চেক বাউন্স হওয়ার পর অভিযোগকারীকে কত দিনের মধ্যে আইনি নোটিশ পাঠাতে হয়? Negotiable Instruments Act-এর ১৩৮ নম্বর ধারা অনুযায়ী চেক বাউন্স মামলায় সর্বোচ্চ কী শাস্তি হতে পারে? সুপ্রিম কোর্টের নতুন নির্দেশিকা অনুসারে, চেক বাউন্সের মামলা এখন কোন আদালতে দায়ের করতে হবে?

Cheque Bounce New Rules: ভারত দ্রুত ডিজিটাল পেমেন্টের দিকে এগোচ্ছে। UPI, নেট ব্যাঙ্কিং এবং ডিজিটাল ওয়ালেট আমাদের লেনদেনের ধরন বদলে দিয়েছে। তা সত্ত্বেও, যখন বড় ব্যবসায়িক চুক্তি, সম্পত্তি কেনাবেচা বা মোটা অঙ্কের পেমেন্টের কথা আসে, তখনও চেক কিন্তু ভরসার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।

Add Asianetnews Bangla as a Preferred SourcegooglePreferred

তবে, চেক ব্যবহার করা যতটা সহজ মনে হয়, এর সঙ্গে জড়িত আইনকানুন ততটাই কড়া। যদি আপনার দেওয়া চেক ব্যাঙ্ক থেকে পাশ না হয়, তাহলে এটি কেবল আর্থিক সমস্যাই নয়, আইনি পদক্ষেপের কারণও হতে পারে। এই কারণেই আদালত চেক বাউন্সের মামলাগুলিকে গুরুত্ব দিয়ে দেখে এবং দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য জোর দেওয়া হচ্ছে।

চেক বাউন্স কী?

সহজ ভাষায় বলতে গেলে, যখন কোনও ব্যক্তি বা সংস্থার দেওয়া চেক ব্যাঙ্কে জমা দেওয়ার পর সেটি ক্লিয়ার হয় না, তখন তাকে চেক বাউন্স বলা হয়। এর পিছনে বেশ কয়েকটি কারণ থাকতে পারে-

  • অ্যাকাউন্টে যথেষ্ট টাকা না থাকা
  • সাক্ষর (Signature) না মেলা
  • ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট বন্ধ থাকা
  • পেমেন্ট থামানোর নির্দেশ (Stop Payment)
  • প্রযুক্তিগত বা ব্যাঙ্কিং ত্রুটি

এই ধরনের পরিস্থিতিতে, যিনি চেক দিয়েছেন, তাঁকে আইনি নোটিশ এবং আদালতের કાર્યવાહીের মুখোমুখি হতে হতে পারে।

কোন আইনের অধীনে মামলা হয়?

ভারতে চেক বাউন্সের মামলা মূলত Negotiable Instruments Act, 1881-এর ১৩৮ নম্বর ধারার অধীনে করা হয়। এই আইনের উদ্দেশ্য হল আর্থিক লেনদেনে বিশ্বাস বজায় রাখা এবং চেকের মাধ্যমে করা পেমেন্টকে আইনি সুরক্ষা দেওয়া।

চেক বাউন্স হওয়ার পর আইনি প্রক্রিয়া কী?

চেক বাউন্স হওয়ার পর কয়েকটি নির্দিষ্ট আইনি প্রক্রিয়া মেনে চলতে হয়।

প্রথম ধাপ: ব্যাঙ্কের রিটার্ন মেমো

যখন চেক ক্লিয়ার হয় না, তখন ব্যাঙ্ক একটি 'Cheque Return Memo' জারি করে, যেখানে চেক প্রত্যাখ্যানের কারণ লেখা থাকে।

দ্বিতীয় ধাপ: আইনি নোটিশ

যিনি চেকটি পেয়েছেন, তাঁকে ব্যাঙ্ক থেকে রিটার্ন মেমো পাওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে চেক প্রদানকারীকে একটি আইনি নোটিশ পাঠাতে হয়।

তৃতীয় ধাপ: টাকা দেওয়ার সুযোগ

নোটিশ পাওয়ার পর, অভিযুক্ত ব্যক্তিকে বকেয়া টাকা দেওয়ার জন্য ১৫ দিন সময় দেওয়া হয়।

চতুর্থ ধাপ: আদালতে অভিযোগ

যদি ১৫ দিনের মধ্যে টাকা পরিশোধ না করা হয়, তাহলে অভিযোগকারী আদালতে মামলা দায়ের করতে পারেন। আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, নির্দিষ্ট সময়সীমা না মানলে মামলা দুর্বল হয়ে যেতে পারে।

চেক বাউন্সে কী শাস্তি হতে পারে?

