বোকা বানানোর গল্প-- তাপস রায়/ -------------  বোকারাম মাহাত পিতৃদত্ত নাম। পাল্টানোর উপায় নেই। বাবা ছেলেকে বোকা বানিয়ে দিয়ে স্বর্গে কেটে পড়েছে । বাবাকে নীচে নামিয়ে তো আর পার্মিশন নেবার উপায় নেই। আর বাবার অসম্মান হতে দেবেন না মা-ও। মা বাবার গুলি খাওয়া চাকরি নিয়ে এখন পুলিশ কনস্টেবল। লোকে বলে মাওবাদীরা একদিন ঝেড়ে দিয়েছিল। তখন ওরা বাঁকুড়ায় থাকত । এখন এখানে এই উত্তর-২৪ পরগণায়। কাজের গুঁতোয় হোক বা স্বভাবই হোক মা বেজায় রাগী । তাকে এড়িয়ে পাতাটি কুড়োনোও চলে না।  ফলে নাম পাল্টানোর জায়গায় বোকারামের কপালে আরো একটা দাগ জমে। কাটা দাগ। স্কুলের ছুটিতে মারামারি করে কপাল কাটে। ওটা ক্লাস ফাইভের দাগ। এখন বড় ক্লাসে উঠে, মানে ক্লাস ইলেভেন-এ আরো খানিক বড় দেখায় সেটি। আয়নায় চোখ পড়লেই বোকারাম বলে খ্যাপানোর জন্য বন্ধুদের সাথে মারামারিতে জড়িয়ে পড়ার ঘটনা রোজ রোজ তাজা হয়ে ওঠে। 

বোকারাম মাহাত-র কাছে স্কুলের গরমের ছুটি এবছর একটা সুযোগ এনে দিয়েছে।  ভোটের মরসুম। টিভি দেখতে দেখতে একটা মতলব মাথায় এসেছে তার। সে দেখেছে  সবাই রামকে ব্যবহার করে শুধু বড় লোক নয়, মানী মানুষ হয়েও যাচ্ছে। যেমন হনুমানের জ্বালায় মানুষ অতিষ্ঠ হলেও যেই রামভক্ত হনুমান হয়ে মেটে সিঁদুরে শরীর লিপ্ত করে কোনো হনুমানমূর্তি অশ্বত্থ তলায় বসছে, মাসাধিক কাল যেতে না যেতেই সেখা্নকার টিকিধারী পুজারীর সে কী কদর! ঢলোঢলো বৌ-মানুষরা এসে মাথা পেতে আশীর্বাদ নিচ্ছে ওই পুরোহিতের। মন্দিরের কাঁসার রেকাবিতে পাঁচ টাকা দশ টাকার ঠন্‌ ঠন্‌  শব্দে আমোদিত হয়ে উঠছে স্থানীয় বাতাস। 

আজ বোকারামের মনে হলো বাইরে থেকে এসে লোকজন করে খাচ্ছে এখানে,  অথচ তার নিজেরই কিছু হল না। কিন্তু হওয়ার হলে তারই তো হওয়ার কথা। আজ নিজেকেই দুষছে।  এতদিন মাথায় আসেনি কেন! গনগনে্‌, সূর্যের দিকে চেয়ে সে মরা বাবাকে একটা পেন্নাম ঠুকে দিলো। বোকারাম নামটা তো তারই দেয়া। 

দেশের সব মহান লোকের মতো তারও নামের সাথে রাম জড়িয়ে আছে। শ্রীরাম থেকে শুরু করে কাঁশিরাম।  ওষুধের কারবারী রামদেব থেকে সিনেমা ব্যাবসার রামোজী সিটি। লোকে প্রতিদিন রাম উচ্চারণ না করে কথাই বলতে পারে না। কোনো কথা ভুল বললে জিভ কেটে বলে, আরে রাম রাম। শ্মশান যাত্রার সময় সমবত ধ্বনি বের হয়, রাম নাম সাচ হ্যায়।  এখন বোকারাম নিজের মনে চ্যুইংগাম চিবতে চিবতে পায়ের দোল বাড়িয়ে দিয়েছে বারান্দায় কাঠের টুলে বসে। বেলা নটা। মা বেরিয়ে গেছে ভোটের ডিউটিতে, সে বায়োলজি বইয়ের পাতায় চোখ রেখে মন রেখেছে এই নতুন নাম-কীর্তনে। 

বই পাশে রেখে সে রামের সাথে যুক্ত শব্দ জোড় খাতায় টুকে ফেলতে চাইল।  প্রথমেই লিখে ফেলল রামছাগল শব্দটি। এবং বিচার করে দেখল রাম যুক্ত হওয়ায় ছাগল সমাজে তার প্রতিপত্তি যথেষ্ট হয়েছে। তাহলে বোকাদের সমাজেও সে গুরু হয়ে উঠতে পারে  আর রামভক্ত, রামদা শব্দগুলিও সে পাশে লিখে গোলাকার বন্ধনীর ভেতর রাখল। 

স্কুল বন্ধ না হলে ঠিক ছিল। কিন্তু স্কুল খোলার জন্যও তো আর অপেক্ষা করে থাকতে পারবে না! খুব প্রাণের বন্ধু স্নেহাংশু  এ তল্লাটেই থাকে। গ্যাসে ভাত হয়ে এসেছে। নামিয়ে রেখে, গ্যাসের নব ঘুরিয়ে বোকারাম সাইকেলের চাকা ঘুরিয়ে দিল। উসুমপুরের বটতলা পেরিয়ে আগরপাড়া স্টেশনমোড় মাত্র এক কিলোমিটার। রোদ্দুর তেমন তাতেনি। ভোট গরমও আজকে কম। পাঁচ দফা ভোট গোটা দেশে হয়ে গেছে, আর দু দফা বাকি।  

স্নেহাংশু বলল, “ জানিস তো যখন কান মলা দিতে ইচ্ছে করছে, অথছ পারছে না, বাবা মা দু’জনেই তখন  আমাকে বোকা বলে গালি দেয়। মা আবার এককাঠি সরেস, বাজারে যেতে হলে বলে, কাউকে একটা সঙ্গে নিয়ে যা, তুই যা বোকা, সবাই ঠকিয়ে দেবে। ”

“ বোকা বললে তোর রাগ-দুঃখ হয় না?” এটা স্নেহাংশুকে উদ্দেশ্য করে বলা বোকারামের। 

“ হবে না কেন! ক্লাসে বন্ধুদের মিচকি হাসি দেখলে গা চিড়বিড় করে। বিশেষ করে অঙ্ক ক্লাসে। আমি অঙ্কে খারাপ, তাতে তোদের কি!  অঙ্কে চল্লিশ পাওয়া মানে কি বোকা! কেমিস্ট্রিতে আশি, বায়োলজিতে চুরাশি পেলাম যে, তার বেলা! বোকা বললে রাগ হবে না!”

