আধুনিক যুগে কোষ্ঠী মেলানোর বদলে শিক্ষিত দম্পতিরা প্রি-ম্যারিটাল কাউন্সেলিং বেছে নিচ্ছেন। এই থেরাপি টাকা-পয়সা, কেরিয়ার, শ্বশুরবাড়ির মতো বাস্তব সমস্যা নিয়ে বিয়ের আগেই খোলামেলা আলোচনার সুযোগ করে দেয়।
“কুষ্ঠি তো ৩৬-এ ৩২ মিলেছিল, তাও ডিভোর্স কেন হল?” - এই প্রশ্ন এখন অনেক পরিবারেই শোনা যাচ্ছে। ভারতে ডিভোর্সের হার গত ১০ বছরে তিন গুণ বেড়েছে। ন্যাশনাল ফ্যামিলি হেলথ সার্ভের ডেটা বলছে, শহরাঞ্চলে প্রতি ১০০টা বিয়ের মধ্যে ১৩টা ভেঙে যাচ্ছে, আর বেশিরভাগই বিয়ের প্রথম ৫ বছরের মধ্যে। সম্পর্ক ভাঙার এই সুনামির মুখে দাঁড়িয়ে নতুন প্রজন্ম বেছে নিচ্ছে এক অন্য রাস্তা। জ্যোতিষী বা পুরোহিতের কাছে নয়, তারা যাচ্ছে সাইকোলজিস্ট আর রিলেশনশিপ কাউন্সেলরের কাছে। নাম ‘প্রি-ম্যারিটাল থেরাপি’। দিল্লি, মুম্বাই, ব্যাঙ্গালোর, কলকাতার মেট্রো শহরে গত ২ বছরে এই থেরাপির ডিমান্ড বেড়েছে প্রায় ৪০০%।

কিন্তু কেন? মনোবিদরা বলছেন, কারণটা বদলে যাওয়া সমাজ আর সম্পর্কে। আগের দিনে বিয়ে মানে ছিল দুটো পরিবারের বোঝাপড়া, মেয়েরা মানিয়ে নিত, ছেলেরা রোজগার করত। ভূমিকা ভাগ করা ছিল। এখন ছেলে-মেয়ে দুজনেই কেরিয়ারিস্ট, দুজনেই স্বাধীন, দুজনেরই নিজস্ব মতামত আছে। বিয়ের পর কে রান্না করবে, বাচ্চা হলে কে কেরিয়ার ব্রেক নেবে, শনিবার শ্বশুরবাড়ি যাবে না বাপের বাড়ি, মাসের শেষে কার স্যালারি থেকে EMI যাবে, শাশুড়ির সাথে থাকবে না আলাদা - এই প্রশ্নগুলোর উত্তর কোষ্ঠীতে লেখা থাকে না। প্রেম করে বিয়ে করলেও এই বাস্তব সমস্যাগুলো নিয়ে খোলাখুলি কথা হয় না। লজ্জা লাগে, যদি সম্পর্ক ভেঙে যায়! ফলে বিয়ের পর প্রথম ঝগড়াটাই হয় এই সব ‘না বলা কথা’ নিয়ে। কাউন্সেলিং সেই না বলা কথাগুলো বিয়ের আগেই টেবিলে নিয়ে আসে।
প্রি-ম্যারিটাল থেরাপিতে ঠিক কী হয়? এটা কোনো বিচারসভা নয়। একজন লাইসেন্সড কাউন্সেলর বা সাইকোলজিস্ট ৪ থেকে ৮টা সেশনে কাপলের সাথে বসেন। প্রথমেই দুজনকে আলাদা করে কিছু সাইকোমেট্রিক টেস্ট দেওয়া হয়। এতে দুজনের পার্সোনালিটি, অ্যাটাচমেন্ট স্টাইল, রাগ কন্ট্রোল, টাকা নিয়ে মানসিকতা, ফ্যামিলি ভ্যালুজ উঠে আসে। তারপর একসাথে বসে কাউন্সেলর কঠিন টপিকগুলো তোলেন। যেমন, ফিনান্সিয়াল প্ল্যানিং: জয়েন্ট অ্যাকাউন্ট হবে না আলাদা, কে কত কন্ট্রিবিউট করবে, ইনভেস্টমেন্ট কী হবে। কেরিয়ার: একজনের বদলি হলে অন্যজন চাকরি ছাড়বে কিনা। শ্বশুরবাড়ি: সীমানা বা বাউন্ডারি কী হবে, কতটা