
জন্মলগ্ন থেকেই তিনি ছিলেন তৃণমূল কংগ্রেসের সক্রিয় সদস্য। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অনুগত সৈনিক। কিন্তু নন্দীগ্রাম আন্দোলনের অন্যতম মুখ। কিন্তু তারপরে তিনি দল বদল করে এখন বিজেপি নেতা তথা রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী। বর্তমানে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সবথেকে বড় সমালোচক। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে ভোটে দু-দুবার হারানোর রেকর্ডও তাঁর ঝুলিতে।
সালটা ২০২০। বছরের শেষে ডিসেম্বর মাসে তৃণমূল কংগ্রেস ছেড়ে বিজেপিতে যোগ দিয়েছিলেন তিনি। তারপরের বছরই ছিল বিধানসভা নির্বাচন। তৃণমূল ছাড়ার আগেও তিনি ছিলেন রাজ্যের পরিবহন ও সেচ ও জলসম্পদ দফতরের মন্ত্রী। মন্ত্রিত্ব থেকে পদত্যাগ করেন ৭ নভেম্বর। তারপর ডিসেম্বরেই তাঁর দলত্যাগ। মদন মিত্র গ্রেফতারের পরে শভেন্দু অবশ্য পরিবহন দফতরের দায়িত্বও সামলে ছিলেন।
তিনি ২০২০ সালের ১৬ ডিসেম্বর তৃণমূল কংগ্রেসের প্রাথমিক সদস্যপদ এবং দল ও তার সহযোগী সংগঠনের সমস্ত পদ থেকে পদত্যাগপত্র পাঠান। এর আগে তিনি হুগলি নদী জলপথ সেতু কমিশনের (HRBC) চেয়ারম্যান পদসহ অন্যান্য সরকারি দায়িত্ব থেকেও ইস্তফা দিয়েছিলেন।
দলে তাঁর নির্দিষ্ট কোনো সর্বভারতীয় শীর্ষ পদ না থাকলেও, তিনি দলের বিধায়ক, নন্দীগ্রামের শক্তিশালী মুখ এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ জেলার দলীয় পর্যবেক্ষক হিসেবে ব্যাপক সাংগঠনিক ক্ষমতার অধিকারী ছিলেন। একটা সময় যুব তৃণমূলের দায়িত্বও তিনি পালন করেছেন। এই সব ছেড়েই তাঁর গেরুয়া শিবিরে যাত্রা।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে বিবাদের জেরেই শুভেন্দু দলত্যাগ করেছিলেন। তিনি দল ছেড়ে মমতা-অভিষেক জুটিকে আক্রমণ করেছেন। তাতেই স্পষ্ট তাঁর দল ছাড়ার কারণ। বিরোধী দলনেতা থাকাকালীন মমতা বন্দ্যোপাধ্য়ায়ের একাধিক নীতির সমালোচনা করেন তিনি। পাশাপাশি মমতা-অভিষেকের বিরুদ্ধে দুর্নীতি নিয়েও সরব হয়েছিলেন। কিন্তু এবার পুরনো সহকর্মীদের কাছেই তাঁর তৃণমূল ছাড়ার কারণ আরও স্পষ্ট করেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী।
শুক্রবার দুপুরে নবান্নে বিরোধী দলনেতা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে মোট ১৩ জন বিধায়কের সঙ্গে প্রায় দেড় ঘণ্টা ধরে বৈঠক করেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন ফিরহাদ হাকিম, অরূপ রায়ের মতো পুরনো পরিচিত মুখরাও। এঁরা বর্তমানে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধ গোষ্ঠী। এঁরা নিজেদের আসল তৃণমূল বলেও দাবি করেন। যাইহোক, মূল আলোচ্য বিষয় ছিল এসআইআরের ট্রাইব্যুনাল সংক্রান্ত জরুরি বিষয়াদি, তবে বৈঠকের শেষে আলোচনা মোড় নেয় একেবারে অন্যদিকে।
বৈঠক শেষে ফিরহাদ হাকিমদের মতো একদা তৃণমূলের সহকর্মীদের সামনে পেয়ে কার্যত নস্টালজিক হয়ে পড়েন শুভেন্দু। প্রয়াত সুব্রত মুখোপাধ্যায়ের স্মৃতিচারণা করে তিনি বলেন, মন্ত্রিসভার বৈঠকে কত বিষয়ে আলোচনা হত, তা ববিদারাই ভালো জানেন।
তৃণমূল ছাড়ার আসল কারণ হিসেবে শুভেন্দু তুলে ধরেন ২০১১ সালের ২১ জুলাইয়ের একটি ঘটনা। তাঁর দাবি, মঞ্চে বক্তব্য রাখার সময় হঠাৎ তাঁর হাত থেকে মাইক কেড়ে নিয়ে অন্য একজনকে দেওয়া হয়েছিল, আর সেদিনই তিনি বুঝে গিয়েছিলেন তৃণমূলে থাকা আর সম্ভব নয়। দলে ‘ভাইপো রাজ’ শুরু হওয়ার প্রসঙ্গও তোলেন তিনি।
বৈঠকের পর বিধানসভায় বিরোধী দলনেতার ঘরে গিয়ে ফিরহাদ হাকিম মন্তব্য করেন, জ্যোতি বসু, বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য ও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পর তিনি এমন আন্তরিক মুখ্যমন্ত্রী দেখেননি, বরং প্রয়াত বিধান রায়ের সঙ্গেই তাঁর তুলনা করা যায়।
বৈঠকে আগত বিধায়কদের জন্য নবান্নে জমকালো আপ্যায়নের ব্যবস্থা করা হয়েছিল বলে সূত্রের খবর। মেনুতে ছিল ফিশরোল, চিকেন স্প্রিং রোল, কালাকাঁদ, মিষ্টিসুখ, কুকিজের পাশাপাশি চা ও ব্ল্যাক কফিও।