আগামী সপ্তাহেই বাংলাদেশ সফরে যাওয়ার কথা ছিল ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী-র। কিন্তু গত সোমবার, ভারতের বিদেশ মন্ত্রক ঘোষণা করে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এই বাংলাদেশ সফরের পরিকল্পনা আপাতত স্থগিত করা হয়েছে। কারণ তার ঠিক আগের দিনই বাংলাদেশ সরকার জানিয়েছিল কোভিড -১৯'এর হুমকির কারণে ১৭ মার্চ শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উদযাপনের উদ্বোধন অনুষ্ঠান স্থগিত করা হয়েছে। এই অনুষ্ঠানেই যোগ দিতে বাংলাদেশ যাওয়ার কথা ছিল মোদীর। তবে বাংলাদেশে জোর গুঞ্জন সরকারের অস্বস্তি এড়াতেই এই অনুষ্ঠান বাতিল করা হয়েছে।

বাংলাদেশে এখনও অবধি তিনজন করোনাভাইরাস আক্রান্তের সন্ধান পাওয়া গিয়েছে। এমনটা নয় করোনোভাইরাস মহামারীতে বাংলাদেশ-এর অবস্থা ইরান বা ইতালির মতো। বিশ্বের অন্যান্য অনেক দেশের অবস্থা তাদের থেকে অনেক খারাপ। তারাও এখনও পর্যন্ত বড় কোনও জমায়েত বাতিল করেনি। বাংলাদাশেও এই প্রাদুর্ভাবের কারণে এখনও পর্যন্ত আর কোনও বড় সমাবেশ বাতিল করা হয়নি। শুধু বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা শেখ মুজিব-এর জন্মশতবার্ষিকি উদ্বোধন অনুষ্ঠানের উপরই কোপ পড়েছে।

বাংলাদেশ জুড়ে জোর জল্পনা এই অনুষ্ঠান স্থগিতের কারণ করোনাভাইরাস নয়, স্বয়ং ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদীর উপস্থিতি। গত শুক্রবারই বাংলাদেশের বেশ কয়েকটি শহর জুড়ে নরেন্দ্র মোদীর বিরুদ্ধে বিক্ষোভ প্রদর্শন হয়েছে। শেখ মুজিব-এর মতো ব্যক্তিত্বের জন্মশতবার্ষিকি অনুষ্ঠানে কীভাবে নরেন্দ্র মোদি-কে আমন্ত্রণ জানিয়েছে হাসিনা সরকার, সেই নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। এই আমন্ত্রণ বাতিল করার আহ্বান জানায় বিক্ষুব্ধ জনতা। এমনকী অনুষ্ঠানের দিন মোদীকে শহরে ঢুকতে বাধা দিতে বিক্ষোভকারীরা ঢাকা বিমানবন্দর ঘেরাও করার পরিকল্পনা-ও করেছিলেন।

এই অবস্থায় নরেন্দ্র মোদীকে এনে শেখ মুজিবুর রহমান-এর জন্মশতবার্ষিকি অনুষ্ঠান করা হলে অত্যন্ত অস্বস্তিকর অবস্থায় পড়তে হত শেখ হাসিনা-কে। একদিকে দেশের মানুষের ক্ষোভ। অন্যদিকে দিল্লির বিরুদ্ধে সরাসরি সংঘাতেও যেতে পারবে না ঢাকা। কারণ সুরক্ষার জন্য এখনও ভারতের বন্ধুত্ব দরকার এই প্রতিবেশি দেশটির। ফলে করোনা-হুমকির অছিলায় এই অনুষ্ঠান স্থগিত হওয়াতে বাংলাদেশ সরকার এই অস্বস্থতিকর পরিস্থিতি থেকে হাঁফ ছেড়ে বেঁচেছে বলে মনে করছেন বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ।
 
বাংলাদেশিরা বলথেন, দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। ভারতীয় সেনাবাহিনীই ১৯৭১ সালে মুক্তিযোদ্ধাদের পাশাপাশি পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে বাংলাদেশ-কে স্বাধীন করার জন্য লড়াই করেছিল। তারপর থেকে ক্রমেই দিল্লি-ঢাকা আরও কাছাকাছি এসেছে। কিন্তু, সম্পর্কের সেই ছন্দটা কেটেছে ভারতে বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর থেকে।

ভারতে, বিজেপি-র রাজনৈতিক কর্মসূচির মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ হল দেশ থেকে অনিবন্ধিত বাংলাদেশী উদ্বাস্তুদের নির্বাসন দেওয়া। স্পষ্ট কোনও তথ্য না থাকলেও বিজেপির দাবি বিপুল সংখ্যক বাংলাদেশী অবৈভাবে ভারতে প্রবেশ করেছে। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ এমনকি এই বাংলাদেশী উদ্বাস্তুদের 'উইপোকা' বলেও উল্লেখ করেছেন। 'উইপোকা'দের দেশ ছাড়া করতে বিজেপি বারবার দেশব্যপী এনআরসি চালুর আওয়াজ তুলেছে। দুই দেশের সম্পর্কের উত্তেজনা আরও বেড়েছে গত ডিসেম্বরে ভারতের নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন বা সিএএ পাস হওয়ার পর।

পাকিস্তানের মতো সুর না চড়ালেও হাল্কা করে দিল্লির কাছে নিজেদের অসন্তোষ প্রকাশ করেছে ঢাকা। ২০১৯ সালের জুলাই মাসে প্রথমবার বাংলাদেশ প্রকাশ্যে ভারতের এনআরসি প্রক্রিয়া নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিল। আর সিএএ পাস হওয়ার পর এই নিয়ে বিরুদ্ধ প্রতিক্রিয়া দেওয়ারস পাশাপাশি মাঝপথে সফর বাতিল করে ফিরে যান বাংলাদেশি বিদেশ মন্ত্রী। সেই সঙ্গে বাংলাদেশের পক্ষে বলা হয়েছিল, ভারত যাদের অবৈধ উদ্বাস্তু বলে দেগে দিচ্ছে, তারা সত্য়ি সত্যি বাংলাদেশি বলে প্রমাণ করতে পারলে, তাদের বাংলাদেশে ফিরিয়ে নেওয়া হবে।

এই অবস্থায় বাংলাদেশে গিয়ে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীকে বিক্ষোভের মুখে পড়তে হলে তা বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে যথেষ্ট সমস্যার হতে পারত। তাই করোনাভাইরাস আসলে বাংলাদেশ সরকারের মুখ রক্ষা করল বলে মনে করা হচ্ছে।