রবিবার (১৫ নভেম্বর), বাংলা সংস্কৃতি জগত হারিয়েছে তার অন্যতম গর্ব সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়কে। নক্ষত্র পতনের শোকে ছেয়েছে সিনেমা, থিয়েটার, সাহিত্য মহল। সৌমিত্র চট্টোপাধ্য়ায় অবশ্য বেঁচে থাকবেন তাঁর শিল্পের মধ্য দিয়ে। তাঁর তৈরি করা একান্ত নিজস্ব উত্তরাধিকারের মধ্য দিয়ে। যা বলে, ভাষা এবং সংস্কৃতি সম্পর্কে আগ্রহ এবং কৌতূহল একজন অভিনেতাকে সমৃদ্ধ করে।

সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের কাব্য চর্চা নিয়ে নতুন করে বলার কিছু নেই। রবীন্দ্রনাথ ছিলেন তাঁর প্রিয় কবি, তাঁর অনুপ্রেরণা। আর নিজেও কাব্য চর্চা চালিয়ে গিয়েছেন সমান তালে। বন্ধু শক্তি-সুনীলদের পাশাপাশি নিজস্ব কাব্য প্রতিভা ও শৈলিতে কবি হিসাবে জায়গা করে নিয়েছিলেন তিনি। এক্ষণ-এর মতো সমৃদ্ধ পত্রিকাও সম্পাদনা করেছেন দুই দশকের উপর। সত্যজিৎ রায়ের বাড়িতে পরিচালক ও অভিনেতার সাহিত্য চর্চার কথাও জানিয়েছেন সন্দীপ রায়। তবে শুধু সাহিত্য নয়, বাংলা সংস্কৃতির সর্বস্তরেই ছিল তাঁর কৌতূহল। সাহিত্যের পাশাপাশি, চিত্রশিল্প, ভাস্কর্য, নৃত্য, সঙ্গীত - সব রকমের শিল্প নিয়েই ছিলেন সমান আগ্রহী। আর এই ভাষা-সংস্কৃতি নিয়ে আগ্রহ ও কৌতূহলই তাঁকে অভিনেতা হিসাবে আরও ঋদ্ধ করেছিল বলে জানিয়েছিলেন সৌমিত্র স্বয়ং।  

তবে, বহু পত্র-পত্রিকায় বিভিন্ন নিবন্ধে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় একাধিকবার আক্ষেপ করেছেন, বর্তমান প্রজন্মের অভিনেতা-অভিনেত্রীদের মধ্যে অনেকেরই বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির বিষয়ে জ্ঞান তো দূরস্থান, প্রাথমিক কৌতূহলও নেই। এই প্রসঙ্গে সৌমিত্র চট্টোপধ্যায় একটি কাহিনি উল্লেখ করেছিলেন। প্রয়াত কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের বাড়ির প্রায় পাশেই একবার অভিনয় করতে গিয়ে, শুটিং-এর ফাঁকে কবিপত্নীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে গিয়েছিলাম তিনি। ফিরে আসার পর তাঁর এক সহ অভিনেতাকে, সেই কথা জানানোয় তিনি প্রশ্ন করেছিলেন, শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে তাঁর সাক্ষাত হল কি না, অর্থাৎ কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায় সম্পর্কে কোনও ধারণা তো ছিলই না, সৌমিত্রের নিজের ভাষায়, মাতৃভাষার প্রতি তাঁর প্রীতির ভাঁড়ার শূন্য। অভিনেতা এবং নির্দেশক হিসাবে তাঁকে বারবারই এরকম সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়েছে বলে আক্ষেপ করেছিলেন বাংলার এই কিংবদন্তী অভিনেতা।

অথচ সৌমিত্র বরাবরই বলতেন, একজন অভিনেতার কল্পনা, অনুভব, অভিজ্ঞতা, সবই দাঁড়িয়ে থাকে ভাষা ও সাহিত্যের ভিতের উপর। কাজেই বাংলা ভাষার আশ্রয়ে অভিনয় করতে গেলে বাংলা ভাষা, শব্দ, ও সাহিত্যের সঙ্গেও পরিচয়টা আবশ্যিক। তিনি জানিয়েছিলেন অন্যান্য সব শিল্পের মতোই অভিনয়েরও মূল লক্ষ্য হল জীবনের সত্যরূপকে ব্যক্ত করা। আর সেই লক্ষ্যের দিকে যাওয়ার জন্যে অভিনেতার জীবনের যে বিপুল অভিজ্ঞতা, কল্পনা, অনুভবের প্রয়োজন তা পাওয়া যায় ভাষা ও সাহিত্য চর্চার মধ্য দিয়ে। তাই অভিনয় করতে গেলে গাড়ি চালানো, অশ্বারোহণ, সাঁতার কাটা, ইত্যাদি নানাবিধ শারীরিক ক্রিয়া শিক্ষার মতো, মানসিক প্রসারণের জন্য সাহিত্য সংস্কৃতির চর্চা আবশ্যিক। যা মানসিক প্রসারণের পরিচয় পাওয়া গিয়েছে তাঁর ফিল্ম ও মঞ্চের প্রতিটি চরিত্রে। এই উত্তরাধিকার বহন করবে তো বাংলা অভিনয় জগৎ?