“তাহলেই বোঝ স্নেহাংশু, আমাকে তো সব সময় ওই বোকার বোঝা বইতে হয়। আর ঠিক তোর যেমন কপাল, আমারও।  আমার নামের সাথে যে রাম শব্দটা আছে, তা কারো চোখেই পড়ে না।! ”

স্নেহাংশু বিষয়টা তেমন বুঝে উঠতে পারে না। কিন্তু  এটা বোঝে বোকারামের গলার স্বর কেমন পালটে গেছে। একটা কিছু সে বলতে চায়, যা নতুন। সে বোকারামের মুখের উপর কৌতূহলী চোখ ফেলে।

“ শোন, আমি মায়ের কাছে মুখে মুখে রাময়ণ  মহাভারত শিখেছি। সত্যবাদী যুধিষ্ঠির ‘যুদ্ধের ডামাডোলের ভেতর গলার শিরা ফুলিয়ে বলেছিল অশ্বথামা হত। তারপর গলা নামিয়ে বলেছিল ইতি গজ। এই চাপাস্বরের গুরুত্ব আছে। যুদ্ধ পর্যন্ত হাত ছাড়া হয়ে গেল ওই চাপা স্বরের কেরামতিতে!”

স্নেহাংশু দেখল না কোনো বোকামো কথা বলছে না তার বন্ধুটি। সে উদ্‌গ্রীব হল। 

“ দেখ বস, আমি সারাদিন কাল টিভিতে দেখেছি বিদ্যাসাগর বইয়ের পাতা থেকে উঠে এসে চলে ফিরে বেড়াচ্ছেন। আরে  সোদপুর স্টেশন বাজারেও দেখলাম খোলা ম্যাটাডোরের উপর দাঁড়িয়ে রোদে পুড়ছেন তিনি। তাঁর হাতে ক্ষয়ে আসা লাল রঙের মলাটে  ঢাকা বর্ণ পরিচয়। তার দিকে লোকে ফুল ছুঁড়ছে। জয় বিদ্যাসাগরের জয়, ধ্বনির সাথে সাথেই উঠছে জয় কে এস সি-র জয়। লোকে তার দিকে শুধু ফুল ছুঁড়ছে  না, টাকাও ছুঁড়ছে। কত টাকা যে জমে গেল! 

“ তাতে কী হল? আমিও তো টিভিতে দেখেছি।  লোকটা খুব স্বাভাবিক অভিনয় করেছেন বিদ্যাসাগরের চরিত্রে। আর মেকআপও নিখুঁত হয়েছে। ”

“ দেখ স্নেহাংশু, আমি খানিকটা খানিকটা অভিনয় জানি , আমিও ওরকম সেজে গুঁজে দাঁড়িয়ে পড়তে পারি,  হ্যাঁ। ”

স্নেহাংশু বিস্ময় প্রকাশ ঠিক নয়, খানিকটা বিরক্ত স্বরে  বলে, “ ভোটের বাজারে বিদ্যাসাগর, রামমোহন এর দর উঠেছিল। ঊঠবেই। ওঁরা তো মহাপুরুষ। কিন্তু তাই বলে তুই! ”

বোকারামের আর্ত চোখের দিকে সুধাংশুর চোখ পড়ে যেতেই তো তো করে সে,  “ না,আমি মানে বলতে চাইছি যে প্রাতঃস্মরণীয় বলে ভোটের বাজারে ওদের প্রচারে লাগান গেছে। এর মানে এই নয় যে কেউ ভোটের প্রচারে সাজ গোজ করে দাঁড়ালে গুরুত্ব পাবে!  ”

“আমি তো তাই বলছি, রাস্তা ফাঁকা, চল পানসি বেলঘড়িয়া।”

স্নেহাংশু মাথা চুলকোয়। 

চায়ের কাপে জম্পেশ শেষ চুমু্কটি দিয়ে বোকারাম বলল, “শুধু আমাদের জনা চারেক ছেলে জোগাড় করতে হবে রে। বাদ বাকি পাবলিক দিয়ে ম্যানেজ”।

বোকারাম কথা থামায় না। সে আজ বেশ খানিক উত্তেজিত। “ বলছি কি একটা রিক্সাকে ম্যানেজ করতে পারবি ?  আর একটা চোঙাও দরকার। রিক্সার পেছনে বেঁধে নিতে হবে। ”

“ হ্যাঁ সে তো করা যাবে, কিন্তু তা দিয়ে হবেটা কী !” স্নেহাংশু-র গলায় বেশ উষ্ণতা। 

বোকারাম স্নেহাংশুর কথাকে তেমন পাত্তা না দিয়ে বলে যেতে থাকে, “ দু’টি ছেলেকে লাগবে, মানে মেয়ে হলে ভালো হয়। তা তুই আবার মেয়েমানুষ কীভাবে ম্যানেজ করবি, তা ছেলে দিয়েই হবে। ওরা দুজন, মিছিলের  

সামনে সাদা কাপড় বা গেরুয়া কাপড় যাই হোক মেলে পথ পরিক্রমা করবে। টাকা-পয়সা ওই কাপড়ের ভেতরেই পড়বে।”

“ আরে সেই থেকে ভুল-ভাল বকে যাচ্ছিস যে বড়, পেট গরম হয়েছে নাকি!” এইসব এতরবেতর কথায়  মেজাজ খারাপ হওয়া স্বাভাবিক। স্নেহাংশুর-ও হলো। 

স্নেহাংশুকে অস্বস্তির ভেতর আর রাখবেনা ভাবল বোকারাম।   চা খাওয়াও হয়ে গেছে। বোকারাম বলল, 

“ দেখ, আমার একটা ভাবনা এসেছে। তা হল, রাম নিয়ে সবাই যা খুশি করছে, আমরা একটু করতে পারব না কেন! রামবাবু নিজে তো আর লোকজনকে বলে দিচ্ছেন না, তুমি আমাকে নিয়ে করো। মানে তাঁর পারমিশনের যখন প্রয়োজন নেই, তখন আমিও রামকে ব্যাবহার করতে পারেই, আর এখানে আমার হক সব থেকে বেশি। ”

স্নেহাংশু বোকারামকে বলতে দেয়। সে বোকারামের মুখের উপর চোখ ফেলে বসে থাকে। মানে ওই ফাত্‌নার দিকে তাকিয়ে মাছ ধরতে বসার মতো। 

বোকারাম বললও। “ আমাদের পাড়ায় ঘরে ঘরে হনুমান চালিশা পড়া হয়। মঙ্গলবার নিরামিশ। মানে অধিকাংশই রামের ভক্ত। এখানে আমরা একটা  রোড শো করব । সবাই করছে। আর রাম অনুরাগী দল এটা পছন্দ করবে। তারা আমাদের সাথে থাকবে। আর খানিকটা জয়ধ্বনি দেবে। বিরোধী দলকে মুর্দাবাদ বলবে।  ”

স্নেহাংশু বলল,“ হ্যাঁ , সে ব্যাবস্থা হয়ে যাবে। কিন্তু জয়ধ্বনিটা কার নামে দেবে?” 

