
বিহারের কাটিহারে সামনে এল এক আবেগঘন ঘটনা। ৩১ বছর আগে মাত্র ৯ বছর বয়সে পরিবারের কাছ থেকে হারিয়ে গিয়েছিলেন পিন্টু যাদব। এতগুলো বছর পর নিজের গ্রামে ফিরলেন তিনি। তবে এত দিনে তাঁর নাম ও জীবনযাত্রা বদলে গিয়েছে। এখন তিনি পরিচিত আব্দুল জব্বার নামে। ছেলেকে প্রথমে চিনতে না পারলেও চোখের উপরে ছোটবেলার পুরনো কাটা দাগ দেখে তাঁকে চিনে ফেলেন মা মীনা দেবী। দীর্ঘ ৩১ বছর পর মা-ছেলের এই মিলনে আবেগে ভেঙে পড়েন পরিবারের সদস্যরা। ঘটনাটি বিহারের কাটিহার জেলার মনিহারি ব্লকের কাঁটাকোষ গ্রামের। সেখানকার বাসিন্দা মোতিলাল যাদবের ছেলে পিন্টু একদিন বন্ধুদের সঙ্গে খেলতে খেলতে তেজনারায়ণপুর রেল স্টেশনের কাছে দাঁড়িয়ে থাকা একটি ট্রেনে উঠে পড়েন। তাঁর বন্ধুরা ট্রেন থেকে নেমে গেলেও ঘুমিয়ে পড়ায় পিন্টু আর নামতে পারেননি। ট্রেন ছেড়ে দেওয়ায় অজান্তেই বাড়ি থেকে অনেক দূরে চলে যান তিনি।
শেষ পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গের উত্তর দিনাজপুর জেলার কালিয়াগঞ্জ এলাকায় পৌঁছে যান পিন্টু। অপরিচিত জায়গায় পথ হারিয়ে কান্নাকাটি করছিলেন তিনি। সেই সময় আবদুল রহিম নামে এক ব্যক্তি তাঁকে দেখতে পান। অসহায় শিশুটিকে নিজের বাড়িতে নিয়ে গিয়ে আশ্রয় দেন তিনি। নিজের সন্তানের মতোই পিন্টুকে বড় করে তোলেন ওই পরিবারের সদস্যরা। ধীরে ধীরে পিন্টু যাদবের পরিচয় হয়ে ওঠে আবদুল জব্বার।
সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে বড় হয়ে ওঠেন পিন্টু। পরিবারের আর্থিক পরিস্থিতি ভালো না থাকায় অল্প বয়সেই কাজের সন্ধানে দিল্লি যান তিনি। পরবর্তীতে মুতাইনা খাতুনকে বিয়ে করেন। বর্তমানে তাঁর তিন সন্তান রয়েছে। তবে ছোটবেলার পরিবার ও নিজের গ্রামের স্মৃতি মন থেকে মুছে যায়নি। নিজের জন্মদাতা বাবা-মায়ের খোঁজ পাওয়ার চেষ্টাও চালিয়ে গিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু প্রথম দিকের চেষ্টা সফল হয়নি। দিল্লিতে কাজ করার সময় মনিহারির কয়েকজনের সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়। বাবার নাম মোতিলাল যাদব এবং গঙ্গার ধারে নিজের গ্রামের অবস্থানের কথা তাঁদের জানান তিনি। এরপর পরিচিতদের সাহায্যে নিজের পরিবারের খোঁজ শুরু করেন।
পিন্টুর পরিবারের কাছে ফিরে যাওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয় সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিও। গ্রামের ছবি ও পরিচিত এলাকার কিছু সূত্র দেখে তাঁর পুরনো স্মৃতি জেগে ওঠে। পরিচিতদের সাহায্য নিয়ে তৃতীয়বারের চেষ্টায় নিজের জন্মভিটে কাঁটাকোষ গ্রামে পৌঁছতে সক্ষম হন তিনি। ৩১ বছর পর ছেলেকে সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে প্রথমে তাঁকে চিনতে পারেননি বাবা-মা। কিন্তু মায়ের নজর পড়ে ছেলের চোখের উপরে থাকা ছোটবেলার কাটা দাগে। সেই পুরনো চিহ্নই ফিরিয়ে দেয় হারিয়ে যাওয়া সন্তানকে চেনার সূত্র। এরপর মা মীনা দেবী ছেলেকে জড়িয়ে ধরেন। বাবা মোতিলাল যাদবও ছেলেকে ফিরে পেয়ে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন।
এই ঘটনার সবচেয়ে আবেগপূর্ণ দিক হল, দীর্ঘদিন পর ছেলেকে ফিরে পেয়ে তাঁর বর্তমান পরিচয় বা ধর্মীয় পরিচয় নিয়ে আপত্তি করেননি জন্মদাতা বাবা-মা। বরং পিন্টুর স্ত্রী ও তিন সন্তানকেও পরিবারের সদস্য হিসেবে গ্রহণ করতে চান তাঁরা। বাবা মোতিলাল যাদব জানিয়েছেন, ছেলে স্ত্রী ও সন্তানদের নিয়ে বাড়িতে এলে তাঁদের আপন করে নেবেন। যে পরিবার ছোটবেলায় পিন্টুকে আশ্রয় দিয়ে বড় করেছে, সেই পরিবারের প্রতিও কৃতজ্ঞতা রয়েছে। কারণ, অসহায় অবস্থায় পিন্টুকে আশ্রয় দিয়ে নতুন জীবন গড়ার সুযোগ করে দিয়েছিল ওই পরিবার।
৩১ বছর আগে যে শিশু ট্রেনে ঘুমিয়ে পড়ে পরিবারের কাছ থেকে হারিয়ে গিয়েছিল, আজ তাঁর নিজের সংসার রয়েছে। একদিকে জন্মদাতা বাবা-মা ও ভাইবোন, অন্যদিকে ছোটবেলায় আশ্রয় দেওয়া পরিবার, স্ত্রী ও সন্তান—দুই পরিবারের সঙ্গেই তাঁর আবেগের সম্পর্ক রয়েছে। দীর্ঘ তিন দশকের বিচ্ছেদ কাটিয়ে পিন্টুর বাড়ি ফেরার ঘটনা এলাকায় আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। এই কাহিনি শুধু হারিয়ে যাওয়া সন্তানের ফিরে আসার নয়, বরং মানুষের প্রতি মানুষের মমতা, পারিবারিক টান এবং সম্পর্কের গভীরতারও এক অনন্য উদাহরণ।