
ব্যাঙ্কের কর্মীদের দাবিদাওয়া দীর্ঘদিন ধরে পূরণ না হওয়ায় এবার ধর্মঘটের পথে হাঁটতে চলেছে দেশের ব্যাঙ্ক ইউনিয়নগুলি। ইউনাইটেড ফোরাম অফ ব্যাঙ্ক ইউনিয়নস (UFBU) দেশজুড়ে দফায় দফায় ধর্মঘটের ডাক দিয়েছে। এই ফোরামের দাবি, তারা দেশের ৯০ শতাংশের বেশি ব্যাঙ্ক কর্মীর প্রতিনিধিত্ব করে।
মূলত দুটি প্রধান দাবি নিয়ে এই ধর্মঘটের ডাক দেওয়া হয়েছে – সপ্তাহে পাঁচ দিন ব্যাঙ্কিং চালু করা এবং সরকারের সংশোধিত পারফরম্যান্স লিঙ্কড ইনসেনটিভ (PLI) স্কিম প্রত্যাহার করা।
ইউনিয়নের তরফে জানানো হয়েছে, আগামী ১১ সেপ্টেম্বর এক দিনের ধর্মঘট হবে। তারপরেও দাবি পূরণ না হলে ২৮ থেকে ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তিন দিনের ধর্মঘট পালন করা হবে। তাতেও সরকার কর্ণপাত না করলে ২০২৬ সালের ২৬ অক্টোবর থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য ধর্মঘটে নামবেন ব্যাঙ্ক কর্মীরা।
UFBU-তে মোট সাতটি ইউনিয়ন রয়েছে – AIBEA, AIBOC, NCBE, AIBOA, BEFI, INBOC এবং INBEF। রাষ্ট্রায়ত্ত, বেসরকারি, বিদেশি, গ্রামীণ এবং সমবায় ব্যাঙ্কের কর্মীরা এই ইউনিয়নগুলির সদস্য।
১. সপ্তাহে পাঁচ দিন ব্যাঙ্কিং চালু করা।
২. সরকারের নতুন পারফরম্যান্স লিঙ্কড ইনসেনটিভ (PLI) স্কিম বাতিল করা।
৩. দ্বিপাক্ষিক আলোচনার মাধ্যমে ইনসেনটিভ স্কিমে বদল আনা।
৪. অন্যান্য অমীমাংসিত সমস্যাগুলির সমাধান করা।
এই দাবিটি বহু বছরের পুরনো। ইউনিয়নগুলির মতে, ২০১৫ সালেই ব্যাঙ্ক কর্তৃপক্ষ নীতিগতভাবে সপ্তাহে পাঁচ দিন কাজের প্রস্তাবে রাজি হয়েছিল। তখন থেকেই মাসের দ্বিতীয় এবং চতুর্থ শনিবার ব্যাঙ্ক ছুটি থাকে। এরপর ২০২০ সালে বিষয়টি আবার ওঠে এবং ২০২৪ সালের ৮ মার্চ বেতন চুক্তিতে এটি যুক্ত হয়। চুক্তি অনুযায়ী, সমস্ত শনিবার ছুটি পাওয়ার বিনিময়ে ব্যাঙ্ক কর্মীরা সোম থেকে শুক্রবার পর্যন্ত প্রতিদিন ৪০ মিনিট অতিরিক্ত কাজ করতে রাজি হন।
ইউনিয়নগুলির অভিযোগ, এই চুক্তির পরে কেটে গেছে দু'বছরের বেশি সময়। অর্থ মন্ত্রকের কাছে অনুমোদনের জন্য পাঠানো হলেও এখনও পর্যন্ত কোনও সিদ্ধান্ত হয়নি। অথচ রিজার্ভ ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়া (RBI), LIC, GIC এবং নাবার্ডের মতো প্রতিষ্ঠানে ইতিমধ্যেই সপ্তাহে পাঁচ দিন কাজ চালু রয়েছে। কর্মীরা সোম থেকে শুক্রবার বেশি সময় কাজ করতে রাজি হওয়ায় গ্রাহক পরিষেবাতেও কোনও প্রভাব পড়বে না বলে জানিয়েছে ইউনিয়ন।