“ আমার নামে দেবে।” বেশ দৃপ্ত উচ্চারণ বোকারামের। 

স্নেহাংশু দেখল বোকারাম ভাট বকছে। সে গাত্রোত্থানের আয়োজন করে। মানে বোকারামকেও বাড়ি যাবার ইঙ্গিত দেয়। ।

“ আরে সবটা শুনবি তো! না শুনেই উঠে পড়ছিস যে! দেখ , আমরা এখানে যুধিষ্ঠিরের ফর্মুলাটা ফেলব। মানে আলগা উচ্চারণের কেরামতি আর কি! অশ্বত্থামা হত কথাটা লোকে শুনবে। বাকিটা শুনবে না। রিক্সার উপরে দাঁড়ানো আমার হাতে একটা পুরনো  বড় খেলনা ধনুক থাকলেও থাকতে পারে। আর তুই রিক্সার পেছনে মাইক্রোফোনে চেঁচাবি, ‘ জয় শ্রী বোকারাম’। কিন্তু বোকা শব্দটা এমন আস্তে হবে বা জড়িয়ে বলবি লোকে শুনতে পাবে না। ”

“ হ্যাঁ, তা তোর নামে জয়ধ্বনি লোকে শুনবে কেন?”

“ লোকে আমার নামে জয়ধ্বনি শুনবে না। তাদের কান অভ্যস্থ  হয়ে আছে জয় শ্রী রাম-এ। তারা বোকারাম না শুনে শুনবে জয় শ্রীরাম ।  তারা দলে দলে রিক্সার পেছনে মজা দেখতে ভিড় করবে। সামনে আমাদের ভোট, আমরা একটা বিশেষ দলের প্রচার করছি ভাববে।  এটা তাদের সমর্থকদের ভালো লাগবেই। আমার ধারণা সামনে কাপড় পাতা থাকলে টাকা পয়সা ফেলতে ভক্তরা কার্পণ্য করবে না। আর পুলিশও বকবে না।  বোকারাম ধ্বনিতে তাদের কোনো অ্যালার্জি নেই। ”

“ বেড়ে ভেবেছিস ! কিন্তু এটাতে তো তোর নাম ফাটবে, আমার কী হবে!”

“ আরে বোকারাম, আমাদেরই তো সব হবে। এ পাড়া ও পাড়ায় ডাকবে লোকজনেরা। কত কত টাকা হবে বল তো ! সব আমাদের।  মানে আমাদের দু’জনের। ”

“ ইস তুই আমাকে বোকারাম বললি! অথচ তোর বাপ-মার দেয়া  নাম বোকারাম। আর তুই আমাকে বললি! ” 

“ ওই রে, জিভ ফসকে বেরিয়ে গেছে রে! এটা হল গে স্লীপ অব টাং। তুই রাগ করিস না। ”

দুই

  কান ধরে হিড়হিড় করে টেনে নামাল একজন মহিলা। বেজায় রেগেছেন তিনি। আর রাগ হওয়াই তো স্বাভাবিক। সারাদিনের পর বাড়িতে এসে ধড়াচূড়ো ছেড়ে চান-টান করে ফ্রেস হতে হবে। কিন্তু কোথায় কী! ঘর বন্ধ। 

রোয়াকে বসে ব্যাগ থেকে ফোন বের করে ফোন করতে যাবেন, তখনই এই অদ্ভূত খবরটা দিল পাশের বাড়ির মেয়ে চম্পা। 

“ সে তুমি যারে খোঁজ করতিছ, দেখোগে যাও, তিনি রিক্সার উপরে দাঁড়ায়ে তিরধনু ছোঁড়া প্রাকটিস করছেন। আর মাইকে তার নামে জয়ধ্বনি দিতে দিতে লোকজন চলেছে। হেই ঢ্যাঙা মানুষটা ঝুঁকে পড়ে একটা হলুদ গাঁদা ফুলের মালাও গলায় পড়ে নিয়েছে গো মাসি।”

\ ভয় পেলেন ঝুমরা দেবী। তিনি পুলিশে কাজ করলেও, এত ছোটোখাট তার পরিচয়, যে অন্যরকম কিছু হলে পুলিশের হেপাজত থেকে ছাড়িয়ে আনতে কালঘাম ছুটে যাবে। ভোটের বাজার, পুলিশ হন্যে হয়ে লোক খুঁজছে ফাটকে পুরবে বলে। ইলেকশন কমিশনের নির্দেশ আছে।  আর আজকাল যা হয়েছে, কথায় কথায় উঁচু মাথাদের মাথা বিগড়ে যাচ্ছে। বসে থাকাটা নিরাপদ বোধ করলেন না তি্নি। চম্পার কাছ থেকে জেনে নিয়ে প্রায় ছুটতে ছুটতে এসে এই রেলবাজারের কাছে ধরা গেল। কোনো কথাবার্তা নয়। কান ধরে নামিয়ে নিলেন প্লেন ড্রেসের রামকে। তখনও তার হাতে খেলনা ধনুর্বাণ। 

স্নেহাংশু পরদিন গুটিগুটি পায়ে দুপুরে এসেছে। বেশ খানিকটা টাকা হয়েছে। রিক্সাওয়ালা, কাপড় ধরা ছেলেদুটো আর  মাইক ইত্যাদির খরচ দিয়েও সাতশ টাকা বেঁচে আছে। বোকারামের ভাগের সাড়ে তিনশ টাকা দিতে এসেছে। কাল তো বোকারামকে রিক্সা থেকে নামিয়ে নিয়ে চলে গেলেন ওর মা। 

জীবনের প্রথম উপার্জন। বোকারাম হাতে নিয়ে উদাস হয়ে গেল।  আকাশে রোদ ঠেলে বাবাকে খুঁজে দেখে একবার বিড়বিড় করে নিল। আর এটা করল একেবারে লর্ডসের মাঠে শচিন যেমন  করে করেছিল শত রান করার পর। মনে আছে। ঠিক সেরকম করল সে। বাবাকে কৃতজ্ঞতা জানাল। বাবা যদি নামটা না দিত, তবে কি পারত আজ!

