হিন্দু ধর্ম মতে, মৃত্যুর পর আত্মার এক রহস্যময় যাত্রা শুরু হয়, যার বিস্তারিত বর্ণনা গরুড় পুরাণে রয়েছে। এই পুরাণ অনুযায়ী, যমদূতরা আত্মাকে যমলোকে নিয়ে যায় এবং ১০ দিনের পিণ্ডদানের মাধ্যমে তার যাতনা দেহ গঠিত হয়।
মানুষের মনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, মৃত্যুর পর কী হয়? বিজ্ঞান এর উত্তর দিতে পারে না। কিন্তু হিন্দু ধর্মে গরুড় পুরাণ এই রহস্যের পর্দা খুলে দিয়েছে। এই পুরাণের প্রেতকল্প অংশে মৃত্যু থেকে শ্রাদ্ধ পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়াটা বলা আছে।

১. মৃত্যুর মুহূর্ত: গরুড় পুরাণ বলছে,6 মানুষের মৃত্যুর ঠিক আগে যমরাজের দুজন দূত, যমদূত, উপস্থিত হয়। পুণ্যবান ব্যক্তির জন্য দূতরা সৌম্য চেহার হয়। আর পাপীর জন্য তারা ভয়ঙ্কর, কালো, লাল চোখ, বড় বড় দাঁত নিয়ে আসে। এরা আত্মাকে দেহের বন্ধন থেকে টেনে বার করে। এই সময় আত্মার আকার হয় বুড়ো আঙুলের সমান, যাকে বলা হয় ‘অঙ্গুষ্ঠমাত্র পুরুষ’। দেহ ছাড়ার সময় অসহ্য যন্ত্রণা হয়, ঠিক যেমন ১০০টা কাঁকড়া বিছে একসাথে কামড়ালে হয়।
২. যাত্রা শুরু ও প্রথম দিন: দেহ থেকে বের করেই যমদূতরা আত্মাকে পাশবদ্ধ করে যমলোকের দিকে টানতে টানতে নিয়ে যায়। এই পথ ৮৬ হাজার যোজন, মানে প্রায় ১১ লক্ষ কিলোমিটার। এই পথে আত্মাকে হাঁটতে হয় না, তাকে হাওয়ায় ভাসিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। প্রথম দিনেই আত্মা তার বাড়ির চারপাশে ঘোরে। সে তার পরিবারকে দেখতে পায়, কথা বলতে চায়, কিন্তু কেউ শুনতে পায় না। এই কারণেই মৃত্যুর পর বাড়িতে উঁচু স্বরে কান্নাকাটি করতে বারণ করা হয়, তাতে আত্মার কষ্ট বাড়ে।
৩. ১০ দিনের পিণ্ডদান ও দেহ গঠন: মৃত্যুর পর ১০ দিন ধরে যে পিণ্ডদান করা হয়, গরুড় পুরাণ মতে তার একটা বিশেষ কারণ আছে। যমদূতরা যে অঙ্গুষ্ঠমাত্র আত্মাকে নিয়ে যাচ্ছে, তার কোনো হাত-পা নেই। এই ১০ দিনের পিণ্ড দিয়েই তার যাতনা দেহ তৈরি হয়। প্রথম দিনের পিণ্ডে মাথা, দ্বিতীয় দিনে চোখ-কান-নাক, এভাবে দশম দিনে পুরো দেহ তৈরি হয়। এই দেহটাকেই ‘প্রেতদেহ’ বলে। যদি ১০ দিন পিণ্ড না দেওয়া হয়, তাহলে আত্মা ওই অঙ্গুষ্ঠ মাত্র অবস্থাতেই হাওয়ায় ভাসে আর অসহ্য ক্ষুধা-তৃষ্ণায় কষ্ট পায়।
৪. বৈতরণী নদী পার: যাত্রাপথের মাঝে পড়ে ভয়ঙ্কর বৈতরণী নদী। এই নদী রক্ত, পুঁজ, হাড়গোড় দিয়ে ভরা। পুণ্যবানরা সহজে নৌকায় পার হয়ে যায়। কিন্তু পাপীদের এই নদী সাঁতরে পার হতে হয়। শাস্ত্র মতে, জীবদ্দশায় যে গো-দান করে, মৃত্যুর পর তার হাতে একটা গরুর লেজ ধরিয়ে দেওয়া হয়। সেই গরুই তাকে বৈতরণী পার করিয়ে দেয়। তাই এখনও শ্রাদ্ধে ‘বৈতরণী পার’ করার জন্য গো-দান করানো হয়।
৫. ১৩ দিনে যমপুরীর দরজা: ১০ দিনে দেহ গঠন হয়ে গেলে, ১১তম ও ১২তম দিনে আত্মা যমপুরীর কাছে পৌঁছয়। ১৩তম দিনে যমরাজের সভায় তার বিচার শুরু হয়। চিত্রগুপ্ত তার পাপ-পুণ্যের খাতা খোলেন। এই কারণেই হিন্দু ধর্মে ১৩ দিন অশৌচ পালন করে ১৩তম দিনে শ্রাদ্ধশান্তি করা হয়। বিশ্বাস করা হয়, এই শ্রাদ্ধের ফলেই আত্মা ‘প্রেতযোনি’ থেকে মুক্তি পেয়ে ‘পিতৃযোনি’ লাভ করে এবং পিতৃলোকে গিয়ে বাস করে।
৬. ৪৭ দিনে বিচার শেষ: যদিও ১৩ দিনে বিচার শুরু হয়, পুরো প্রক্রিয়া শেষ হতে সময় লাগে ৪৭ দিন। এক বছরের মধ্যে, মানে সপিণ্ডকরণ পর্যন্ত, আত্মা প্রেতলোকেই থাকে। এক বছর পর যখন সপিণ্ডকরণ শ্রাদ্ধ হয়, তখন সে পুরোপুরি পিতৃলোকে স্থান পায় এবং পরবর্তী জন্মের জন্য অপেক্ষা করে।
গরুড় পুরাণ এটাও বলছে, যে ব্যক্তি সৎকর্ম করে, গয়ায় পিণ্ডদান করে, গীতা পাঠ শোনে, তার আত্মাকে যমদূতরা কষ্ট দেয় না। বিষ্ণুদূতরা এসে তাকে বিমানে করে বিষ্ণুলোকে নিয়ে যায়।


