রান্নায় স্বাদের জন্য আমরা লবণ ব্যবহার করি ঠিকই, কিন্তু বিট নুন আর সাধারণ সাদা লবণের মধ্যে তফাৎ আকাশ-পাতাল। ওজন, হজম, BP থেকে স্কিন — কোনটা কখন খাবেন আর কতটা খাবেন?

ভাতের পাতে লেবু-লঙ্কার সাথে এক চিমটি বিট নুন, নয়তো তরকারিতে সাধারণ আয়োডিন যুক্ত সাদা লবণ। দুটোই লবণ, কিন্তু দুটোর কাজ, গঠন আর উপকারিতা একদম আলাদা। পুষ্টিবিদরা বলছেন, "লবণ মানেই খারাপ" এই ধারণা ভুল। কোন লবণ কখন খাচ্ছেন, সেটাই আসল।

সাধারণ সাদা লবণ আসলে কী?

বাজারে আমরা যে আয়োডিন যুক্ত লবণ খাই সেটা হল সোডিয়াম ক্লোরাইড। সমুদ্রের জল থেকে এনে একে হাই টেম্পারেচারে রিফাইন করা হয়। ফলে সব প্রাকৃতিক খনিজ বাদ গিয়ে শুধু সোডিয়াম আর ক্লোরাইড থাকে। সরকার আয়োডিন মেশায় কারণ আয়োডিনের অভাবে গলগণ্ড, থাইরয়েড আর বাচ্চাদের বুদ্ধির বিকাশে সমস্যা হয়।

এটি সহজলভ্য, দাম কম, প্রতিটি রান্নায় ব্যবহার করা যায়।

অসুবিধা: রিফাইন হওয়ার কারণে এতে পটাশিয়াম, ম্যাগনেশিয়াম, ক্যালসিয়াম থাকে না। বেশি খেলে BP বাড়ে, শরীরে জল জমে, কিডনির উপর চাপ পড়ে।

বিট নুন বা কালা নমক কী? আর হিমালয়ান পিঙ্ক সল্ট?

বিট নুন আসলে এক ধরনের আগ্নেয়গির রক সল্ট। একে কয়লা দিয়ে পুড়িয়ে, তারপর ঠান্ডা করে গুঁড়ো করা হয়। এর মধ্যে থাকে সালফার, আয়রন, পটাশিয়াম, ম্যাগনেশিয়াম। তাই এর রং হালকা গোলাপি-কালচে আর গন্ধটা ডিমের মতো।

আরেকটা জনপ্রিয় লবণ হল হিমালয়ান পিঙ্ক সল্ট। এটাও রক সল্ট, কিন্তু পোড়ানো হয় না। এতে ৮০+ রকমের খনিজ থাকে।

বিট নুনে সোডিয়ামের পরিমাণ সাধারণ লবণের থেকে ৩০% কম। এটা প্রাকৃতিক, তাই রিফাইন করা হয় না। হজমে খুব সাহায্য করে।

তাহলে কোনটা কখন খাবেন জানুন ডায়েটিশিয়ানের ৪টি পরামর্শ:

১. হজমের জন্য: বিট নুন জিতবে। বিট নুনে থাকা সালফার পেটের গ্যাস, অ্যাসিডিটি, বদহজম, কোষ্ঠকাঠিন্য কমায়। তাই চাট, ফল, রায়তা, জিরা জল, লস্যিতে বিট নুন দেওয়ার চল।

২. BP, ওজন আর ওয়াটার রিটেনশন: বিট নুন ভালো সোডিয়াম কম থাকায় BP রোগীরা ডাক্তারের পরামর্শ নিয়ে বিট নুন খেতে পারেন। এটা শরীরে জল কম ধরে রাখে, ফলে ফোলাভাব কমে।

৩. আয়োডিনের ঘাটতি: সাধারণ লবণ মাস্ট। বিট নুন বা পিঙ্ক সল্টে আয়োডিন প্রায় নেই। তাই থাইরয়েড, গর্ভবতী বা বাচ্চাদের রোজকার রান্নায় আয়োডিন যুক্ত সাদা লবণ খেতেই হবে। নাহলে আয়োডিনের ঘাটতি হবে।

৪.স্কিন আর ডিটক্স: পিঙ্ক সল্ট। পিঙ্ক সল্টে থাকা খনিজ স্কিনের pH ব্যালেন্স করে আর ডিটক্স ওয়াটারে ব্যবহার করা হয়।

ভুল ধারণা আর সতর্কতা:

অনেকে ভাবেন "প্রাকৃতিক মানেই যত খুশি খাওয়া যায়"। এটা ভুল। বিট নুন বেশি খেলে পেট খারাপ, ডায়েরিয়া হতে পারে কারণ এটা ল্যাক্সেটিভের মতো কাজ করে। আবার যাদের কিডনির সমস্যা আছে, তাদের সব ধরনের লবণই ডাক্তারের পরামর্শ নিয়ে খেতে হবে।

দিনে কতটা খাবেন?

WHO বলছে একজন সুস্থ মানুষ দিনে ৫ গ্রামের বেশি লবণ খাবেন না। সেটা মানে ১ চা চামচ। আপনি বিট নুন খান বা সাদা লবণ। প্যাকেটের খাবার, চিপস, আচারেও লুকিয়ে লবণ থাকে, সেটাও হিসেবের মধ্যে ধরতে হবে।

ডায়েটিশিয়ানদের মতে, "সবচেয়ে ভালো হল দুটোকে ব্যালেন্স করা"। রোজকার রান্নার ৭০% আয়োডিন যুক্ত সাধারণ লবণ আর ৩০% বিট নুন বা পিঙ্ক সল্ট। ফল, স্যালাড, চাটের জন্য বিট নুন। এভাবে আয়োডিনও পাবেন আবার হজমের উপকারও পাবেন।

একতরফা কোনো লবণকেই "খারাপ" বলা যাবে না। দরকারটা বুঝে, পরিমাণ মেনে খান, শরীরও ভালো থাকবে।