স্নেহাংশু চলে যাবার পর সর্ষে তেল গায়ে মাথায় মেখে রাস্তার উল্টো দিকের ক্ষয়ে যাওয়া তাল গাছের গুঁড়ির ঘাটে বসে জলের ভেতর পা নাচিয়ে শব্দ তুলতে তুলতে বোকারাম মাহাত নতুন একটা প্লান ভাজতে চেষ্টা করল। উপার্জনের প্লান। নাম ভাঙানোর প্লান। 

“ কি বোকা দা, চান না করে ঘাটে বসে আছ? স্কুল খুলবে কবে?”

ইউরেকা! পেয়ে গেছি। প্রথম ঝটকায় খারাপ লেগেছিল  কথা। শেষ পর্যন্ত চম্পাও ওকে ‘বোকা’-দা বলছে! এই মেয়েটার প্রতি বোকারামের যে দুর্বলতা আছে, তা দু’বাড়ির সবাই জানে। বোকারামের মা-ও ঠিক করে রেখেছে এই পুতুল পুতুল মেয়েটিকে সময় হলে নিজের ঘরের লক্ষ্মী করে নেবেন। 

পেছন ফিরে চম্পার মুখের দিকে তাকিয়ে  টের পেল, না এই কথার ভেতর শ্লেষ নেই। খুব সরলতায় মোড়া মুখ থেকে তার নামটি ছোটো করে, আন্তরিক করে ডাক পাঠিয়েছে নবম শ্রেণীর সুন্দরী। যেমন মামা বাড়িতে প্যাংলা সরলা মাসিকে গুরুজনেরা আদর করে সরু বলে ডাকে। যেমন  স্কুলে ঘন্টা পেটানো পিয়ন,কুচকুচে কালো ঘনশ্যাম রায়কে ছাত্র শিক্ষক সকলেই ঘনা-দা বলে ডাকে। আর সে তো পড়েইছে গল্পের হবুচন্দ্র রাজা আর তার গবুচন্দ্র মন্ত্রীকে সবাই আদর করে হবু, গবু বলে । এই ডাকটা  অনেকটা সেরকম। বোকারাম নিজের খারাপ লাগাকে বাড়তে না দিয়ে ভাবনার আবিষ্কারটুকু নিয়ে বেশ পুলকিত হল।   চম্পার কথায় কোনো বাক্যব্যায় নয়। সে  ঝুপ করে লাফিয়ে পড়ল জলে। তারপর তিন ডুব দিয়েই উঠে এল। চম্পা দেখল, অন্য দিনের মতো পুকুরের শান্ত জলতল কাঁপিয়ে বোকা-দার উচ্ছ্বাস সাঁতার আজ কোনো অজ্ঞাত কারণে ডুব মেরেছে।   বোকা-দার ভেজা শরীরের চলে যাবার দিকে চোখ ফেলা ছাড়া ফলে তার অন্য কিছুই কিছুই করার ছিল না। 

 বোকারামের মাথার ভেতর তখন আইডিয়া কিলবিল করছে। সাঁতার কাটতে গিয়ে তা যদি পালিয়ে যায়!  হ্যাঁ সত্যি তো বোকারামের বোকা কথাটির সম্যক ব্যবহার করা যেতে পারে। বোকারাম দু’দিন আগেই টিভিতে দেখেছে 

এক বিদ্যাসাগরকে নিয়ে সব দলের টানাটানি। কলকাতায় বিদ্যাসাগরের মূর্তি নাকি ভেঙে গেছে। আর তাতে বাঙালিকে বর্ণ পরিচয় করানো বিদ্যাসাগরমশাই নাকি খুব চটেছেন। বোকারাম সারাদিন ধরে সব চ্যানেলে সেই খবরই দেখেছে। 

বোকারাম টিভিতে দেখেছে বিদ্যাসাগর বেশধারী এক ভদ্রলোক সকালে  রুলিং পার্টির প্রচারে অংশ নিয়ে রোড শো করেছেন। আবার দুপুরের খাবার খেয়েই  বিকেল চারটে থেকে রাত আটটা পর্যন্ত বিরোধীদের সমাবেশে মঞ্চ জুড়ে হাঁটা-চলা করে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন। অনেকেই বিদ্যাসাগর দেখার জন্য ভিড় করছে। বক্তারাও জ্যান্ত বিদ্যাসাগরকে দেখিয়ে গলায় তার সপ্তক লাগিয়ে হাততালি আদায় করছেন। 

বোকারাম এখানেই নিজেকে প্লেস করে ভাবল, হ্যাঁ হবে। রেললাইনের অন্যপাড়ে যেখানে স্নেহাংশু থাকে, সেখানে অ্যান্টি রামের লোকজনে ভর্তি। ওই পাড়ার ক্লাবের ছেলেরাও তাই। আজ সে যদি বিদ্যাসাগরের মতো ওই দিকটাতে একটু অন্য অভিনয় করে আসতে পারে তো কি এমন দোষের! আর ওই দিকটায় কিছু করলে চম্পাও জানবে না। মাকেও সে নালিশ করতে পারবে না। 

বোকারাম খুব  তাড়াতাড়ি বিউলির ডাল, ঢেরস ভাজা  আর গন্ধরাজ লেবু দিয়ে এক থালা ভাত পেটে চালান করে দিয়ে  থালা-বাসন মেজে ধুয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। সবে সকাল সাড়ে এগারো। আজ বিকেলে রামের বিরোধীদের দলের হয়ে যদি রোড শো করা যায় তবে তার নাম আবার ফাটবে। বোকারাম নামটি খানিক জনপ্রিয় হবে। ।  

স্নেহাংশু গত কালের পাওয়া সাড়ে তিনশ টাকা লুকিয়ে রেখেছে  আগরওয়ালের অঙ্ক বই-এর ভেতরে। বোকারামকে আসতে দেখে পাতা উলটে একবার দেখে নিয়ে বই বন্ধ করে দিল।  হ্যাঁ, তার পছন্দ হয়েছে 

বোকারামের প্ল্যান। খারাপ কিছু না। ধুতি  পরে তার বন্ধু খোলা ম্যাটাডোরের উপর দাঁড়িয়ে থাকবে। শুধু তার বুকের উপরে  রঙিন অক্ষরে নাম লেখা হবে। প্রথম বোকা শব্দটা বেশ বড় আর রঙিন হবে। 

