
বৈশাখের দুপুর। রাস্তায় দাঁড়িয়ে বরফ দেওয়া আখের রস। এক গ্লাস খেলেই শরীর-মন জুড়িয়ে যায়। ভাবছেন, কোল্ড ড্রিংকসের চেয়ে তো ভালো? ফল তো, ন্যাচারাল তো।
কথাটা অর্ধেক সত্যি। আখের রসে আয়রন, ক্যালসিয়াম, অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট আছে। জন্ডিসে ডাক্তাররাও খেতে বলেন। কিন্তু ‘অতিরিক্ত’ আর ‘রোজ’ শব্দ দুটো যোগ হলেই এই অমৃত বিষ হয়ে যায়।
রোজ আখের রস খেলে শরীরে কী কী বিপদ ডেকে আনছেন?
১. ব্লাড সুগারের রোলার কোস্টার, ডায়াবেটিসের দরজা খোলা ১ গ্লাস, মানে ২৫০ ml আখের রসে চিনি থাকে ৫০ গ্রাম পর্যন্ত। মানে ১২ চামচ চিনি একবারে খাচ্ছেন। WHO বলছে সারাদিনে ২৫ গ্রাম চিনি লিমিট। আপনি এক গ্লাসেই ডবল খেয়ে ফেললেন।
এই ‘লিকুইড সুগার’ সরাসরি রক্তে মেশে। ফলে ইনসুলিন স্পাইক করে। রোজ এই স্পাইক হলে ৫ বছরে প্যানক্রিয়াস ক্লান্ত হয়ে যাবে। প্রি-ডায়াবেটিক বা যাদের ফ্যামিলিতে সুগার আছে, তাদের জন্য রোজ আখের রস মানে নিজের হাতে ডায়াবেটিস ডেকে আনা। ‘সুগার ক্র্যাশ’ হয়ে দুর্বল লাগা, মাথা ঘোরা শুরু হবে।
২. লিভারে চর্বি জমা, নন-অ্যালকোহলিক ফ্যাটি লিভার আখের রসের চিনির ৫০% হল ফ্রুকটোজ। এই ফ্রুকটোজ শুধু লিভারেই প্রসেস হয়। রোজ বেশি ফ্রুকটোজ ঢুকলে লিভার সেটাকে ফ্যাটে কনভার্ট করে জমাতে শুরু করে। কোল্ড ড্রিংকস যেভাবে ফ্যাটি লিভার করে, আখের রসও সেম কাজ করে। তফাৎ শুধু ‘ন্যাচারাল’ তকমা। USG করলে দেখবেন গ্রেড-১ ফ্যাটি লিভার হয়ে বসে আছে।
৩. ওজন বাড়বে, পেট কমবে না আখের রস ‘জিরো ফ্যাট’ ঠিকই, কিন্তু ১ গ্লাসে ক্যালোরি ভাতের থেকেও বেশি। এই ক্যালোরি কোনো ফাইবার ছাড়া আসছে। মানে পেট ভরবে না, কিন্তু ফ্যাট জমবে। গরমে রোজ ২ গ্লাস খেলে মাসে ২ কেজি ওজন বাড়া স্বাভাবিক। পেটের চারপাশে ভিসেরাল ফ্যাট জমবে, যেটা হার্টের জন্য সবচেয়ে খারাপ।
৪. রাস্তার রস মানে জন্ডিস-টাইফয়েড-ডায়রিয়ার বোমা ICMR-এর রিপোর্ট বলছে, রাস্তার ৭০% আখের রসের নমুনায় Salmonella পাওয়া গেছে। কারণ ৩ টে: - নোংরা আখ: আখ ধোয়া হয় না। মাঠ থেকে তুলে ড্রেনের পাশেই রাখা হয়। - মেশিন: রস বের করার মেশিন মাসে একবারও পরিষ্কার হয় না। ভেতরে ছাতা, মরা পোকা, মরচে। - বরফ: ড্রেনের জলের বরফ দেওয়া হয়। সাথে লেবু, বিটনুন, পুদিনা, সব খোলা থাকে। মাছি বসে। এই রস খেয়ে হেপাটাইটিস-A, হেপাটাইটিস-E, টাইফয়েড, কলেরা হামেশা হচ্ছে। বাচ্চা আর বয়স্কদের জন্য এটা প্রাণঘাতী হতে পারে।
৫. কিডনিতে পাথর আর ইউরিক অ্যাসিড বাড়ায় আখের রসে ক্যালসিয়াম আর অক্সালেট দুটোই বেশি। যাদের কিডনি স্টোনের হিস্ট্রি আছে, রোজ খেলে ক্যালসিয়াম অক্সালেট স্টোনের সাইজ বাড়বে। এছাড়া ফ্রুকটোজ ইউরিক অ্যাসিড বাড়ায়। ফলে গাঁটে ব্যথা, গাউটের সমস্যা ট্রিগার করতে পারে।
তাহলে কি একদম খাবেন না? খাবেন, কিন্তু নিয়ম মেনে। ১. সপ্তাহে ১ দিন, ১৫০ ml: মানে ছোট গ্লাসের ১গ্লাস। দুপুরের খাবারের ২ ঘণ্টা পর। খালি পেটে নয়। ২. বাড়িতে বানান: আখ কিনে ভালো করে ধুয়ে, পরিষ্কার মেশিনে বের করুন। বরফ ছাড়া খান। ৩. রাস্তায় খেলে দেখে নিন: দোকান পরিষ্কার কি না, গ্লাস ধুচ্ছে কি না, বরফের রং কেমন। সন্দেহ হলে খাবেন না। ৪. এরা এড়িয়ে চলুন: ডায়াবেটিস, ফ্যাটি লিভার, IBS, কিডনি স্টোন, ইউরিক অ্যাসিডের রোগী। প্রেগন্যান্ট মহিলারাও রোজ খাবেন না।
বদলে কী খাবেন গরমে? ডাবের জল, পাতিলেবু-জল চিনি ছাড়া, বাটারমিল্ক, পুদিনা-জিরার শরবত। এগুলো ইলেকট্রোলাইট দেবে, সুগার স্পাইক করবে না।
মনে রাখবেন, ন্যাচারাল মানেই ‘যত খুশি খাওয়া যায়’ নয়। বিষ-অমৃতের ফারাকটা ডোজেই লুকিয়ে থাকে। আজ থেকে আখের রসকে ‘ট্রিট’ হিসেবে দেখুন, ‘ডেইলি ড্রিংক’ হিসেবে নয়।
Lifestyle Tips & Articles in Bangla (লাইফস্টাইল নিউজ): Read Lifestyle Tips articles & Watch Videos Online - Asianet Bangla News