
শনিবার মহাসপ্তমীর দিন কলকাতার চোরবাগান সার্বজননীনের পুজো মণ্ডপে নেমে আসে মহাবিপর্যয়। পদপিষ্ট হয়ে মৃত্যু হয় ১৯ জনের। আহতের সংখ্যা বহু। বাঙালির শ্রেষ্ঠ শারদ উৎসব যখন মধ্যগণনে তখনই নেমে আসে বিষাদের সুর। কিন্তু কেন এই বিষাদ বা মহাবিপর্যয়? তা নিয়ে শুরু হয়েছে কাটাছেঁড়া। এর আগেও কলকাতা পুজো জনজোয়ার দেখেছে। ইদ আর দুর্গাপুজোর উৎসব একই সঙ্গে পালন করেছে। কিন্তু এতো বড় দুর্ঘটনা কলকাতায় এর আগে কখনও হয়নি। আর সেই কারণেই শুরু হয়েছে নানান জল্পনা। চোরবাগানে পদপিষ্ট হয়ে ১৯ জনের মৃত্যুর সম্ভাব্য ১০টি কারণ এক নজরে দেখুন ছবিতে।
শনিবার রাতে মহাসপ্তমীর ব্যস্ত সময়। যখন মণ্ডপমুখী জনতা তখনই হঠাৎ তীব্র বৃষ্টি শুরু হয়। ছাতা বা রেইনকোট না থাকা দর্শনার্থীরা ভিজে যাওয়ার হাত থেকে বাঁচতে দিকবিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে পড়েন। যার কারণে ভিড় বাড়তে শুরু করে পুজো মণ্ডপে।
বৃষ্টি নামার সঙ্গে সঙ্গে মণ্ডপের বাইরে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা বা রাস্তায় থাকা শত শত দর্শনার্থী একসাথে হুড়মুড় করে মণ্ডপের ভেতরে ঢুকে পড়ার চেষ্টা করেন। চোরবাগান পুজো মণ্ডপটিও তৈরি হয়েছে রীতিমত অপরিসর এলাকা। যার কারণে ভিড়ের চাপ ক্রমশই বাড়তে পারে পুজো মণ্ডপে।
মুক্তারাম বাবু স্ট্রিটের চোরবাগানে ঢোকার রাস্তা এবং মণ্ডপের এক্সিট গেট দুটিই ছিল অত্যন্ত সরু বা সংকীর্ণ। তীব্র চাপের তুলনায় সেই পথ পর্যাপ্ত ছিল না। এক্সটি গেট এমন এলাকায় ছিল যেখান থেকে বের হওয়া ছিল রীতিমত কষ্টসাধ্য। অনেকের আবার দাবি এমার্জেন্সি এক্সটি গেট বন্ধ করে দিয়েছিল উদ্যোক্তারা।
অতিরিক্ত মানুষের ঠেলাঠেলি ও তীব্র চাপের মুখে মণ্ডপের এক্সিট গেটের কাঠামোর একটি অংশ আচমকাই ভেঙে পড়ে। এতে মানুষের মধ্যে তীব্র আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। তাতে হুড়োমুড়ি আরও বেড়ে যায়।
দুর্ঘটনার ঠিক আগে পুজো কমিটির পক্ষ থেকে মাইকে কোনও বিভ্রান্তিকর ঘোষণা বা ভুল অ্যালার্ট (যেমন ভিড় সরাতে বা খালি করতে বলা) এবং বাঁশির শব্দ করা হয়েছিল। এতে মানুষ ভাবেন বড় কোনও বিপদ ঘটেছে, ফলে মণ্ডপের মধ্যে বৃষ্টি থেকে বাঁচতে আশ্রয় নেওয়া দর্শনার্থীদের মধ্যে হুড়োহুড়ি চরমে পৌঁছায়।
চোরবাগানের পুজো মণ্ডপ এবার এমনিতিও আলোআধারির মধ্যে ছিল। আলোর পরিমাণ ছিল তুলনায় অনেকটাই কম। তারপর দুর্ঘটনার সময় মণ্ডপের আলো আচমকা কমে যায় বা আলো থেকে অন্ধকার জায়গায় প্রবেশ করার কারণে দর্শনার্থীদের দৃশ্যমানতা মারাত্মকভাবে কমে গিয়েছিল। তাতে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। দর্শনার্থীদের মধ্যে হুড়োহুড়ি শুরু হয়ে গিয়েছিল বলেও অনেকে দাবি করেছেন।
বৃষ্টির কারণে মণ্ডপ ও তার সংলগ্ন অঞ্চলের মাটি নরম, কাদাটে ও পিছল হয়ে গিয়েছিল। ফলে ধাক্কাধাক্কির মধ্যে মাটিতে পা হড়কে অনেকেই পড়ে যান এবং সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারেননি। তাতেও পদপিষ্ট হওয়ার মত ঘটনা ঘটেছে বলে অনেক প্রত্যক্ষদর্শী দাবি করেছেন।
মণ্ডপে বিপুল পরিমাণ দর্শনার্থী সমাগম হলেও পুজো কমিটির পক্ষ থেকে কোনো সুনির্দিষ্ট 'ক্রাউড ম্যানেজমেন্ট' বা ভিড় নিয়ন্ত্রণের দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা ছিল না বলে অভিযোগ উঠেছে। পুলিশের উপস্থিতি ছিল না বলে অনেক দর্শনার্থী অভিযোগ করেছেন। এবার পুজোয় চোরবাগান একাধিক শারদ সম্মান পেয়েছিল। তাই উৎসবমুখী জনতার ভিড় বাড়ছিল। কিন্তু ভিড় সামলানোর উপযুক্ত ব্যবস্থা ছিল না বলেও অভিযোগ।
প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, বৃষ্টি শুরু হওয়ার পর পরিস্থিতি যখন জটিল রূপ নিচ্ছিল, তখন মণ্ডপের স্পর্শকাতর পয়েন্টগুলোতে দর্শনার্থীদের গাইড করার জন্য পুজো কমিটির কোনো ভলেন্টিয়ার উপস্থিত ছিলেন না।
প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, বিপর্যয় মোকাবিলার জন্য প্রয়োজনীয় জরুরি নির্গমন পথ (Emergency Exit Gate) মণ্ডপে কার্যকর ছিল না বা সেটি আটকে রাখা হয়েছিল, যার ফলে বিপদের সময় মানুষ বিকল্প পথ পাননি।
মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী হাসপাতাল ও ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে নিম্নলিখিত বড়সড় সহায়তার প্যাকেজ ঘোষণা করেছেন:
চিকিৎসার সম্পূর্ণ খরচ: বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন সমস্ত আহতের চিকিৎসার যাবতীয় খরচ রাজ্য সরকার সম্পূর্ণ বহন করবে।
প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিল থেকে নিহতদের পরিবারকে ২ লক্ষ টাকা ও আতহদের ৫০ হাজার টাকা করে দেওয়ার কথা ঘোষণা করা হয়েছে।