বন্ধুকে বোকারাম আরো বলল, “ তুই  আমাদের কাউন্সিলর হেবোদাকে বলিস আমি রাম নাম জব্দ করার জন্য নিজের নাম ব্যবহার করে এই মিছিলে যাব, যেন কিছু মালকড়ি ছাড়ে। আমরা দু’জন তা ভাগ করে নেব। আর যেন একটা বড় ফেস্টুন, মানে  আজকাল তো খুব তাড়াতাড়ি কম্প্যুটার ড্রইং দিয়ে ফ্লেক্স বের করে দেয়া যায়, মানে বলছিলাম কি , ‘বোকারামের পদযাত্রা’ বলে একটা ফেস্টুন করলে আরো বেশি কাজে আসবে। আর আমার নামেরও প্রচার হবে। হেবোদার দলও ভোটের আগে চাঙ্গা হয়ে উঠবে। ”

কত কত লোক আর পতাকা। সরকারি দলের অনেক সুবিধা। লোক আজকাল ফোনে ফোনে জোগাড় হয়ে যায়। মুরগি কাটা তপু রোডশোর শেষে কাছে এসে একটু হাত মেলাতে চেয়ে এগিয়ে এসেছে যেমন, তেমনই অটো ইউনিয়নের নেতা কটা-জাহাঙ্গির আর তার দলবলের বুকেও ‘ বোকা রাম’ লেখা বড় বড় ব্যাচ ম্যাটাডোরের উপর দাঁড়িয়ে থেকে দেখেছে বোকারাম। তার নিজের নাম কত কত জায়গায় ছড়িয়ে গেল, এই আত্মপ্রসাদ নিয়ে ঘরে ফিরতে ফিরতে তার মনে ভয় হয় চম্পা আবার আজ দেখে ফেলেনি তো! রেললাইন টপকে তাদের পাড়ার দিকেও যে একবার ঢুকেছিল মিছিল! ওর মুখ বন্ধ রাখার একটা ব্যবস্থা করতে হবে।  না হলে মা জানতে পারলে ধোলাই বাঁধা আছে।  

দু’হাজার টাকা হাতের ময়লা ওদের। তাতেই রফা হয়েছিল। হেবো দা স্নেহাংশুকে  বলেছে, আরও একদিন বিধায়কের উপস্থিতিতে এই রেটেই কাজটা করে দিতে হবে। তা ভোটের প্রচার শেষ হবার ঠিক আগের দিন হবে। তাতে মানুষের স্মৃতিতে টাটকা থাকবে অ্যান্টি রাম ফিলিং।  ভোট দেবার সময় যেন রামের দিকে সমর্থন না যায়। যেন রামকে বোকা হিসেবে ভাবে তারা। মানুষ সবাই জানে রাম অযথা লোকের কথায় নিজের স্ত্রীকে সুইসাইড করতে 

পাঠিয়েছিল। তা সে বোকা না তো কী! রামের দলের খাপ একেবারে শেষবেলায় এসে খুলে নিতে হবে, যাতে বিরোধীরা বোকারাম কে নিয়ে কাউন্টার এটাক করার সময় না পায়। 

তিন

বেলঘড়িয়া থেকে যে রাস্তাটা তিন-চারটে বড় ঝিলকে সাথে নিয়ে উসুমপুরের দিকে এসেছে, সেইখানে দারোগাবাড়ির মোড়ে এসে বিকেলের মিঠে হাওয়ায় দু’ই বন্ধু ফুচকা খাচ্ছিল। দু’দিনে তাদের নিজেদের ট্যাঁকের অবস্থা টাঁকশালের মতো। জীবনে এত টাকার মালিক তারা আগে কখনও হতে পারেনি। দুজনের কাছেই ১৩৫০ টাকা করে আছে। দু’জনেই আজ খুচরোটা, মানে ৩৫০ টাকা করে নিয়ে বেরিয়েছে। কুড়ি টাকা করে ফুচকা খেল দুজনে। কিন্তু টাকা দিতে গেলে বিহারী ফুচকাওলা একগাল হেসে বলে ওঠে “ মাফ কিজিয়ে, ইয়ে প্যায়সা নেহি লুঙ্গা।”

বোকারামের পাঁচ ফুট সাত ইঞ্চির শরীর ঝুঁকে আসে  পাঁচ ফুটের ফুচকাওলার মুখের কাছে। আবার সে শুনতে চায়। কোনো ভুল হয়নি তো ! দশ টাকায় পাঁচটা করে, দশটা ফুচকা তো কুড়ি টাকাই। কম দিচ্ছে না তো ! সে বলে বসে, “ আমরা তো দশটা করে খেয়েছি, কুড়ি টাকাই তো হবে!”

“ আরে রাম রাম ! তা বলেছি নাকি! হিসেব ঠিক আছে , কিন্তু আপনাদের থেকে আমি পয়সা নিতে পারব না। হেবো বাবু জানলে আমাকে খুব ডেঁটে দেবে!”

বোকারামের মুখ হাঁ হয়ে আছে। তার মুখে কথা সরছে না দেখে স্নেহাংশু বলল, “ আমাদের ফুচকা খাওয়ার সাথে হেবো-দার সম্পর্ক কী?”

মুখে খইনি ছিল। একটু দূরে নালার ভেতর তা সশব্দে সমর্পণ করে এসে বোকারামের দিকে ঘাড় উঁচু করে ফুচকাওয়ালা বলল, “ আপনি এত্ত বড় নেতা, কাল আপনাকে নিয়ে মিছিল হল, আর আজকে আপনাকে আমি দু’টো ফুচকা খাওয়াতে পারব না! আরে রাম রাম! গুনাহ হয়ে যাবে আমার। আমিও তো ছিলাম কাল মিছিলে। আমিও শ্লোগান 

দিয়েছি ---  বোকা রাম জিন্দাবাদ , বোকা রাম জিন্দাবাদ ! অনেকেই দেখেছে আমাকে। কাটারুটের আটোওলা সামা আর আমি একসাথে হেঁটেছি। ” ফুচকাওয়ালা  নিজেকে পার্টির একনিষ্ঠ কর্মী বলে পরিচয় দিতে চায়। 

বোকারামের মাথায় বুদ্ধি খলবল করছে ততক্ষণে।  বুঝে গেছে। ফুচকাওয়ালার মনের ভাষা বুঝে ফেলেছে। মা ঘরে ফিরতে সেই রাত সাত- সাড়ে সাত। এখন তো সবে সাড়ে পাঁচটা। আর একটু ঘোরাঘুরি করে ফ্রেস এয়ার মাথায় নিয়ে তবে পড়তে বসবে। বলল,  “চল তো গুরু, তপুর মুরগির দোকানে। দেখি তো ! কাল তো হাত বাড়িয়ে হ্যান্ডশেক করতে গিয়েছিল। আমি হাত ধরতে দিইনি। হাতে কত রক্তের দাগ। খুনীর হাত তো! মানুষ খুন করলে খুন, আর মুরগী খুন করলে খুন নয়! খুন খুন! চল তো বস, সেখানে যাই।  ”

