দেশে মূল্যবৃদ্ধির হার আগামী দিনে ৬ থেকে ৭ শতাংশে পৌঁছতে পারে। পরিস্থিতি সামাল দিতে রিজার্ভ ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়া (আরবিআই) রেপো রেট ১০০ থেকে ১৫০ বেসিস পয়েন্ট পর্যন্ত বাড়াতে পারে বলে একটি রিপোর্টে দাবি করা হয়েছে।

দেশে মূল্যবৃদ্ধির ঝুঁকি এখন রিজার্ভ ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়া (RBI)-র ধারণার চেয়েও অনেক বেশি। আগামী ত্রৈমাসিকগুলোতে এই হার ৬ থেকে ৭ শতাংশে পৌঁছে যেতে পারে। পরিস্থিতি সামাল দিতে আরবিআইকে ফের সুদের হার বাড়াতে হতে পারে। 'সিস্টেমেটিক্স ইনস্টিটিউশনাল ইক্যুইটিজ'-এর একটি সাম্প্রতিক রিপোর্টে এমনই দাবি করা হয়েছে।

মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে ভয়ঙ্কর রিপোর্ট

রিপোর্ট বলছে, কাঁচামালের দাম বৃদ্ধি এবং সাধারণ মানুষের খরচের চাপ যেভাবে বাড়ছে, আরবিআইয়ের বর্তমান হিসেবে তার সঠিক প্রতিফলন নেই। কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্ক মূল্যবৃদ্ধির ঝুঁকিকে কিছুটা কম করেই দেখছে। রিপোর্টে স্পষ্ট বলা হয়েছে, "নীতি এখন কড়াকড়ি করা হচ্ছে ঠিকই, তবে মূল্যবৃদ্ধি ৬ শতাংশের গণ্ডি ছাড়িয়ে যাওয়ার বড়সড় ঝুঁকি রয়েছে।"

আরবিআইয়ের নিজস্ব সমীক্ষাতেই দেখা যাচ্ছে, ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে সাধারণ মানুষের মূল্যবৃদ্ধির প্রত্যাশা গড়ে ৯.১ শতাংশে দাঁড়াতে পারে। এই হার সাধারণ মূল্যবৃদ্ধির চেয়ে অনেকটাই বেশি এবং তা ক্রমশ বাড়ছে। আরবিআইয়ের 'ইনফ্লেশন ডিফিউশন ইনডেক্স' বা মূল্যবৃদ্ধি সূচকও ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, প্রায় সব ক্ষেত্রেই জিনিসের দাম বাড়ছে। অর্থাৎ, মূল্যবৃদ্ধির আঁচ এখন অর্থনীতির সব স্তরেই ছড়িয়ে পড়ছে। চাহিদা ও জোগানের চাপ সীমিত বলে আরবিআই যে দাবি করেছে, তা নিয়ে রিপোর্টে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। একদিকে কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্ক বলছে দেশে বিক্রিবাট্টা ও বিনিয়োগ ভালো হচ্ছে, আবার অন্যদিকে জোগানে ঘাটতির কথাও মানছে। এই দুইয়ের মধ্যে একটা অসংগতি রয়েছে বলে বিশেষজ্ঞদের মত।

মূল্য়বৃদ্ধির কারণ কী?

জ্বালানির দাম বাড়ার পেছনে আরবিআই মূলত 'বেস এফেক্ট'-কে দায়ী করেছে। কিন্তু একইসঙ্গে তারা দুর্বল বর্ষা, এল নিনো পরিস্থিতি এবং আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামের ওঠানামার মতো জোগানের ঝুঁকিগুলোও স্বীকার করে নিয়েছে।

