
নিউক্লিয়ার ফ্যামিলি, দুজনেই চাকরি। বাচ্চাকে দেখার কেউ নেই। তাই ভরসা ডে কেয়ার বা ক্রেশ। কিন্তু সম্প্রতি পরপর কয়েকটি ঘটনা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল, সব ঝাঁ চকচকে ক্রেশই নিরাপদ নয়। দিল্লির দ্বারকায় ২ বছরের শিশুকে চড় মারার অপরাধে গ্রেফতার হয়েছে আয়া। বেঙ্গালুরুতে খাবার নষ্ট করার ‘শাস্তি’ হিসেবে বাচ্চাকে বাথরুমে আটকে রাখার ভিডিও ভাইরাল। কলকাতার সল্টলেকেও গত বছর এক ক্রেশের বিরুদ্ধে বাচ্চাকে ঘুমের ওষুধ খাওয়ানোর অভিযোগ ওঠে।
কেন ঘটে এমন নির্যাতন? চাইল্ড রাইটস অ্যাক্টিভিস্টদের মতে, ৩টি প্রধান কারণ: ১. ট্রেনিং ছাড়া স্টাফ: ৮০০০-১০০০০ টাকা বেতনে অদক্ষ আয়া নিয়োগ। বাচ্চা সামলানোর ধৈর্য বা ট্রেনিং কোনোটাই নেই। ২. অতিরিক্ত বাচ্চা, কম স্টাফ: নিয়ম হল প্রতি ৫ জন শিশুর জন্য ১ জন কেয়ারগিভার। কিন্তু খরচ বাঁচাতে ১৫-২০টা বাচ্চার দায়িত্বে রাখা হয় ১ জনকে। মাথা গরম হয়ে যায়। ৩. জবাবদিহিতার অভাব: সিসিটিভি থাকলেও বাবা-মাকে অ্যাক্সেস দেওয়া হয় না। “প্রাইভেসি”র অজুহাত দেখানো হয়।
ভর্তির আগে যে ৭টা জিনিস অবশ্যই দেখে নেবেন: চেকলিস্ট
১. লাইসেন্স ও রেজিস্ট্রেশন আছে তো? যেকোনো ডে কেয়ার চালাতে গেলে স্থানীয় পুরসভা ও রাজ্যের সমাজকল্যাণ দফতরের লাইসেন্স লাগে। লাইসেন্সের কপি চেয়ে নিন। রেজিস্ট্রেশন নম্বর দিয়ে অনলাইনে ভেরিফাই করুন। লাইসেন্স না থাকলে বড় দুর্ঘটনায় পুলিশ বা ইন্স্যুরেন্স কোনো সাহায্য করবে না।
২. স্টাফ ও শিশুর অনুপাত কত? নিয়ম: ৬ মাস-১ বছর = ১:৩, ১-৩ বছর = ১:৫, ৩-৬ বছর = ১:১০। সরাসরি ক্লাসে গিয়ে গুনে দেখুন। দুপুরে স্টাফরা খেতে গেলে বা ছুটিতে থাকলে রেশিও ঠিক থাকে কিনা জিজ্ঞাসা করুন।
৩. সিসিটিভি অ্যাক্সেস দেবে কিনা? মুখের কথায় ভুলবেন না। লিখিত দিন যে আপনি মোবাইল অ্যাপে লাইভ সিসিটিভি অ্যাক্সেস পাবেন। শুধু ক্লাসরুম নয়, খাওয়ার ঘর, ঘুমের ঘর, খেলার জায়গা— সব কভার আছে কিনা দেখুন। বাথরুমের ভিতরে ক্যামেরা থাকবে না, কিন্তু দরজার বাইরে থাকা বাধ্যতামূলক। “রেকর্ডিং ১৫ দিন রাখি” এমন প্রতিশ্রুতি নিন।
৪. স্টাফদের ব্যাকগ্রাউন্ড ভেরিফিকেশন হয়? প্রিন্সিপাল বা ওনারকে জিজ্ঞাসা করুন, “আয়া ও টিচারদের পুলিশ ভেরিফিকেশন করান?” NOC দেখতে চান। যাদের POCSO বা শিশু নির্যাতনের কেস আছে, তারা যেন স্টাফ না হয়। স্টাফরা চাইল্ড সাইকোলজি বা ফার্স্ট এইডের ট্রেনিং পেয়েছে কিনা জানুন।
