর প্রাক্তন সহযোগী শুভেন্দু অধিকারীর কাছে পরাজিত হয়েছিলেন।

এখন, সংবিধানের ১৬৪ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, মুখ্যমন্ত্রী এবং মন্ত্রিসভার সদস্যরা রাজ্যপালের সন্তুষ্টি সাপেক্ষে (during the pleasure of the Governor) স্ব-পদে বহাল থাকেন। তৃণমূল কংগ্রেস বিধানসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারানোর ফলে, রাজ্যপাল চাইলে বর্তমান সরকারকে বরখাস্ত করতে পারেন এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতাকে সরকার গঠনের দাবি জানাতে আমন্ত্রণ জানাতে পারেন। সুতরাং, এখন সিদ্ধান্ত নেওয়ার ভার সম্পূর্ণভাবে রাজ্যপাল আরএন রবির ওপর ন্যস্ত। তবে তাঁর সামনে বিকল্পের সংখ্যা বেশ সীমিত।

রাজ্যপালের সামনে থাকা বিকল্প

বিচারপতি কৌল জোর দিয়ে বলেন যে, রাজ্যপাল চাইলে প্রচলিত প্রথা বা রীতিনীতি অনুসরণ করে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন এবং পরবর্তী মুখ্যমন্ত্রী শপথ গ্রহণ না করা পর্যন্ত মমতাকে একটি 'তত্ত্বাবধায়ক' (caretaker) ভূমিকায় দায়িত্ব চালিয়ে যাওয়ার অনুরোধ জানাতে পারেন। বিজেপি, যারা এখনও তাদের হবু মুখ্যমন্ত্রীর নাম ঘোষণা করেনি, জানিয়েছে যে মন্ত্রীপরিষদ আগামী ৯ মে শপথ গ্রহণ করবে।

দ্বিতীয় বিকল্পটি হল মাত্র এক দিনের জন্য একটি সাময়িক প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা। বিচারপতি কৌল বলেন, "পরবর্তী মুখ্যমন্ত্রী শপথ গ্রহণ না করা পর্যন্ত তাঁকে (বর্তমান মুখ্যমন্ত্রীকে) দায়িত্ব চালিয়ে যাওয়ার অনুরোধ জানানোর যে প্রথা বা রীতি রয়েছে—রাজ্যপাল তা অনুসরণ করবেন কি না, সে বিষয়ে তাঁকেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে। এছাড়া, আগামী ৯ মে নতুন সরকার শপথ গ্রহণ করা পর্যন্ত তিনি এক দিনের জন্য কোনও সাময়িক ব্যবস্থারও আয়োজন করতে পারেন।"

সুপ্রিম কোর্টের প্রাক্তন ওই বিচারপতি উল্লেখ করেন যে, রাজ্যপাল এবং তৃণমূল কংগ্রেস (TMC) সরকারের মধ্যকার তিক্ত অতীতের কথা বিবেচনা করলে, বর্তমানে হয়ত ইতিমধ্যেই একটি 'স্থিতাবস্থা' (status quo) বজায় রাখার ব্যবস্থা কার্যকর রয়েছে। নির্বাচন কমিশন কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন করেছে এবং রাজ্যপাল নির্দেশ জারি করেছেন যে কোনও সরকারি নথিপত্র বা ফাইল আর এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় সরবে না।

তাই, মধ্যরাতের ঠিক আগের কয়েক ঘণ্টা সবার নজর থাকবে রাজ্যপাল আর এন. রবির উপর। যদি আনুষ্ঠানিকভাবে কোনও ধারাবাহিকতা বজায় রাখার নির্দেশ (continuation order) জারি না করা হয়, তবে ঘড়ির কাঁটায় রাত ১২টা বাজার সঙ্গে সঙ্গেই পশ্চিমবঙ্গ সম্ভবত এক বিরল সাংবিধানিক অনিশ্চয়তার (constitutional limbo) মুখে পতিত হতে পারে।