তপন মল্লিকঃ মনগর জায়গাটির নাম যারা জানেন তারা বলেন সেটি ভারতীয় ক্রিকেটের আঁতুড়ঘর। রাজকোট থেকে ৬০-৭০ কিলোমিটার দূরে এই জেলা শহরে এমন একজন মানুষ জন্মেছিলেন কেবলমাত্র তাঁর কারণেই তিনি ও তাঁর জন্মস্থান ইতিহাসে জায়গা করে নিয়েছে। তিনি ছিলেন ভারতীয় ক্রিকেট ইতিহাসের প্রথম আন্তর্জাতিক ক্রিকেটার। তাঁকে ভারতীয় ক্রিকেটের পিতামহ বলা হয়। একজন ভারতীয় হয়েও ইংল্যান্ডের হয়েই টেস্ট খেলে তিনি ইতিহাসে জায়গা করে নিয়েছিলেন। অনেকেই তাঁকে বলেন,‘ফাদার অব ইন্ডিয়ান ক্রিকেট’।     

দেশের প্রথম টেস্ট ক্রিকেটার স্যার রণজিৎ সিংজি বিভারজি জাদেজা জন্মেছিলেন গুজরাতের জামনগরে ১০ সেপ্টেম্বর ১৮৭২-এ। পড়াশোনা করতে বিলেতে গিয়ে তিনি ১৮৯৬ সালে ইংল্যান্ডের হয়ে খেলেছিলেন প্রথম টেস্ট। তখন ক্রিকেট ছিল পুরোপুরি সাহেবদের খেলা। ১৮৯৩ সালে কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক হবার পর, ইংল্যান্ডে প্রথম শ্রেণির কাউন্টি ক্রিকেট খেলেছিলেন রণজিত সিং। ১৯১২ সাল পর্যন্ত তিনি ছিলেন সাসেক্স দলের খেলোয়াড়। এর মধ্যে ১৮৯৯ সাল থেকে শুরু করে ১৯০৩ সাল পর্যন্ত তিনি ছিলেন দলের অধিনায়ক। ১৮৯৯ ও ১৯০০ সালে, পর পর তিনি ৩০০০ করে রান করেছিলেন। ১৮৯৬ সাল থেকে ১৯০২ সালের মধ্যে ইংল্যান্ডের হয়ে ১৫টি টেস্ট ম্যাচ খেলেছিলেন তিনি। ক্রিকেটে লেগ গ্ল্যান্স শট তাঁরই আবিষ্কার।

ইংল্যান্ডের হয়ে টেস্ট খেলতে নেমে ১৮৯৬ সালের জুলাইয়ে অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে অভিষেকেই ১৫৪ রান করেছিলেন রণজিত৷ সেই মরসুমে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে ২৭৮০ রান করে ভেঙে দেন ডব্লিউ জি গ্রেসের রেকর্ড৷ যা এখনও ইংল্যান্ডের ক্রিকেটে মিথ হয়ে আছে৷ ইংল্যান্ডের হয়ে ১৫টি টেস্ট খেলে রঞ্জি প্রায় হাজার করেছেন, গড় ৪৫-এর মতো৷ ডানহাতি ব্যাটসম্যানের পাশাপাশি ডানহাতে স্লো মিডিয়াম পেস বোলিংয়ে পারদর্শী ছিলেন তিনি। রঞ্জিত সিংকে লেগ গ্লান্সের জনক বলা হত। কারণ তিনি যখন খেলতেন সেই সময় ব্যাটসম্যান অফ সাইডেই শট মারতেন। কিন্তু রঞ্জিত এই ধারণাকে বদলে দেন আর লেগ সাইডে নিজের কব্জির জাদুতে প্রচুর রান করেন। 

প্রথম টেস্ট ম্যাচ তিনি অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে ম্যানচেস্টারে খেলেন,  যেখানে তিনি প্রথম ইনিংসে ৬২ আর দ্বিতীয় ইনিংসে ১৫৪ রানের ইনিংস খেলেন। অর্থাৎ নিজের ডেবিউতে হাফ-সেঞ্চুরির সঙ্গে সেঞ্চুরি করার রেকর্ড গড়েন। ওই বছরই আগস্টে রঞ্জিত সিং হোওতে একটি প্রথম শ্রেনীর ম্যাচে একই দিনে দুটি সেঞ্চুরি করেন। একই দিনে একই ম্যাচে তিনি ১০০ আর ১২৫ রানের ইনিংস খেলেন। ইংল্যান্ডে কাউন্টি ক্রিকেটে রঞ্জিত সিংহের কর্তৃত্ব তিনি ১০টি মরশুমে ১০০০ এর বেশি রান করা ব্যাটসম্যান। শুধু তাই নয় ১৮৯৯ আর ১৯০০র দুটি মরশুমে তিনি ৩ হাজারের বেশি রান করেছিলেন। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে রঞ্জিত সিং ইংল্যান্ডের হয়ে ১৫টি টেস্ট ম্যাচ খেলেন যেখানে তিনি ২টি সেঞ্চুরির সাহায্যে ৪৪.৯৫ গড়ে ৯৮৯ রান করেন। কিন্তু প্রথম শ্রেনীর ক্রিকেটে তিনি মোট ৭২টি সেঞ্চুরি করেন। 

ইংল্যান্ড থেকে দেশে ফেরার পর নওয়ানগরের জাম সাহেব বা শাসক খেতাব পাওয়ার জন্য লড়াই চালান রণজিত সিং। অবশেষে, ১৯০৭ সালে সেই খেতাব অর্জনের পর রণজিত সিং নওয়ানগর আধুনিকীকরণের কাজ শুরু করেন। সেই সময় বেশ কয়েকবার তাঁর এলাকা খরার কবলে পড়ে। নিজের ২৫ বছরের শাসনকালে রণজিত সিং এলাকায় সড়ক ও রেলপথের কাজ করেন, বেদী সমুদ্রবন্দর তৈরি করেন এবং রাজধানী জামনগরের প্রচুর উন্নতি করেন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন রণজিত সিং ব্রিটিশ সৈন্যবাহিনীতে যোগ দেন এবং ১৯২০ সালে লিগ অফ নেশনসে ভারতের হয়ে প্রতিনিধিত্ব করেন। ভারতের রাজনীতিতেও তিনি কার্যকর ভূমিকা পালন করেন এবং ভারতের রাজন্যশাসিত রাজ্যগুলির পরিষদীয় চেম্বার, চেম্বার অফ প্রিন্সেসের সদস্য হন। অন্য রাজন্যশাসিত রাজ্যগুলির শাসকদের কাছে তিনি ব্রিটিশরাজের আওতাধীন কোনও ফেডারেশন স্কিম গ্রহণ না করার অনুরোধ জানান। 

রণজিত সিং-এর মৃত্যুর পর, ১৯৩৩ সালের ৩ এপ্রিল একটি রিপোর্ট প্রকাশিত হয়। তাতে বলা হয়েছিল, ‘নওয়ানগরের মহারাজ, রণজিত হিসাবেই পরিচিত হয়ে থাকবেন মহামান্য কুমার শ্রী নামের এক ইংরেজের কাছে। রণজি, যাঁর একটি উপাধি জিবিই, তা যতই গ্র্যান্ড ক্রস ওভার দ্য অর্ডার অফ দ্য ব্রিটিশ এম্পায়ার হোক না কেন, তাঁর ক্ষেত্রে তা হয়ে থাকবে গ্রেট ব্যাটসম্যান এভার হিসেবে’।