ধারা ১৩৮-এর অধীনে দোষী সাব্যস্ত হলে আদালত অভিযুক্তকে-

  • দুই বছর পর্যন্ত জেল,
  • চেকের অঙ্কের দ্বিগুণ পর্যন্ত জরিমানা,
  • অথবা দুটোই একসাথে দিতে পারে।

তবে অনেক ক্ষেত্রে, যদি অভিযুক্ত সময়মতো টাকা দিয়ে দেন এবং উভয় পক্ষ সমঝোতায় পৌঁছায়, তাহলে আদালত মামলাটি শেষও করে দিতে পারে। কিন্তু বারবার নোটিশ দেওয়ার পরেও টাকা না দিলে আদালত কড়া অবস্থান নিতে পারে।

BNS আসার পর কী বদলেছে?

১ জুলাই ২০২৪ থেকে লাগু হওয়া ভারতীয় ন্যায় সংহিতা (BNS) জালিয়াতি এবং প্রতারণার মতো অপরাধের জন্য বেশ কিছু নতুন নিয়ম এনেছে।

তদন্তে যদি প্রমাণ হয় যে চেক দেওয়ার সময় প্রতারণা বা জালিয়াতির উদ্দেশ্য ছিল, তাহলে BNS-এর ৩১৮ এবং ৩১৯ ধারাও প্রযোজ্য হতে পারে। সেক্ষেত্রে অভিযুক্তের ৭ বছর পর্যন্ত জেল এবং জরিমানা হতে পারে।

সুপ্রিম কোর্ট কী গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশ দিয়েছে?

দেশে বাড়তে থাকা চেক বাউন্স মামলা দেখে সুপ্রিম কোর্ট কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশিকা জারি করেছে।

  1. এলাকার বিবাদ শেষ: এখন থেকে চেক বাউন্সের মামলা সেই আদালতেই দায়ের করা হবে, যেখানে অভিযোগকারীর ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট রয়েছে। এর ফলে মামলার প্রক্রিয়া আরও স্পষ্ট হয়েছে।
  2. অন্তর্বর্তীকালীন ক্ষতিপূরণ: আদালত অভিযুক্তকে মামলা চলাকালীন চেকের অঙ্কের ২০ শতাংশ পর্যন্ত অন্তর্বর্তীকালীন ক্ষতিপূরণ হিসেবে জমা দেওয়ার নির্দেশ দিতে পারে।
  3. আপিল করলে টাকা জমা: যদি অভিযুক্ত নিম্ন আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করে, তাহলে তাকে জরিমানা বা চেকের অঙ্কের অন্তত ২০ শতাংশ আদালতে জমা দিতেই হবে।
  4. 'স্টপ পেমেন্ট'ও অপরাধ হতে পারে: সুপ্রিম কোর্ট স্পষ্ট করেছে যে অ্যাকাউন্টে যথেষ্ট টাকা থাকা সত্ত্বেও যদি প্রতারণার উদ্দেশ্যে ব্যাঙ্ককে পেমেন্ট रोकनेার নির্দেশ দেওয়া হয়, তবে সেটাও আইনি অপরাধ বলে গণ্য হতে পারে।
  5. দ্রুত নিষ্পত্তিতে জোর: আদালতগুলিকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যে সাক্ষীদের হলফনামা এবং প্রামাণ্য দলিলের ভিত্তিতে শুনানি দ্রুত শেষ করতে হবে, যাতে বছরের পর বছর ধরে ঝুলে থাকা মামলার সংখ্যা কমে।

ভবিষ্যতে কী বদলাতে পারে?

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, আগামী বছরগুলিতে ডিজিটাল পেমেন্টের পরিধি আরও বাড়বে, যার ফলে চেকের ওপর নির্ভরতা ধীরে ধীরে কমতে পারে। তবুও, বড় ব্যবসায়িক চুক্তি এবং আনুষ্ঠানিক লেনদেনে চেকের ভূমিকা আপাতত গুরুত্বপূর্ণ থাকছে। তাই সরকার এবং বিচারব্যবস্থা উভয়ই চেষ্টা করছে যাতে চেক বাউন্স সংক্রান্ত মামলাগুলির দ্রুত নিষ্পত্তি হয় এবং ব্যবসায়িক আস্থা বজায় থাকে। অনলাইন শুনানি, ই-সমন এবং ডিজিটাল রেকর্ডের মতো ব্যবস্থাগুলি এই দিকেই এক গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ বলে মনে করা হচ্ছে।