
অফিসের মিটিং, বন্ধুদের আড্ডা, এমনকি ইনস্টাগ্রাম রিলেও এখন একটাই ডায়লগ ট্রেন্ডিং। “ভাই কাল ২ ঘণ্টা ঘুমিয়েছি, তাও অফিস সামলেছি”। “ঘুম? ওটা তো উইকএন্ডে হবে। “সাকসেসফুল হতে গেলে রাত জাগতেই হবে”। এই যে কম ঘুমানোকে মেডেলের মতো বুকে ঝোলানো, আর যে ঠিকমতো ঘুমায় তাকে “অলস” “সিরিয়াস নয়” বলে দাগিয়ে দেওয়া — এরই নাম ‘স্লিপ শেমিং’।
এর পেছনে ৩টে কারণ কাজ করছে। এক নম্বর হল হাসল কালচার। সোশ্যাল মিডিয়ায় বড় বড় সিইও-রা বলেন “আমি ৪ ঘণ্টা ঘুমাই”। আমরা ভাবি কম ঘুমালেই বুঝি টাকা আসবে। দুই নম্বর হল স্টুডেন্ট আর কর্পোরেট লাইফের চাপ। পরীক্ষা বা ডেডলাইনের সময় প্রথমে যে জিনিসটা কাটা পড়ে সেটা ঘুম। তারপর সেটাই স্ট্যাটাস হয়ে যায়। তিন নম্বর হল FOMO। রাত জেগে স্ক্রল, নেটফ্লিক্স, গেম। ঘুমকে এখন টাইম নষ্ট মনে হয়।
ডাক্তাররা কিন্তু রীতিমতো ভয় পাচ্ছেন। কারণ ঘুম মানে শুধু শোয়া নয়। ঘুমের সময় আপনার ব্রেন টক্সিন পরিষ্কার করে, শরীর ক্ষত সারায়, হরমোন ব্যালেন্স করে। কলকাতার স্লিপ স্পেশালিস্ট ডা. সুচেতা বসু বলছেন, “আমরা এখন ২৫-৩৫ বছর বয়সেই হার্টের রোগী, সুগারের রোগী পাচ্ছি। কারণ একটাই — ক্রনিক স্লিপ ডেপ্রাইভেশন। মানুষ ঘুমকে দুর্বলতা ওভাবছে।” একটা রিসার্চ বলছে, টানা ও১ সপ্তাহ ৬ ঘণ্টার কম ঘুমালে আপনার রিঅ্যাকশন টাইম আর ডিসিশন মেকিং ক্ষমতা, মদ খেয়ে গাড়ি চালানোর সমান খারাপ হয়ে যায়।
স্লিপ শেমিং আপনার শরীর ভেঙে দিচ্ছে সবার আগে। ইমিউনিটি কমে যাচ্ছে। ছোটখাটো জ্বর-সর্দি লেগেই থাকছে। ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি ৪০% পর্যন্ত বাড়ছে। ঘুম কমলে Leptin-Ghrelin হরমোন গন্ডগোল করে। ফলে অকারণে খিদে পায়, ওজন বাড়ে।
এরপর ক্ষতি হচ্ছে ব্রেন আর মনের। ফোকাস ধরে রাখতে পারছেন না। কথা ভুলে যাচ্ছেন। ছোট বিষয়ে রেগে যাচ্ছেন। লং টার্মে ডিপ্রেশন আর অ্যাংজাইটির মূল কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে ঘুমের অভাব।
সবচেয়ে বড় আয়রনি হল কাজের ১২টা বাজছে। কম ঘুমিয়ে বেশি কাজ করার চক্করে উল্টোটা হচ্ছে। ভুলের পরিমাণ বাড়ছে। একটা কাজ ২ বার করতে হচ্ছে। স্টাডি বলছে প্রোডাক্টিভিটি ৩০% পর্যন্ত ড্রপ করে।
আর তৈরি হচ্ছে একটা বিষাক্ত কালচার। যে মানুষটা ৭-৮ ঘণ্টা ঘুমিয়ে হেলদি থাকতে চাইছে, সে-ই এখন গিল্টি ফিল করছে। “আমি কি কম খাটছি?” এই প্রশ্নটা তাকে রোজ তাড়া করছে। ফলে সবাই ঘুমের সাথে যুদ্ধ শুরু করেছে।
তাহলে উপায় কী? ঘুমকে কীভাবে ফেরত আনবেন? ডাক্তারদের প্রেসক্রিপশন খুব সোজা। প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য রোজ ৭-৯ ঘণ্টা ঘুম নন-নেগোশিয়েবল। ৩টে টিপস মানুন। রাত ১০টার পর ফোন দূরে রাখুন। ঘর অন্ধকার আর ঠান্ডা রাখুন। রোজ একই সময়ে শুতে যান আর উঠুন। উইকএন্ডে “ঘুম পুষিয়ে নেব” — এই থিওরি কাজ করে না।
সফলতার স্কেল ঘুমের ঘণ্টা দিয়ে মাপা হয় না। যে মানুষটা ৮ ঘণ্টা ঘুমিয়ে, ফ্রেশ মাইন্ডে ৪ ঘণ্টায় যে কাজটা শেষ করছে, সেই আসল প্রোডাক্টিভ। তাই পরের বার কেউ যদি বলে “তুমি অনেক ঘুমাও”, গর্ব করে বলুন — “হ্যাঁ ঘুমাই। কারণ আমি ১০ বছর পরেও সুস্থভাবে কাজ করতে চাই”।
Lifestyle Tips & Articles in Bangla (লাইফস্টাইল নিউজ): Read Lifestyle Tips articles & Watch Videos Online - Asianet Bangla News