
এক বাটি গরম ঝোলের মধ্যে ডুবে থাকা টুকরোগুলো দেখে প্রথম নজরে খুব একটা অস্বাভাবিক কিছু মনে হবে না। মশলা মাখা, নরম, আবার কামড় দিলে খানিকটা মাংসল অনুভূতি। কিন্তু প্লেটে থাকা এই খাবারটির সঙ্গে প্রাণিজ মাংসের সম্পর্ক একেবারেই নেই। নাম তার—সয়া চাঙ্কস।
নিরামিষ রান্নায় গত কয়েক বছরে সয়া চাঙ্কসের ব্যবহার অনেকটাই বেড়েছে। বাড়ির সাধারণ তরকারি থেকে শুরু করে বিরিয়ানি, পোলাও কিংবা নানা ধরনের স্ন্যাকস—বিভিন্ন রান্নায় জায়গা করে নিয়েছে এই খাবার। কিন্তু মজার বিষয় হল, যে খাবারটি দেখতে ও খেতে অনেকটা মাংসের মতো, তার শুরুটা আসলে একটি উদ্ভিদ থেকেই।
সয়া চাঙ্কস কোনও আলাদা ধরনের শস্য নয়। এর ভিত্তি হল সয়াবিন। তবে গোটা সয়াবিনকে স্রেফ কেটে বা শুকিয়ে এই খাবার তৈরি করা হয় না। এর জন্য প্রয়োজন হয় বেশ কিছু ধাপের খাদ্যপ্রক্রিয়াকরণ।
সয়াবিনে থাকা তেলের একটি বড় অংশ প্রথমে সরিয়ে নেওয়া হয়। এরপর অবশিষ্ট প্রোটিনসমৃদ্ধ উপাদানকে কাজে লাগিয়ে তৈরি করা হয় টেক্সচার্ড সয়া প্রোটিন বা TSP। এই প্রক্রিয়ায় ব্যবহৃত হয় ‘এক্সট্রুশন’ প্রযুক্তি।
সহজ করে বললে, নির্দিষ্ট তাপমাত্রা ও চাপের মধ্যে সয়া প্রোটিনকে এমনভাবে প্রক্রিয়াজাত করা হয়, যাতে তার গঠন বদলে গিয়ে একটি নির্দিষ্ট টেক্সচার তৈরি হয়। সেই উপাদান থেকেই তৈরি হতে পারে ছোট নাগেট, বড় চাঙ্কস কিংবা দানাদার গ্র্যানিউল।
অর্থাৎ, প্যাকেটের ভিতরের ছোট ছোট টুকরোগুলির পিছনে রয়েছে সয়াবিনকে নতুন রূপ দেওয়ার একটি খাদ্যপ্রযুক্তি।
সয়া চাঙ্কসের আর একটি মজার বৈশিষ্ট্য রয়েছে। প্যাকেট খুললে যে টুকরোগুলি বেশ শক্ত ও হালকা মনে হয়, গরম জলে কিছুক্ষণ রাখার পর সেগুলিই নরম ও ফুলে ওঠে।
কারণ প্রক্রিয়াজাত করার সময় সয়া প্রোটিনের মধ্যে এমন একটি ফাঁপা কাঠামো তৈরি হয়, যা পরে জল শুষে নিতে পারে। সেই জল ঢুকে পড়ে টুকরোগুলির ভিতরের গঠনে। ফলে সেগুলি নরম হয় এবং রান্নার সময় ঝোল, মশলা বা সসও সহজে ধরে রাখতে পারে।
এই কারণেই সয়া চাঙ্কস দিয়ে রান্না করলে শুধু মশলার সঙ্গে মিশে থাকে না, বরং রান্নার স্বাদও বেশ ভালোভাবে শুষে নেয়।
এখানেই রয়েছে সয়া চাঙ্কসের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য।
সয়া প্রোটিনকে যে পদ্ধতিতে প্রক্রিয়াজাত করা হয়, তাতে তার গঠন এমন হয় যে রান্নার পর খাবারটি চিবোতে গেলে একটি আলাদা ধরনের দৃঢ়তা পাওয়া যায়। সেই টেক্সচারই অনেকটা মাংসের কথা মনে করিয়ে দেয়।
তাই সয়া চাঙ্কসকে অনেক সময় ‘ভেজ মিট’ বলা হয়। তবে নামটি শুনে ভুল বোঝার কারণ নেই। এটি মাংসের কোনও বিকল্প নাম নয়, বরং মাংসের মতো টেক্সচার দেওয়া উদ্ভিদজাত খাবার।