৫. ইমার্জেন্সি প্রোটোকল কী? বাচ্চা হঠাৎ জ্বর, খিঁচুনি, পড়ে গিয়ে কেটে গেলে কী করবে? কাছের হাসপাতাল কোনটা? ডাক্তার অন কল আছে? ফার্স্ট এইড বক্স আপডেটেড? ফায়ার এক্সিট, ফায়ার এক্সটিংগুইশার আছে? মাসে একবার ফায়ার ড্রিল হয় কিনা জিজ্ঞাসা করুন। আপনার অনুমতি ছাড়া বাচ্চাকে কোনো ওষুধ দেবে না, এই মর্মে লিখিত নিন।
৬. সারপ্রাইজ ভিজিট করতে দেবে? ভর্তির সময়ই বলে দিন, আপনি যেকোনো দিন, যেকোনো সময়ে নোটিস ছাড়া আসতে পারেন। ভালো ডে কেয়ার কখনো বাধা দেবে না। “এখন বাচ্চারা ঘুমাচ্ছে, আসবেন না” বললে সন্দেহ করুন। সপ্তাহে ১ দিন দুপুরে হঠাৎ গিয়ে দেখুন বাচ্চারা কী খাচ্ছে, কীভাবে ঘুমাচ্ছে।
৭. খাবার ও হাইজিন কেমন? কিচেন নিজে গিয়ে দেখুন। রান্নার মাসি হাত ধুয়ে, মাথা ঢেকে কাজ করছে কিনা। বাচ্চাদের জোর করে খাওয়ানো হয় কিনা অন্য বাবা-মাকে জিজ্ঞাসা করুন। টয়লেট পরিষ্কার কিনা, বাচ্চার ডায়াপার বদলানোর পর কেয়ারগিভার হাত ধোয় কিনা দেখুন।
বাচ্চা নির্যাতিত হচ্ছে কিনা বুঝবেন কীভাবে?
রেড ফ্ল্যাগ লক্ষণ ১. আচরণগত বদল: হঠাৎ খুব চুপচাপ, বা অতিরিক্ত অ্যাগ্রেসিভ। ক্রেশের নাম শুনলেই কাঁদা, লুকিয়ে পড়া, রাতে দুঃস্বপ্ন দেখা। ২. শারীরিক চিহ্ন: শরীরে আঁচড়, কালশিটে, কামড়ের দাগ। বারবার একই জায়গায় দাগ। যৌনাঙ্গে লালচে ভাব বা ব্যথা। ৩. খাওয়া-ঘুমের সমস্যা: হঠাৎ খাওয়া বন্ধ, বা গোগ্রাসে খাওয়া। ঘুমের মধ্যে চমকে ওঠা। ৪. রিগ্রেশন: যে বাচ্চা টয়লেট ট্রেনড, সে আবার বিছানায় পেচ্ছাপ করা শুরু করল।
এমন লক্ষণ দেখলে বাচ্চাকে বকবেন না। আদর করে জিজ্ঞাসা করুন। খেলার ছলে জানতে চান। দরকারে চাইল্ড সাইকোলজিস্টের সাহায্য নিন।
কিছু ঘটলে কী করবেন? ১. সাথে সাথে প্রমাণ জোগাড় করুন: সিসিটিভি ফুটেজ, বাচ্চার শরীরের ছবি, ডাক্তারের প্রেসক্রিপশন। ২. লোকাল থানায় FIR করুন। POCSO আইনে মামলা হয়। ৩. চাইল্ড হেল্পলাইন ১০৯৮-এ ফোন করুন। ন্যাশনাল কমিশন ফর প্রোটেকশন অফ চাইল্ড রাইটস NCPCR-এর ওয়েবসাইটে অনলাইন কমপ্লেন করুন। ৪. সোশ্যাল মিডিয়ায় নাম-সহ পোস্ট করে অন্যদের সতর্ক করুন।
সন্তান আপনার। তার নিরাপত্তার দায়িত্বও আপনার। “সবাই তো রাখছে” ভেবে বা “বাড়ির কাছে” বলে যেখানে-সেখানে ভর্তি করবেন না। ১০টা ডে কেয়ার ঘুরুন, ১০০টা প্রশ্ন করুন, তারপর সিদ্ধান্ত নিন।
Lifestyle Tips & Articles in Bangla (লাইফস্টাইল নিউজ): Read Lifestyle Tips articles & Watch Videos Online - Asianet Bangla News