নাক গলানো মেনে নেবে। সেক্স ও ইন্টিমেসি: দুজনের চাহিদা, পছন্দ-অপছন্দ। বাচ্চা: কবে নেবে, না নিলে কী হবে। ঘরের কাজ: কে বাজার করবে, কে বাসন মাজবে। এই আলোচনাগুলো থার্ড পার্সনের সামনে হওয়ায় ঝগড়া হয় না, বরং হেলদি ডিবেট হয়। কাউন্সেলর শিখিয়ে দেন ‘ফেয়ার ফাইট রুলস’ - অর্থাৎ ঝগড়া হলে কীভাবে কথা বলতে হবে, পুরনো কথা না টানা, পার্সোনাল অ্যাটাক না করা, টাইম-আউট নেওয়া।
এর উপকার কী? প্রথমত, ‘এক্সপেকটেশন বনাম রিয়ালিটি’র গ্যাপটা কমে যায়। বিয়েটা যে শুধু হানিমুন আর ইনস্টা রিল নয়, সেটা দুজনেই বুঝে যায়। দ্বিতীয়ত, কমিউনিকেশন স্কিল তৈরি হয়। বেশিরভাগ সম্পর্ক ভাঙে কথা কাটাকাটি থেকে, কথা বলা থেকে নয়। তৃতীয়ত, ‘ডিল ব্রেকার’ আগে থেকেই ধরা পড়ে যায়। যেমন, একজন হয়তো কোনোদিন বাচ্চা চায় না, অন্যজন চায়। এটা বিয়ের ২ বছর পর জানার চেয়ে আগে জানা ভালো। অনেক সময় কাউন্সেলিংয়ের পর কাপল বুঝতে পারে তারা একে অপরের জন্য ঠিক নয়, এবং সম্মানের সাথে সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে আসে। এটা ব্যর্থতা নয়, বরং একটা খারাপ বিয়ে আর ডিভোর্সের যন্ত্রণা থেকে বাঁচা।
তবে কি জ্যোতিষ খারাপ? মনোবিদরা বলছেন, বিষয়টা ভালো-খারাপের নয়। বিশ্বাস যার যার ব্যক্তিগত। কোষ্ঠী মিলিয়ে মনের জোর বাড়লে মেলান, আপত্তি নেই। কিন্তু কোষ্ঠী আপনার পার্টনারের রাগ, টাকার অভ্যাস বা সেক্সুয়াল কম্প্যাটিবিলিটি বলতে পারবে না। থেরাপি সেটা পারে। এটা অনেকটা যেমন, বাইক কেনার আগে ইঞ্জিন চেক করা আর শুধু রঙ পছন্দ করা - দুটোই দরকার, কিন্তু ইঞ্জিন না দেখে শুধু রঙ দেখে কিনলে পরে ভুগতে হয়।
খরচ কত? কলকাতায় প্রতি সেশন ১৫০০ থেকে ৪০০০ টাকা। ৬টা সেশনের প্যাকেজ নিলে ১০-২০ হাজার টাকা খরচ হয়। বিয়ের বাজেটের কাছে এটা কিছুই না, কিন্তু ডিভোর্সের মানসিক, সামাজিক ও আর্থিক খরচের কাছে এটা বিন্দু। অনেক কর্পোরেট কোম্পানি এখন এমপ্লয়ি ওয়েলনেস প্রোগ্রামে প্রি-ম্যারিটাল কাউন্সেলিং কভারও করছে।
আসলে বিয়ে এখন আর শুধু সামাজিক চুক্তি নয়, এটা দুটো মানুষের ইমোশনাল পার্টনারশিপ। আর যেকোনো পার্টনারশিপে নামার আগে তার টার্মস অ্যান্ড কন্ডিশন জেনে নেওয়া, রিস্ক অ্যানালিসিস করা বুদ্ধিমানের কাজ। জ্যোতিষ ভবিষ্যৎ বলতে পারে কিনা তর্ক আছে, কিন্তু কাউন্সেলিং বর্তমানকে মজবুত করে ভবিষ্যৎ গড়তে সাহায্য করে, এটা প্রমাণিত। তাই নতুন প্রজন্ম রাশি নয়, সম্পর্কে ইনভেস্ট করছে।