ভারতীয় কোম্পানিগুলোর, বিশেষ করে উৎপাদনকারী সংস্থাগুলোর খরচ যেভাবে বাড়ছে, তা জোগানের দিক থেকে মূল্যবৃদ্ধির একটা বড় প্রমাণ। ২০২৭ অর্থবর্ষের প্রথম ত্রৈমাসিকে নন-ফিনান্সিয়াল কোম্পানিগুলোর কাঁচামালের খরচ আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৪০ শতাংশ বেড়েছে। পাশাপাশি অপরিশোধিত তেলের দামও ৪৫ শতাংশ বেড়েছে। কোম্পানিগুলো এই বাড়তি খরচের পুরোটা ক্রেতাদের ঘাড়ে চাপাতে পারেনি। ফলে তাদের গ্রস মার্জিন ৬৫০ থেকে ৮০০ বেসিস পয়েন্ট কমে গেছে।

রিপোর্টে আরও সতর্ক করা হয়েছে যে, খাদ্য, জ্বালানি ও সারে সরকারি ভর্তুকি এবং তেল কোম্পানিগুলোর লোকসানের কারণে পশ্চিম এশিয়ার সংঘাতের প্রভাব সেভাবে বাজারে পড়েনি। কিন্তু এই সরকারি সহায়তা কমতে শুরু করলেই আগামী মাসগুলোতে মূল্যবৃদ্ধি আরও দ্রুত হারে বাড়বে।

মুদ্রানীতি প্রসঙ্গে সিস্টেমেটিক্স জানিয়েছে, আরবিআই সম্প্রতি রেপো রেট ২৫ বেসিস পয়েন্ট বাড়িয়ে ৫.৫০ শতাংশ করেছে। এর থেকেই বোঝা যাচ্ছে যে, সুদের হার বাড়ানোর নতুন একটা পর্ব শুরু হয়ে গেছে।

তবে এইটুকু বৃদ্ধি মূল্যবৃদ্ধি ঠেকাতে যথেষ্ট নাও হতে পারে। রিপোর্টে বলা হয়েছে, "আগামী ত্রৈমাসিকগুলোতে মূল্যবৃদ্ধি ৬ থেকে ৭ শতাংশে পৌঁছে চমকে দিতে পারে। রিয়েল ইন্টারেস্ট রেট অন্তত ১ শতাংশে ফিরিয়ে আনতে গেলে রেপো রেট আরও বাড়াতে হবে। বর্তমান ৫.৫ শতাংশ থেকে ১০০-১৫০ বেসিস পয়েন্ট বাড়িয়ে রেপো রেট ৬.৫ থেকে ৭ শতাংশে নিয়ে যেতে হতে পারে।"

প্রথম ত্রৈমাসিকে ৭.৮ শতাংশের দুর্দান্ত বৃদ্ধির পর, আরবিআই ২০২৭ অর্থবর্ষের জিডিপি বৃদ্ধির পূর্বাভাস ৬.৭ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৭.১ শতাংশ করেছে। একইসঙ্গে মূল্যবৃদ্ধির পূর্বাভাসও বাড়ানো হয়েছে। ২০২৭ অর্থবর্ষের তৃতীয় ত্রৈমাসিকে মূল্যবৃদ্ধি ৬ শতাংশে পৌঁছতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে, যা আগে ৫.৯ শতাংশ ধরা হয়েছিল।

সিস্টেমেটিক্স সতর্ক করেছে যে, এই টানা মূল্যবৃদ্ধি এবং সুদের হার বৃদ্ধি শেয়ার বাজারের জন্য জোড়া বিপদ ডেকে আনতে পারে। একদিকে চড়া সুদের কারণে ইক্যুইটি ভ্যালুয়েশন কমবে, অন্যদিকে কাঁচামাল ও ঋণের খরচ বাড়ায় কোম্পানিগুলোর লাভ ধাক্কা খাবে। বর্তমানে ১০ বছর মেয়াদি সরকারি বন্ডের ইল্ড ৭.২৪ শতাংশের কাছাকাছি রয়েছে। মূল্যবৃদ্ধি প্রত্যাশা ছাড়িয়ে গেলে এবং আরবিআই সুদের হার বাড়াতে থাকলে, এই ইল্ড ৭.৫ শতাংশের উপরে চলে যেতে পারে বলেও রিপোর্টে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে।