
২০২৪ সালে দিল্লিতে সামগ্রিক অপরাধের সংখ্যা বেশ কমলেও স্বস্তি মিলছে না। ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ডস ব্যুরো (NCRB)-র নতুন রিপোর্ট বলছে, আগের বছরের তুলনায় অপরাধের মামলা কমলেও হিংসাত্মক অপরাধ, যৌন হেনস্থা এবং শিশুদের বিরুদ্ধে অপরাধের ঘটনা শহরের আইনশৃঙ্খলার ওপর কালো ছায়া ফেলছে।
বুধবার প্রকাশিত NCRB-র পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দিল্লিতে IPC এবং BNS ধারায় অপরাধের সংখ্যা ১৫.১% কমেছে। ২০২৩ সালে এই সংখ্যা ছিল ৩.২ লক্ষের বেশি, যা ২০২২ সালের থেকে প্রায় ৮% বেশি ছিল। কিন্তু ২০২৪ সালে সেই সংখ্যা কমে প্রায় ২.৮ লক্ষে দাঁড়িয়েছে।
তবে, এই তথ্যের গভীরে গেলে বোঝা যায়, দিল্লিতে অপরাধের শিকার হওয়া মানুষের সংখ্যাটা এখনও উদ্বেগজনক, যা শহরের সুরক্ষাব্যবস্থায় বড়সড় ফাঁকফোকর তুলে ধরছে।
সবচেয়ে চিন্তার বিষয় হল, নথিভুক্ত মামলার সংখ্যার চেয়ে ক্ষতিগ্রস্তের সংখ্যা অনেক বেশি। যেমন, ২০২৪ সালে মহিলাদের বিরুদ্ধে অপরাধের মামলা হয়েছে ৭,৮২৭টি, কিন্তু নির্যাতিতার সংখ্যা ৭,৯০৪। অর্থাৎ, অনেক ঘটনায় একাধিক মহিলা একসঙ্গে আক্রান্ত হয়েছেন।
ধর্ষণের ক্ষেত্রে এই প্রবণতা আরও স্পষ্ট। দিল্লিতে এই বছর ধর্ষণের মামলা হয়েছে ১,০৫৮টি, কিন্তু নির্যাতিতার সংখ্যা ১,০৮৯।
একইভাবে, শহরে ৫০৪টি খুনের মামলায় বলি হয়েছেন ৫২২ জন। পথ দুর্ঘটনাও সমান মারাত্মক। ১,৫২১টি দুর্ঘটনায় প্রাণ গেছে ১,৬৫৮ জনের, যা দিল্লির ট্র্যাফিক ব্যবস্থার ভয়াবহ ছবিটা তুলে ধরে।
রাজধানীতে পথ-অপরাধ এবং সম্পত্তি সংক্রান্ত অপরাধের সংখ্যাও অনেক বেশি। বাড়িতে চুরির ঘটনা সবচেয়ে বেশি - ১০,৬৯০টি মামলায় ১০,৭০৫ জন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। এর পরেই রয়েছে সিঁধেল চুরি, যার সংখ্যা ৮,৯৬৮।
গাড়ি চুরি তো শহরের এক বড় মাথাব্যথার কারণ। ২০২৪ সালে ৩৯,৯৭৬টি গাড়ি চুরির ঘটনা ঘটেছে। এছাড়া ১,৫১০টি ডাকাতি এবং ২২৮টি তোলাবাজির ঘটনাও ঘটেছে, যেখানে ২৩২ জন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।
দিল্লির অপরাধ জগতের আর একটি অন্ধকার দিক হল কিশোর অপরাধ। মোট ২,৩০৬টি অপরাধে কিশোররা জড়িত ছিল। এর মধ্যে ১৪৪টি খুন, ৫২৬টি ডাকাতি এবং ২১৭টি ছিনতাইয়ের ঘটনা রয়েছে। অন্যদিকে, অপহরণের মামলা হয়েছে ৫,৪১৭টি, যেখানে ৫,৬০৩ জন অপহৃত হয়েছেন।
তবে NCRB রিপোর্টের সবচেয়ে চমকে দেওয়ার মতো তথ্য হল শিশুদের বিরুদ্ধে অপরাধ। এই ক্ষেত্রে দিল্লি অন্যান্য মেট্রো শহরগুলির থেকে অনেক এগিয়ে।
শুধুমাত্র ২০২৪ সালেই দিল্লিতে শিশুদের বিরুদ্ধে ৭,৬৬২টি অপরাধের মামলা হয়েছে। সেখানে মুম্বইতে এই সংখ্যা ৩,৩৭৪ এবং বেঙ্গালুরুতে ২,০২৬।
শিশু অপহরণের সংখ্যাটা তো আরও ভয়াবহ। দিল্লিতে ৫,৪০৪টি শিশু অপহরণের ঘটনা ঘটেছে, যেখানে মুম্বইতে ১,৮৩১ এবং বেঙ্গালুরুতে ১,১৩৬। অর্থাৎ, বেঙ্গালুরুতে একটি শিশু অপহৃত হলে, দিল্লিতে সেই সংখ্যাটা প্রায় পাঁচ।
ধর্ষণের ক্ষেত্রেও মেট্রো শহরগুলির মধ্যে দিল্লি তার লজ্জার শীর্ষস্থান ধরে রেখেছে। রাজধানীতে ১,০৫৮টি ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে, যা দ্বিতীয় স্থানে থাকা জয়পুরের (৪৯৭) দ্বিগুণেরও বেশি। মুম্বইতে এই সংখ্যা ৪১১।
এমনকি ধর্ষণ বা গণধর্ষণের পর খুনের মতো নৃশংস অপরাধেও দিল্লি শীর্ষে। এখানে ৬টি ঘটনায় ৭ জন প্রাণ হারিয়েছেন, যা চেন্নাই এবং বেঙ্গালুরুর থেকে বেশি।
শিশুদের যৌন নির্যাতন থেকে রক্ষা করার আইন পকসো (POCSO) মামলাতেও একই প্রবণতা দেখা গেছে। ২০২৪ সালে দিল্লিতে ১,৫৫৩টি পকসো মামলা হয়েছে, যা মুম্বইয়ের (১,৪১৬) থেকে বেশি। সেখানে বেঙ্গালুরুতে এই সংখ্যা ৫৯৪, যা অনেকটাই নিরাপদ ছবি তুলে ধরে।