
সকালে ঘুম থেকে উঠেই ফোন, স্কুল থেকে ফিরে ইউটিউব, রাতে শুয়ে রিলস – এই হল আজকের প্রজন্মের রুটিন। বড়রাও কম যান না। অফিসের কাজ, হোয়াটসঅ্যাপ চ্যাট – সবই ফোনে। মাথা নিচু করে ৪৫ ডিগ্রি কোণে ফোন দেখার এই অভ্যাসের একটা ভয়ঙ্কর নাম আছে – টেক্সট নেক সিনড্রোম বা টেক নেক। ডাক্তারি ভাষায় একে বলে 'ফরওয়ার্ড হেড পোসচার'।
টেক্সট নেক সিনড্রোমটা আসলে কী?
আমাদের মাথার ওজন প্রায় ৪.৫-৫.৫ কেজি। ঘাড় সোজা থাকলে এই ওজনটা মেরুদণ্ড সহজেই সামলায়। কিন্তু আপনি যখন মাথা ১৫ ডিগ্রি ঝুঁকিয়ে ফোন দেখেন, ঘাড়ের ওপর চাপ পড়ে ১২ কেজির মতো। ৩০ ডিগ্রিতে ১৮কেজি, আর ৬০ডিগ্রিতে চাপটা বেড়ে দাঁড়ায় ২৭ কেজি! মানে একটা ৮ বছরের বাচ্চার ওজন আপনার ঘাড়ে ঝুলছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা এই চাপ সহ্য করতে ঘাড়ের মাসল, লিগামেন্ট, ডিস্ক সব ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এটাই টেক্সট নেক সিনড্রোম।
কীভাবে বুঝবেন আপনার বা আপনার সন্তানের টেক্সট নেক হয়েছে?
লক্ষণগুলো প্রথমে হালকা লাগলেও পরে ভয়ঙ্কর হয়। ১. ঘাড়ের পেছনে, কাঁধে বা পিঠের ওপরের দিকে ক্রমাগত ব্যথা বা স্টিফনেস। ২. মাথা সোজা করতেই কষ্ট, ঘাড় ঘোরাতে গেলে 'কট' করে শব্দ। ৩. ঘন ঘন মাথা ধরা, বিশেষ করে মাথার পেছন দিক থেকে শুরু হওয়া টেনশন হেডেক। ৪. হাত-আঙুলে ঝিঁঝি ধরা বা অসাড় লাগা। এটা হয় কারণ ঘাড়ের নার্ভ চাপা পড়ে। ৫. কাঁধ ঝুঁকে যাওয়া, বুক সামনে না বেরিয়ে পিঠ কুঁজো হয়ে যাওয়া। আয়নায় পাশ থেকে দাঁড়ালে বুঝবেন কানটা কাঁধের থেকে অনেকটা সামনে চলে এসেছে।
বাচ্চাদের ক্ষেত্রে আরও খারাপ। তাদের হাড়-মাসল এখনও তৈরি হচ্ছে। ছোট বয়স থেকেই কুঁজো হয়ে গেলে উচ্চতা কমে যেতে পারে, ফুসফুসের ক্ষমতা কমে, পড়াশোনায় মন বসে না।
টেক্সট নেক সারানোর ওষুধ নেই, আছে অভ্যাস বদল।
প্রথম নিয়ম হল ফোন চোখের লেভেলে তুলুন। ফোন কোলের ওপর রেখে মাথা নামাবেন না। কনুই টেবিলে রেখে ফোনটা মুখের সামনে ধরুন। ল্যাপটপ ব্যবহার করলে ল্যাপটপ স্ট্যান্ড কিনুন। স্ক্রিন যেন চোখ বরাবর থাকে।
দ্বিতীয় নিয়ম ২০-২০-২০ রুল। প্রতি ২০ মিনিট ফোন দেখার পর ২০ সেকেন্ডের জন্য ২০ ফুট দূরের কোনো জিনিসের দিকে তাকান। ঘাড় ডানে-বাঁয়ে ঘোরান। এটা মাসলকে রিল্যাক্স দেয়।
তৃতীয় নিয়ম চিন টাক এক্সারসাইজ। সোজা হয়ে বসুন। এবার থুতনি পেছনের দিকে টেনে ডাবল চিন বানানোর চেষ্টা করুন, মাথা নিচু করবেন না। ৫ সেকেন্ড ধরে রাখুন। দিনে ১০ বার করুন। ঘাড়ের সামনের মাসল স্ট্রং হবে।
চতুর্থ নিয়ম ঘুমের পোসচার। উঁচু বালিশে মাথা দিয়ে কুঁকড়ে শোবেন না। পাতলা বালিশ নিন যাতে ঘাড়-মেরুদণ্ড এক লাইনে থাকে। চিত হয়ে শোয়া বেস্ট।
পঞ্চম নিয়ম স্ক্রিন টাইম কমান। বাচ্চাদের জন্য দিনে ১-২ ঘণ্টার বেশি ফোন নয়। খাওয়ার টেবিল, পড়ার টেবিলে ফোন নিষিদ্ধ করুন। বাচ্চাকে ফোনের বদলে খেলার মাঠ, বই, আঁকা – এই অভ্যাসগুলো দিন।
টেক্সট নেক সিনড্রোম কোনো রোগ নয়, এটা লাইফস্টাইলের অসুখ। আজ ব্যথা না থাকলেও ১০ বছর পর মেরুদণ্ডের ডিস্ক সরে যেতে পারে, অপারেশন পর্যন্ত লাগতে পারে। তাই সন্তানকে বকা না দিয়ে, নিজেও সচেতন হয়ে ফোন ব্যবহারের নিয়ম বদলান।
ঘাড় সোজা রাখুন, মাথা উঁচু রাখুন। কারণ ফোন স্ক্রোল করতে জীবনটা যেন কুঁজো হয়ে না যায়।
Lifestyle Tips & Articles in Bangla (লাইফস্টাইল নিউজ): Read Lifestyle Tips articles & Watch Videos Online - Asianet Bangla News