তপন মল্লিকঃ ১৯৯৬ সালে ভারত-পাকিস্তান-শ্রীলংকার মধ্যে একদিনের টুর্নামেন্টে শ্রীলংকা-ভারত ম্যাচে যে ব্যটসম্যানটির অভিষেক হল তিনি শ্রীলঙ্কার বিরুদ্ধে ৩ আর পরের ম্যাচে পাকিস্তানের বিপক্ষে ৪ রান করে আউট হয়ে যান। ওই বছর ইংল্যান্ডের লর্ডসে তাঁর টেস্ট অভিষেকে সাত নম্বরে ব্যাট করতে নেমে করলেন ৯৫। লো স্ট্রাইকরেট, শট খেলার সীমাবদ্ধতার কারণে ব্যাটসম্যানটি ১৯৯৯-এর বিশ্বকাপ পর্যন্ত তার পরিচয় ছিল টেস্ট স্পেশালিস্ট হিসাবে। সৌভাগ্যবশত সুযোগ পেলেন ইংল্যান্ডে সেই বিশ্বকাপে। ভারত সেবার ব্যর্থ হলেও ৮ ম্যাচে প্রায় ৮৫ স্ট্রাইকরেটে ৪৬১ রান করে টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ রানস্কোরার হন ওই ব্যাটসম্যান। ২০০৩-এর বিশ্বকাপে একজন এক্সট্রা স্পেশালিস্ট ব্যাটসম্যান হিসাবে সুযোগ পেয়ে ব্যাট হাতে ৩১৮ রান করে ভারতকে ফাইনাল তুম্লেছিলেন। কেবল তাই নয়, তিনি খেলেছিলেন উইকেটকিপার ব্যাটসম্যান হিসেবে। গ্লাভস তুলে ১৬ ডিসমিসাল করেছিলেন। 

ওই বিশ্বকাপের আগে ২০০২ সালে চার টেস্ট ম্যাচের সিরিজে প্রায় ১০০ ব্যাটিং গড়ে ৬০২ রান। তার মধ্যে তৃতীয় ম্যাচে লিডসের সবুজ পিচে ১৪৮ রান, একই সিরিজে ক্যারিয়ারের ২য় ডাবল সেঞ্চুরি। একের পর এক গোলা ছুটে আসে আর অটুট ধৈর্যে তাঁর ব্যট সেগুলি সামলে প্রচণ্ড মনস্তাত্ত্বিক চাপে ফেলছে বোলারদের। দলের ভয়ংকর চাপের পরিস্থিতিতে উইকেট কামড়ে পড়ে থাকা,  প্রতিপক্ষের ছোড়া গোলা কিংবা ঘুরন্ত বল তার সঙ্গে সাজানো ফিল্ডিং-এ ঠান্ডা মাথায় দলকে বাঁচানো এবং এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্যই তিনি ছিলেন দ্য আল্টিমেট ওয়াল এবং অন্যতম সেরা 'অ্যাওয়ে' ব্যাটার। কেবল দেশের মাটিতে নয়, উপমহাদেশের বাইরে সমানতালে খেলতেন। তাই ২০০৩-এ অ্যাডিলেইড টেস্টে অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে ২৩৩,  ২০০৪-এ রাওয়ালপিণ্ডিতে ২৭০ রানের অনবদ্য ইনিংশ থেকে তিনি পৌঁছে যান অন্য উচ্চতায়। ক্রিকেট জীবনের প্রায় পুরোটা সময় শচীন টেন্ডুলকারের ছায়ায় থেকেও যিনি নিজেকে আলাদা করেছিলেন তাঁর নাম রাহুল শরদ দ্রাবিড়।


 
ক্রিকেটে কীর্তি ব্যাটসম্যান বা বোলারকে বুঝতে পরিসংখ্যান দরকার হয়। সেক্ষেত্রে টেস্টে রাহুল দ্রাবিড় ম্যান অব দ্য ম্যাচ হয়েছে যথাক্রমে ১১ বার এবং ওয়ানডেতে ১৪ বার। যেখানে শচীন ওয়ানডেতে ৬২ বার,  ক্যালিস টেস্টে ২৩ বার সেখানে রাহুলের রেকর্ড আহামরি কিছু নয়। তবে দ্রাবিড় এই ১১ বারের মধ্যে ৮বারই ম্যান অব দ্য হয়েছেন বিদেশের ফাস্ট আর বাউন্সি পিচে। ২৮৬ ইনিংসের টেস্ট জীবনে দ্রাবিড় ৩১২৫৮টি বল খেলেছেন এবং ক্রিজে থেকেছেন ৪৪১৫২ মিনিট। বিপক্ষের কাছে তাঁর উইকেটটি যে কত মূল্যবান সেটা বুঝতে অসুবিধা হয় না। শুধু কই তাই,  দ্রাবিড় ওয়ানডে টেস্ট মিলিয়ে মিলিয়ে ৭০০ টি পার্টনারশিপ গড়েছেন, এর মধ্যে ৮৮ টি পার্টনারশিপ ১০০+ রানের। 