আগরপাড়া স্টেশনের আগে রেল-লাইনের ধারে ‘দিল হুম হুম চিকেন শপ’। ওটাই তপুর মুরগির দোকান। বেশ ভিড় থাকে। অফিস ফেরত যাত্রীরা ফেরার পথে পাঁচশ, আড়াইশ তুলে নিয়ে যায়। সকালে অফিস যাবার আগে বাজার করার সময় থাকে না।  ট্রেনের শব্দে মুরগির আর্ত চীৎকার চাপা পড়ে যায়। দুশ কুড়ি টাকা করে কিলো। 

“ কি হল তপু দা, কত করে কিলো যাচ্ছে? ”

ব্যাস্ত মানুষ। ওয়ান ম্যান আর্মি। একটা মুরগির গলা কেটে পায়ের বুড়ো আঙুলের তলায় কণ্ঠনালী চেপে রেখে তাকে ঝটপটাতে দিয়ে অন্য আরেকটির ছাল ছাড়াচ্ছিল। পালক ফেলে ফেলে পাশের লাল হয়ে যাওয়া জলের  বালতিতে হাত ডুবিয়ে হাত সাফা রাখছিল। তারপর মুরগির দু’ই হাত ও পায়ের মাঝামাঝি সে তীব্র তীক্ষ্ণ বটিতে চিরে পেটের নাড়িভুঁড়ি আবার রিসাইকেলে মাছের খাবারের জন্য সরিয়ে রেখে একবার মুখ তুলতে পেরেই চমকিত হয়ে গেল বোকারামকে দেখে। 

“ আরে হ্যাঁ হ্যাঁ এসো … মানে আসুন। কত লাগবে? একটুকু দাঁড়ান। মানে এই দু’জনকে দিয়েই আপনাকে দিচ্ছি। ”

এমনিতে তপুর বয়স বোকারামের থেকে ঢের বেশি। কিন্তু রাজনীতিতে উঁচু জায়গায় বসলে কেউ ভাই হয় না, সব দাদা। কাল ম্যাটাডোরের উপরে ছিল বোকারাম। আর তপুরা নীচে, পিছে পিছে।  তাই সে দ্রুত তুমি সম্বোধন কে আপনিতে পালটে নেয়। তাছাড়া কাল তো বোকারামের নামেই জয়ধ্বনি দিয়েছে। হেবো-দার নির্দেশে বিকেলের 

কারবার কাল লাটে উঠে ছিল। কিন্তু কিছু করার নেই। রেল লাইনের ধারে কেন, এখানে যেকোনো জায়গায় ব্যবসা করতে হলে হেবো-দাকে অসন্তুষ্ট করা চলবে না, তা সে জানে। 

খদ্দের দু’জন চলে গেলে এক মুখ হেসে তপু বলল, “ ছোটো কাটব না বড়? ছোটো খেলে ভালো । মানে ছিবড়ে হয়ে যাবে না মাংস। ”

বোকারাম মুখে একটা অপার্থিব হাসি ধরে রাখে।  মানে কাল যে হাসিটা তাকে ধরতে হয়েছিল, সেটা। মানে খানিকটা ক্যালেন্ডারের রামের মতো চাপা হাসি। অবশ্য কালকের মতো আজ আর  সারা গায়ে নীল রং নেই। ওরা বলেছিল তো দামি রং। সোদপুরের গাড়িসাড়াইওয়ালা স্প্রে করছিল। সেই বলছিল বার্জার পেইন্টিং এর দোকান থেকে দিয়েছে। চামড়ার অসুবিধে হবে না। হ্যাঁ তা খুব একটা হয়নি। রাতে তেল মেখে পুরনো কাপড় দিয়ে ডলে নিতেই উঠে গেছে। তারপর লাইফবয় সাবানে স্নান করে নিয়েছে।  

মুখের সেই হাসিটি নিয়ে সে শুধলো তপুকে, “ কত করে চলছে এখন?”

কঁক কঁক করে দু’টো ডাক দিতে না দিতেই ধড়ফড় শব্দ। আর পায়ের নীচে তেমন করে চেপে রেখে আর একটার গলায় কোপ সেরে সে বলল, “ দাম দিয়ে কী হবে গো! আমি কি তোমার কাছ থেকে, মানে আপনার কাছে থেকে দাম নেব ভেবেছেন! কাল কি আমি দেখিনি, কত জনপ্রিয় নেতা আপনি ! আপনি আমাদের অঞ্চলে থাকেন, এটাই তো আমাদের গর্বের বিষয়। টিভির লোকেরাও আপনার ফোটো তুলে নিয়ে গেছে। আর আপনাকে একটু মাংস খাওয়াতে পারব না!”

বোকারাম  তোতলাতে তোতলাতে স্নেহাংশুর দিকে দেখিয়ে বলল, “না মানে , ওর দরকার শ’ পাঁচেক, তাই-ই।”

“ আপনার বলার আগেই আমি দু’টো কেটেছি দু’জনের জন্য। আপনার ওই দীর্ঘ শরীরে নীল রং খুব মানিয়ে ছিল জানেন। একদম ক্যালেন্ডারের রামের মতো।  আপনার পাশেই আপনার বন্ধুকে কাল দেখেছি। ”

আবার তোতলায় বোকারাম। কিন্‌ন্ তু টাকা না দিয়ে কী করে নেব! বাড়িতে নিয়ে গেলে মা রাগ করবে। ”

বয়সে অনেক বড় হলেও এখন মুরগি মাংসের ব্যাপারি ছোটো হয়ে যায়। সে জানে রাজনীতির লোকেরা সব দাদা হয়। সেখানে ভাই বন্ধু তেমন চলে না। সে গলায় অনুনয় ফুটিয়ে নেয়,   “ আপনার নিজের ভাইকে কি এরকম বলতে পারতেন! একটুকু মাংস কি আমি দাদাকে ফ্রিতে খাওয়াতে পারি না!”

