আমেরিকা ও তাদের মিত্রদের সঙ্গে সংঘাত এখনও শেষ হয়নি। সোমবার ইরানের ইসলামিক রেভোলিউশনারি গার্ড কোর (IRGC) সাফ জানিয়ে দিল, পশ্চিম এশিয়ায় উত্তেজনা বাড়লে তারা দীর্ঘমেয়াদি লড়াইয়ের জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত।
আল-আলম নিউজ নেটওয়ার্ককে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে আইআরজিসি-র সেকেন্ড ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হোসেইন মহেব্বি বলেন, ইরানি বাহিনী 'দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের' জন্য প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে। সংঘাত যদি আরও বড় আকার নেয়, তবে কড়া জবাব দিতে তারা তৈরি।
মহেব্বি বলেন, "আমাদের চোখে যুদ্ধ মানে যুদ্ধই। এর নানা পর্যায় থাকতে পারে, কিন্তু যুদ্ধ শেষ হয়নি, চলছে। আইআরজিসি দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের জন্য নিজেদের প্রস্তুত করেছে। আমরা আগেও তৈরি ছিলাম, এখন আরও বেশি প্রস্তুত। এটা নতুন কোনও পর্যায় নয়। তবে সংঘাত যদি আরও তীব্র হয়, আমরা নিঃসন্দেহে নিজেদের রক্ষা করতে প্রস্তুত।"
আইআরজিসি-র এই মুখপাত্র আরও দাবি করেন, ইরানের সঙ্গে এই সংঘাতে আমেরিকা, ইজরায়েল এবং তাদের মিত্ররা নিজেদের লক্ষ্য পূরণে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে। তাঁর কথায়, "আমেরিকা, ইহুদি শাসক (ইজরায়েল) ও তাদের মিত্রদের সঙ্গে এই যুদ্ধ নিয়ে আইআরজিসি-র মূল্যায়ন হলো— আমেরিকা এই যুদ্ধে হেরেছে। তাদের এই হার ঐতিহাসিক এবং লজ্জাজনক। কিন্তু সেই হার স্বীকার করে নেওয়ার মতো সাহস তাদের নেই।" তিনি আরও দাবি করেন, আমেরিকার এই ব্যর্থতার কথা খোদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বেশ কয়েকজন সামরিক ও রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞও স্বীকার করেছেন।
আমেরিকা ও ইজরায়েলকে নিশানা ইরানের
মহেব্বি যোগ করেন, "আমেরিকা ও ইহুদি শাসকের এই ব্যর্থতা এমন একটা বিষয়, যা খোদ আমেরিকার সামরিক ও রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা মেনে নিচ্ছেন। একটু খেয়াল করলেই এই ব্যর্থতা স্পষ্ট বোঝা যায়। অনেকেই মনে করেন, আমেরিকা তাদের ঠিক করা লক্ষ্যগুলো ছুঁতে পারেনি। বিশেষ করে জায়নবাদী শাসক যে লক্ষ্যগুলো ঠিক করে দিয়েছিল, সেগুলো পূরণে আমেরিকা ব্যর্থ। আর সেই কারণেই তারা হেরেছে।"
মহেব্বি তাঁর সাক্ষাৎকারে কৌশলগত দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালীর কথাও তুলে ধরেন। তিনি জানান, সামরিক শক্তি থাকা সত্ত্বেও আমেরিকা এই প্রণালী পুনরায় খুলতে ব্যর্থ হয়েছে। অথচ অবাধ নৌ-চলাচল এবং জ্বালানি নিরাপত্তার কথা তারাই সবচেয়ে বেশি বলে। তিনি বলেন, "আমেরিকার ব্যর্থতার অন্যতম বড় জায়গা হলো হরমুজ প্রণালী খুলতে না পারা। বিশ্বের সবচেয়ে বড় নৌবাহিনী তাদের হাতে। তারা সবসময় বলে যে, জ্বালানি সরবরাহ ও নৌ-চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই তারা এই অঞ্চলে রয়েছে। কিন্তু এই যুদ্ধে পরিষ্কার হয়ে গেছে যে, প্রণালীটি খোলার ক্ষমতা আমেরিকার নেই। তারা নিজেদের সবরকম অস্ত্র ব্যবহার করেও ব্যর্থ হয়েছে।"
মহেব্বি আরও বলেন, "দ্বিতীয়ত, বিভিন্ন জলপথে জ্বালানি সরবরাহ ও নৌ-চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার যে স্লোগান তারা দেয়, তাতেও তারা ডাহা ফেল। সবচেয়ে বড় কথা হলো, যে দেশ নিরাপত্তা দেওয়ার বড়াই করে, তারাই এখন নিরাপত্তা বিঘ্নিত করছে।"
২৮ ফেব্রুয়ারি আমেরিকা ও ইজরায়েল ইরানের ওপর হামলা চালালে পশ্চিম এশিয়ায় এই সংঘাতের সূত্রপাত হয়। ওই হামলায় ইরানের প্রাক্তন সর্বোচ্চ নেতা নিহত হন। এরপরেই ইরান পালটা হামলা শুরু করে, যার জেরে শেষ পর্যন্ত যুদ্ধবিরতি হয়। তবে সংঘাতের একেবারে প্রথম দিক থেকেই হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতেই রেখেছিল ইরান।
জুলাই মাসে আমেরিকা ইরানের ওপর বেশ কয়েকটি বিমান হামলা চালায় এবং নৌ-অবরোধ করে। ইরানি আধিকারিকদের মতে, এর ফলে ১৭ জুন স্বাক্ষরিত ১৪ দফার সমঝোতা চুক্তি (MoU) লঙ্ঘিত হয়েছে। ওই অঞ্চলে সংঘাত মেটাতেই ওই চুক্তি হয়েছিল।
এর জবাবে ইরান পশ্চিম এশিয়া জুড়ে আমেরিকার বিভিন্ন কৌশলগত ঘাঁটিতে হামলা চালায় এবং সব ধরনের যাতায়াতের জন্য হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেওয়ার কথা ঘোষণা করে। পশ্চিম এশিয়ায় সার্বিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং সংঘাত নিয়ে চলা এই লাগাতার উত্তেজনার মাঝেই মহেব্বির এই মন্তব্য সামনে এল।