অর্থাৎ, চেহারা বা মুখের অনুভূতিতে মিল থাকলেও উৎসের জায়গায় দুটির মধ্যে বিস্তর পার্থক্য।
সয়া চাঙ্কস নিরামিষ রান্নাঘরে জনপ্রিয় হওয়ার পিছনে শুধু মাংসের মতো টেক্সচার নয়, পুষ্টিগুণও গুরুত্বপূর্ণ।
সয়াবিন নিজেই উদ্ভিদজাত প্রোটিনের একটি পরিচিত উৎস। আর সয়া চাঙ্কস তৈরির সময় তেলের বড় অংশ সরিয়ে প্রোটিনসমৃদ্ধ অংশ ব্যবহার করা হয়। ফলে শুকনো পণ্যে প্রোটিনের ঘনত্ব যথেষ্ট বেশি থাকে।
ভারতের খাদ্যনিরাপত্তা ও মান নিয়ন্ত্রক সংস্থা FSSAI-এর নির্ধারিত মান অনুযায়ী, টেক্সচার্ড সয়া প্রোটিনে শুকনো অবস্থায় অন্তত ৫০ শতাংশ প্রোটিন থাকা উচিত। একই সঙ্গে এতে ফ্যাটের সর্বোচ্চ মাত্রা ১ শতাংশ নির্ধারিত রয়েছে।
এই বৈশিষ্ট্যের জন্য মাছ-মাংস কম খাওয়া বা একেবারেই না খাওয়া মানুষের খাদ্যতালিকায় সয়া একটি প্রোটিনের উৎস হিসেবে জায়গা পেতে পারে।
তবে ‘প্রোটিন বেশি’ মানেই প্রতিদিন শুধু সয়া নয়
এখানেও রয়েছে একটু সতর্কতার জায়গা।
সুষম খাবারের অর্থ শুধু একটি নির্দিষ্ট পুষ্টি উপাদান বেশি পাওয়া নয়। শরীরের প্রয়োজন মেটাতে খাদ্যতালিকায় বিভিন্ন ধরনের খাবার থাকা দরকার। ডাল, শস্য, বাদাম, বীজ, শাকসবজি এবং অন্যান্য প্রোটিনের উৎসের সঙ্গে মিলিয়েই খাবারের ভারসাম্য তৈরি করা ভালো।
আর যাঁদের সয়াবিনে অ্যালার্জি রয়েছে, তাঁদের অবশ্যই সতর্ক থাকতে হবে। সয়া-জাত খাবার তাঁদের ক্ষেত্রে অ্যালার্জিক প্রতিক্রিয়া তৈরি করতে পারে।
বাজারে এখন সয়া দিয়ে তৈরি নানা ধরনের খাবার পাওয়া যায়। তাই শুধু প্যাকেটের সামনে ‘Soy’ লেখা দেখেই কোনও পণ্যকে সাধারণ সয়া চাঙ্কস ধরে নেওয়া ঠিক নয়।
বিশেষ করে ফ্লেভার বা seasoning দেওয়া প্রস্তুত খাবার কিনলে পিছনের ইনগ্রিডিয়ানস দেখে নেওয়া ভালো। তাতে পণ্যটির মধ্যে ঠিক কী কী উপাদান রয়েছে, তা সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যায়।
শেষ পর্যন্ত সয়া চাঙ্কসের গল্পটা আসলে মাংসের নকল করার গল্প নয়। বরং একটি উদ্ভিদজাত উপাদানকে আধুনিক খাদ্যপ্রক্রিয়ার মাধ্যমে এমন রূপ দেওয়ার গল্প, যাতে সেটি রান্নার পর পাওয়া যায় পরিচিত মাংসল টেক্সচার।
তাই পাতে সয়া চাঙ্কস দেখলে প্রশ্নটা আর ‘এটা মাংস কি না’ নয়। বরং বলা যায়—সয়াবিন কীভাবে এমন এক খাবারে বদলে গেল, যা মাংসের মতো অনুভূতি দিতে পারে? সেই উত্তর লুকিয়ে রয়েছে খাদ্যপ্রযুক্তি, প্রোটিন এবং রান্নার বিজ্ঞান—এই তিনের মিলনেই।
Lifestyle Tips & Articles in Bangla (লাইফস্টাইল নিউজ): Read Lifestyle Tips articles & Watch Videos Online - Asianet Bangla News