আর কথা চলে না। কিন্তু মা-র কাছে কী কথা বলবে বোকারাম!  ভাবতে ভাবতে বটতলার দিকে অনেকখানি এগিয়ে গিয়েছে। সবে ছটা। মা আসতে আসতে এখনও একঘন্টা। মাংসটা রান্না করতে হলে তো একটু পেঁয়াজ আর আদার দরকার। আর গরম  মশলা। বাড়ির কাছাকাছি মুদির দোকানে গিয়ে পাঁচশ পেঁয়াজ ,একশ আদা আর দুটো গরম মশলার পাউচ নিল। মনে পড়ল শুকনো লংকাও নিতে হবে। তারপর পকেট থেকে একশ টাকার নোট বের করে দিতেই বয়স্ক দোকানদার হাত জড়ো করে বলল, “ না না এটা আমি নিতে পারব না। আপনি হলেন গে ভগমান । আপনারা দেন বলে বলে আমরা খেয়ে পরে বাঁচি। আপনার কাছ থেকে দাম নিতে পারব না।” 

জব্বর করে ঝাল-টাল দিয়ে  মাংসটা রেঁধে মাকে গরম ভাত বেড়ে রাতে খাওয়ালে যে কোনো একটা ভুজুং-ভাজুং দিয়ে চালিয়ে দেয়া যাবে। অনেকটা মাংস দিয়েছে তপু।  কিছুটা পাশের বাড়ির চম্পাকেও দিয়ে আসবে। আর একবার মনে করিয়ে দেবে যেন গতকালের রাম সাজার ঘটনা না বলে মাকে। মেয়েটা বড্ড কুচুটে। সুযোগ পেলেই মাকে দিয়ে মার খাওয়ায়। বোকারাম অনেকদিন থেকে রান্না-বান্নার কাজটায় হাত পাকিয়েছে। আজ অনেকদিন বাদে বাড়িতে মাংস হচ্ছে। হাঁড়িতে চাট্টি চাল বেশি নেয়। সে নিজেও তো আজ একটু বেশি খাবে।  

চার

“ ম্যায়নে  তেরা কেয়া বিগাড়া হ্যায়! তু মেরা পিছে কিঁউ পড় গিয়া রে? ” লোকটার কাঁদো কাঁদো গলা। 

বোকারামের চেনা চেনা লাগছে লোকটাকে। কিন্তু চিনতে পারছে না। কেমন ধোঁয়া উঠছে চারদিকে, তার ভেতর দাঁড়িয়ে। লোকজন  চেনার উপায় হিসেবে জায়গার ভূমিকা থাকে। জোগ্রাফিতে পড়েছে। সে খুব চোখ ব ড় করে তাকিয়ে জায়গাটা চেনার চেষ্টা করল। কিন্তু চোখ কি বড় হচ্ছে! বুঝতে পারছে না।   এত ধোঁয়া কেন!সে ছোটবেলায় দেখেছে মা কয়লার উনুন ধরাতে যখন ঘুঁটে আর কাঠ সাজিয়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে তার উপর কয়লা চাপাত, এরকম ধোঁয়া হত। এখন তো অনেকদিন হল এই তল্লাটে সেসব আর নেই। তার চোখে পড়ছে,  গাছ-পালা, ঘর-বাড়ির অংশ। রাস্তার উপরেও নদীর মতো ধোঁয়ার স্রোত। গাড়ি-ঘোড়া, বিশেষ করে অটো চলতে দেখছে, তার কর্কশ হর্ণও কানে আসছে, কিন্তু চিনতে পারছে না কোন রাস্তা। 

ভারি বিড়ম্বনায় পড়ল বোকারাম। লোকটা তুই তোকারি করছে মানে কাছের লোক। এখন যদি নাম জানতে চাওয়া হয় তো কেলেঙ্কারির একশেষ। মানে লোকটার  আইডেন্টিটি নিয়ে প্রশ্ন তুলে দেয়া। বোকারাম জানে এই কাজটা খুবই খারাপ। সাধারণত দুষ্কৃতিদের কাছ থেকে ঘুষ খাওয়ার পর কিছুদিন বাদে পুলিশ এরকম চোখ উলটে দেয়। বারবার এরকম করায় তার বাপটাকে এক ছাট লোহার কারবারী রেগে গিয়ে দানা ঠুসে দিয়েছিল। পুলিশ নিজেদের নাম খারাপ করবে না বলে মাওবাদীদের ঘাড়ে দোষ চাপিয়েছিল। আর মাকে একটা কনস্টেবলের চাকরি দিয়েছে। 

বোকারামের কাঁচুমাচু মুখটা দেখে হয়ত লোকটার মায়া হয়েছে। বোকারামের কাছে এই একটা তুরুপের তাস আছে।  যখন কিছুতেই পরিস্থিতি নিজের দিকে আসছে না টের পায়, তখন এই অস্ত্রটি ছাড়ে। সে বোকা পাঁঠা হয়ে যায়। লোকজনের মায়া হয়। বোকারাম নিজের মুখের উপর আষাড়ের কালো মেঘ ঘনিয়ে তোলে। 

ধুর!  একটা ধনুক হাতে নিয়ে ঘুরে বেড়াছে কেন লোকটা! শহরে কোথায় খরগোস, শুয়োর পাবে! যা না, বাঁকুড়া, পুরুলিয়ার জঙ্গলে যা না। সেখানে অনেক শিকার। হরিণও পেতে পারে। হ্যাঁ, শিকারীদের মতো অবশ্য চোখটা জ্বলজ্বল করছে। একটু কি ভয় পাবে বোকারাম! যদি তির ছোঁড়ে! নিজের বুকের দিকে তাকায়। হার্ট যেখানে থাকে সেখানে হাত চাপা দিয়ে দেয়। ভাবখানা এই  হার্ট ফুটো হওয়া থেকে তো রক্ষা পাবে। ওর বাবাকেও তো বুকে গুলি করেছিল। ছ্যাঁদা হার্টে কতক্ষণ বাঁচবে! বাঁচেনি। মনে আছে অপরাধী উপরতলায় টাকা খাইয়ে বেমালুম ছাড় পেয়েছে। 

“ আরে ডরো মৎ! কব বোলা ম্যাঁয় তুমকো মার ডালে গা?” এই রে লোকটা কী করে মনের কথা টের পেল! বোকারাম স্বাভাবিক হতে চেয়ে হাত ফাত নাড়াতে চায়। কিন্তু তা কি সহজ কর্ম! হাত যেন বোকারামের কথা শুনছে না। 

“ না না , আপনার ধনুকটা তো বেশ লম্বা দেখাচ্ছে। কাঠের না স্টিলের! বেশ ভারিই হবে, না!। আমি কি তুলতে পারব! না পারব না। লম্বায় আপনার মতো হলেও, আপনার শরীর স্বাস্থ্য খুব ভালো। দেখলেই লোকে সমীহ করবে। আর আমাকে দেখুন, আমার এই প্যাংলা শরীর  দেখলে লোকে খ্যাপায়। ঢ্যাঙা ভূত বলে অনেকে।” কথা ঘোরাতে চায়। লোকটা বেশ জাঁদরেল তবে। ধরে ফেলেছে বোকারামকে। 

“ শুন, মেরে কো বহৎ চোট দিয়া তুমহে। মেরা‌ দিল টুটনেঅলা হ্যায়। ওহ বিদ্যাসাগর বাবু সে জাদা হ্যায় ইয়ে চোট। ক্যায়া বঁলু, আভি খান-পিনা কুছ কা মন নেহি লাগতা, কেবল ইয়ে দিল রোনা মাঙতা। ”

লোকটাও যখন কান্নার কথা বলছে, বোকারামের সাহস হয়। সে শুধোয়, “ আহা, কাঁদবেন কেন! আর আপনাকে জানি না শুনি না, আমি কী করে চোট পৌঁছাব!”