সৌরভের অধিনায়কত্বে ভারত যে ২১টি টেস্ট জিতেছে তাতে দ্রাবিড়ের ব্যাটিং গড় ১০২.৮৪, ৯টি সেঞ্চুরি; ৩টি ডাবল-সহ। টেস্ট ক্রিকেটের ইতিহাসেই তিনি একমাত্র ব্যাটসম্যান যিনি কখনোই গোল্ডেন ডাক মারেননি। তার খেলা ম্যাচগুলিতে তাঁর দল মোট যা রান করেছে সেখানে দ্রাবিড়ের অবদান ৩৫.৬ শতাংশ। টেস্ট ইতিহাসে এই অবদান আর কার আছে। শচীনে তেন্ডুলকারের অবদান ২৯.৯% এবং ক্যালিসের ৩২.৬%। দ্রাবিড় স্লিপে দাড়িয়ে ক্যাচ নিয়েছেন ২১০টি,  সেটাও বিশ্বরেকর্ড। ক্যাচকে আলাদাভাবে মূল্যায়ন করতে হয় কারণ মার্ক ওয়াহ এবং জয়াবর্ধনের মতো দুজন স্লিপ ফিল্ডার না থাকলে শেন ওয়ান আর মুরালিধরনের টেস্ট বোলিং ফিগার অনেকটাই পিছিয়ে থাকত। 

২০০১ এ যে টেস্ট ম্যাচটিতে লক্ষণ ২৮১ করেছিলেন,  সেই ম্যাচে ভারত ফলোঅনে পড়েছিল। এর আগের টেস্টের প্রথম ইনিংসে বাজে ব্যাটিং করায় দ্রাবিড়কে তাঁর ৩ ব্যাটিং লাইন ছেড়ে ৬ নম্বরে নামতে হয়েছিল  এবং সেখান থেকেই লক্ষণের সঙ্গে সেই ঐতিহাসিক পার্টনারশিপ গড়েছিলেন। দ্রাবিড়ের ব্যাটিঙে পুরোপুরি কপিবুক স্টাইল, সেখানে না  ছিল কোনও ইনোভেটিভ বা ইমপ্রোভাইজড শট, না ছিল  এগ্রেসিভ অ্যাটিচুড অর্থাৎ যেটা ওয়ান ডাউন ব্যাটসম্যানদের থাকা দরকার। যদিও ক্যালিস, সাঙ্গাকারা ওয়ান ডাউন পজিশনে কেউই প্রচলিত অর্থে স্ট্রোকপ্লেয়ার নন,  কিন্তু ভাল স্ট্রাইকরেটে রান করতেন, প্রয়োজনে স্লগ করতে জানতেন। তুলনায় দ্রাবিড়ের ব্যাটিং অনেকটাই মন্থর তবে বেশিরভাগ সময়েই তাঁর ধৈর্য ধরে মাটি কামড়ে পরে থাকার ক্ষমতা দলের পক্ষে আশীর্বাদ হয়েছে। 

তাঁকে যতই টেস্ট স্পেশালিস্ট বলা হোক না কেন ১৯৯৯-২০০৫ এই সময়ে তাঁর থেকে সফল ওয়ানডে ব্যাটসম্যান কজনও ছিল? এই সময়ে দ্রাবিড়ের রান ৭১৩৪, গড় ৪২.৯৭;  সৌরভ গাঙ্গুলীর ৭১৮৫, গড় ৪০.৮২। দ্রাবিড় যে ৩৪৩টি ওয়ানডে খেলেছেন তার ১৬০টিতেই ভারত জিতেছে এবং দ্রাবিড়ের ব্যাটিং গড় সেখানে ৫০.৬৯। তিনটি বিশ্বকাপে তাঁর ব্যাটিং গড় ৬১.৪২,  ভিভ রিচার্ডসের ৬৩.৩১।  অধিনায়ক সৌরভ দ্রাবিড়কে নিয়ে তো কম পরীক্ষা নিরীক্ষা করেননি। দ্রাবিড়কে উইকেটকিপার বানিয়ে চারজন বোলার একাদশে রেখে এক্সট্রা ব্যাটসম্যান খেলিয়েছেন,  কিপার হিসেবে ৭৩টি ম্যাচ কই কম কথা। এমনকি দ্রাবিড়কে ৭ নম্বরেও ব্যাটিং করানো হয়েছে টিম কম্বিনেশনের কথা বলে। তারপরও দ্রাবিড় তার সেরাটুকু দিয়ে যান দলের জন্য। 

আসলে দ্রাবিড় শুধু ক্রিকেট নয় সবক্ষেত্রেই বলে দেন শো-অফ না করে নিজের দায়িত্বেই কত বেশি মনযোগী হতে হয়। তাই ক্রিকেটার দ্রবিড় তাঁর লাগেজে ব্যাট-প্যাডের সঙ্গে সবসময় রাখতেন বই। এখানেও তিনি শিখিয়েছেন চর্চায় কোনও ফাঁক রাখা যাবে না। তাই তেন্ডুলকারের ছায়াতেও তিনি সব সময় থেকেছেন আলোয়। আজ 'দ্য ওয়ালের' ৪৮ তম জন্মদিন। সকাল থেকেই শুভেচ্ছার জোয়ারে ভাসছেন তিনি। এশিয়ানেট নিউজ বাংলার পক্ষ থেকে জন্মদিনে রাহুল দ্রাবিড়কে অনেক শুভেচ্ছা।