আরেকটি বড় বিবাদের কারণ হল পারফরম্যান্স লিঙ্কড ইনসেনটিভ (PLI) স্কিম। ইউনিয়নগুলি জানিয়েছে, ২০২০ সালের চুক্তি অনুযায়ী, ব্যাঙ্কের সাফাইকর্মী থেকে জেনারেল ম্যানেজার পর্যন্ত সব কর্মীর জন্য একই নিয়ম ছিল। ব্যাঙ্কের পারফরম্যান্সের উপর ভিত্তি করে কর্মীরা ১ থেকে সর্বোচ্চ ১৫ দিনের বেতন ইনসেনটিভ হিসেবে পেতেন।
কিন্তু ২০২৪ সালের নভেম্বরে ডিপার্টমেন্ট অফ ফিনান্সিয়াল সার্ভিসেস ব্যাঙ্কগুলিকে একটি সংশোধিত ফর্মুলা গ্রহণের নির্দেশ দেয়। এই নতুন নিয়ম শুধুমাত্র স্কেল IV থেকে VII পর্যন্ত সিনিয়র অফিসারদের জন্য। ইউনিয়নগুলির দাবি, এর আওতায় প্রায় ৪০,০০০ অফিসার পড়বেন, যা ব্যাঙ্কিং ইন্ডাস্ট্রির মোট ৮ লক্ষ কর্মীর মাত্র ৫ শতাংশ।
নতুন ফর্মুলা অনুযায়ী, এই সিনিয়র অফিসাররা বছরে ৩৬৫ দিন পর্যন্ত বেতন ইনসেনটিভ হিসেবে পেতে পারেন। অথচ বাকি ৯৫ শতাংশ কর্মী সর্বোচ্চ ১৫ দিনের বেতনই পাবেন।
এই বৈষম্যের প্রতিবাদে ২০২৫ সালের মার্চ মাসেও ধর্মঘটের ডাক দিয়েছিল UFBU। কিন্তু চিফ লেবার কমিশনারের হস্তক্ষেপে আলোচনা শুরু হওয়ায় সেই ধর্মঘট স্থগিত করা হয়। ইউনিয়নগুলি জানায়, তারা সংশোধনের প্রস্তাব জমা দিলেও সরকার ২০২৬ সালের মার্চে ব্যাঙ্কগুলিকে নতুন ফর্মুলা কার্যকর করার নির্দেশ দেয়। বিষয়টি এখন দিল্লি হাইকোর্টে বিচারাধীন।
সম্প্রতি ২০২৬ সালের ২১ আগস্ট ডিপার্টমেন্ট অফ ফিনান্সিয়াল সার্ভিসেস আবার ব্যাঙ্কগুলিকে এই নিয়ম কার্যকর করার নির্দেশ দেওয়ায় পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। ইউনিয়নগুলির অভিযোগ, ইন্ডাস্ট্রিয়াল ডিসপিউটস অ্যাক্ট অনুযায়ী, বিষয়টি চিফ লেবার কমিশনারের বিচারাধীন থাকাকালীন সরকার স্থিতাবস্থা লঙ্ঘন করছে।
UFBU এই নতুন স্কিমকে "বৈষম্যমূলক" বলে আখ্যা দিয়েছে। তাদের মতে, এই ব্যবস্থা সিনিয়র অফিসার এবং বাকি কর্মীদের মধ্যে একটি বিশাল বিভেদ তৈরি করবে।
AIBEA-র সি.এইচ. ভেঙ্কটাচালাম, AIBOC-র রূপম রায়, NCBE-র এল. চন্দ্রশেখর, AIBOA-র সঞ্জয় খান, BEFI-র দেবাশিস বসু চৌধুরী, INBOC-র প্রেম মাক্কার এবং INBEF-এর ও.পি. শর্মার মতো ইউনিয়ন নেতারা একযোগে জানিয়েছেন, "সরকার এবং ম্যানেজমেন্টের কাজকর্মই আমাদের এই আন্দোলনের পথে যেতে বাধ্য করেছে।"