“ বেটা ঝুট বল না ঠিক নেহি। হওয়াই কিলে বনানে সে কোই লাভ নহীঁ। আভি তু-তু ম্যাঁয় ম্যাঁয় সে কোই ফয়দা নহীঁ। তুমহে মুঝে গালিয়াঁ দিয়া হ্যায়। ”

এবার মেজাজ হারায় বোকারাম। একেবারে মায়ের মতো লোকটা চাপ দিয়েই যাচ্ছে। মা চেপে চেপে কথা বের করে,টুথপেস্ট বের করার মতো।  সারা দিন বোকারাম বাড়িতে বসে কী করেছে জানতে চায়। একই কথা বলে রাগিয়ে দিয়ে মা সত্যি কথা বের করে ফেলে।

তা মা তো পুলিশে কাজ করে, এটা ওদের কথা বের করার একটা পদ্ধতি। কিন্তু এই লোকটা কে! এতো আর মা নয়, যে খামোকা গায়ে পড়ে কথা বলতে পারবে! আর লোকটার  কথার উত্তর দেবেই বা কেন! বোকারাম বলে ফেলে, “ আচ্ছা, সেই তখন থেকে আপনি ঘ্যান ঘ্যান করছেন, কিন্তু বলছেন না, আমি আপনার কী করেছি! কোথায় আপনার সাথে দেখা হল! আপনার নাম কী? বেশ মজার মানুষ তো আপনি!”

এটুকু বলতে পেরে স্বস্তি পায় বোকারাম । বেশ নিজের পিঠ চাপড়াবার আয়োজন করতে যাবে , লোকটা হিসহিসিয়ে ওঠে, “ তুম মেরেকো গালি নেহি দিয়া? তুম মেরা নাম পর চুনা নেহি লাগায়া? বেতমিজ ঝুটা কাঁহিকা!”

এই রাগ দেখে বোকারাম এর হাত-পা আবার ঠান্ডা। লোকটার হাতে যে ধনুক আছে। তা ছাড়া গায়ে-গতরে বেশ তাগড়াই।  

লোকটা থেমেছে বটে , কিন্তু তার থামার ভেতর থেকেও ফোঁসফোঁস শব্দ শোনা যাচ্ছে। স্কুলের মারামারির  ঘটনা মনে পড়ে বোকারামের। সেদিন মৃন্ময়ও এরকম দম মেরে ছিল খানিক। তারপর টেবলের উপর থেকে ডাস্টার তুলে নিয়ে এসে তার কপালে সজোরে মেরেছিল। রক্তে স্কুল ইউনিফর্ম থই থই। 

সে তো তো করে অবস্থা সামলানোর চেষ্টা করে, “ না আমি তো আপনাকে চিনিনা, আমি কীভাবে আপনাকে গালি-গালাজ করব!”

“বকোয়াস বন্দ্‌ করো।  ওহি তো বলনা চাহতা হুঁ। কোই জানপহচান নেহি, ফিরভি ইতনা বদনাম কাঁহে মেরা মুহ মে ফেকা ? মুঝে সচ্‌ সচ্‌ বতায়ো। ” কথায় একটু গর্জন ছিল। বোকারাম ভয় পায়।

“ না, দেখুন, আমরা স্কুলে বন্ধু-টন্ধুদের পেছনে লাগি বটে, কিন্তু তা তো আমি তাদের চিনি বলে। কিন্তু সত্যি বলছি,আপনার সাথে কোনোদিন কথা বলিনি, কোনোদিন দেখিনিও এর আগে। “ 

“ তব কাঁহে তুম কল মেরে কো বোকা বনায়া! বেতমিজ ! ”

বোকারাম আকাশ থেকে পড়ে। এই লোকটার সাথে দেখাই হয়নি। তবে কি সেই নেকড়ে আর ভেড়ার গল্পের মতো! নেকড়ে ঝর্ণার উপরের দিকে দাঁড়িয়ে নীচের পাহাড়ের খাঁজে জল পান উদ্যত ভেড়াকে বলেছিল, তুই আমার জল নোংড়া করেছি্স, তোকে আমি ছাড়ব না। ভেড়া হাতজোর করে বলেছে, প্রভূ জল তো আপনার কাছ থেকে আমার কাছে আসছে, আমি কীভাবে নোংড়া করবো! নেকড়ে বলেছে আজ না কাল করেছিলি। প্রভূ আমি তো কাল আসিনি। নেকড়ে ভেড়ার উপর ঝাঁপ দিতে দিতে বলে তুই করিসনি তোর পূর্বপুরুষের কেউ করেছিল। সেরকম আজ এই লোকটা তাকে তিরবিদ্ধ করে ছাড়বে মনে হচ্ছে বোকারামের। সে বোঝানোর চেষ্টা করে।  গলার স্বরে জোর কমে এসেছে। বলে, “ দেখুন হয়ত কোথাও ভুল হচ্ছে, আমার সাথে এর আগে আপনার দেখাই হয়নি। ”

“ হম ভি ওহি বাত বোল রহা হুঁ। এতনা বড়া ইনজাম তু কিঁউ লাগায়া! জানতা নেহি, একবার ইনজাম লাগনে সে সিবিআই ছোড়তা নেহি !”

লোকটা ধনুক-এ হাত দিচ্ছে দেখে  একবার শেষ চেষ্টা করে বোকারাম। বলে, “ কিন্তু আমি কী বলেছি বলুন তো! আর আপনি প্রমাণ দিতে পারবেন আমি বলেছি কিছু আপনাকে? ”

“ পুরা মহল্লা জানতা।  সব আদমি লোগোকে সামনে তু মেরেকো বোকা বনায়া। মেরে কো বোলা বোকা

 রাম !”

 লেখকের নাম ও ঠিকানা---  তাপস রায় ।। ৫৫৩, পি মজুমদার রোড কলকাতা-৭৮ ।। ৯৪৩৩০৮৭৮৫৬।। raytapas_anjana@yahoo.co.in