'বজরঙ্গি ভাইজান' ছবিতে পাকিস্তানে গিয়ে 'জয় শ্রীরাম' ধ্বনির প্রচার করে করে এসেছিলেন গল্পের নায়ক হনুমান ভক্ত সলমন খান ওরফে বজরঙ্গি। তার জন্য অবশ্য তাঁকে বিস্তর কাঠখড় পোড়াতে হয়েছিল। মজা করে অনেকেই বলছেন, বাংলায় জয় শ্রীরাম-কে বিখ্যাত করার জন্য অত পরিশ্রমও করতে হয়নি বিজেপি-কে। মাত্র মাসখানেকের মধ্যেই বাংলায় মুখে মুখে ফিরছে জয় শ্রীরাম। তা সে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে হোক নয়তো নিতান্ত সাদামাটা আড্ডায়। কাউকে ঠুকে কিছু বলতে হলেই মুখে চলে আসছে জয় শ্রীরাম।  

এ রাজ্যে বিজেপি, আরএসএস সাড়ম্বরে রাম নবমী পালনের পরেও মুখে মুখে জয় শ্রীরাম সেভাবে শোনা যায়নি। কিন্তু মে মাসের শুরুতে ভোট প্রচারে মেদিনীপুরে গিয়ে সেই যে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় জয় শ্রীরাম শুনে গাড়ি থেকে নেমে তেড়ে গেলেন, তার পরেই রাতারাতি ছবিটা বদলে গেল। হাতের কাছেই যে মমতাকে বিব্রত করার এমন শব্দব্রহ্ম ছিল, তা বুঝতে এতটুকুও দেরি করলেন না মোদী, অমিত শাহরা। বৃহস্পতিবার নৈহাটিতে মুখ্যমন্ত্রীর কনভয় লক্ষ্য করে কয়েক মিনিটের ব্যবধানে দু' বার জয় শ্রীরাম স্লোগান ওঠার পর স্পষ্ট, আপাতত মেরুকরণের রাজনীতির আরও ফায়দা নিতে জয় শ্রীরামেই ভরসা  রাখবে গেরুয়া শিবির। বিভিন্ন জেলায় এই জয় শ্রীরাম স্লোগানকে ঘিরেই রাজনৈতিক সংঘর্ষ বাঁধছে। জয় শ্রীরামের তির থেকে বাদ যাচ্ছেন না রাজ্যের মন্ত্রীরাও। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা অবশ্য এর জন্য মমতাকেই অনেকাংশে দায়ী করছেন। তাঁরা বলছেন, প্রথম দু'- একবার যদি মুখ্যমন্ত্রী জয় শ্রীরাম স্লোগানকে উপেক্ষা করতেন, তাহলেই জল এতদূর গড়াতো না। 

বাংলায় বিজেপি-র এবারের উত্থানের সঙ্গে অনেকেই বছর দশেক আগে তৃণমূলের ক্ষমতা দখলের মিল খুঁজে পাচ্ছেন। ২০০৯- এর মতো এ বারও বিধানসভা ভোটের ঠিক দু' বছর আগে বাংলায় বিপুল জনসমর্থন পেয়ে শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেসের সংগঠনে কাঁপুনি ধরিয়ে দিয়েছে গেরুয়া শিবির। ২০২১-এ বাংলা দখলের হুমকি দিচ্ছে তাঁরা। আর এখানেই জয় শ্রীরাম স্লোগানের সূত্র ধরে আরও একটি মিল খুঁজে পাচ্ছে রাজনৈতিক মহল। এখন যেমন জয় শ্রীরাম ঝড় তুলেছে, বছর দশেক আগে ঠিক একই ভাবে বাংলার রাজনীতিতে ব্যাপক প্রভাব ফেলেছিল তৃণমূলের স্লোগান মা-মাটি-মানুষ। যে স্লোগান আজও ব্যবহার করে তৃণমূল কংগ্রেস। জমি আন্দোলন করে ব্যাপক সাড়া পাওয়া তৃণমূলের মা-মাটি-মানুষ যেভাবে বাংলার সরকার পরিবর্তনে বড় ভূমিকা নিয়েছিল, সেই একই প্রভাব ফেলতে পারবে জয় শ্রীরাম?

রাজনৈতিক বিশ্লেষক এবং রাষ্ট্র বিজ্ঞানের অধ্যাপক বিশ্বনাথ চক্রবর্তী বলছেন, "জয় শ্রীরাম ইতিমধ্যেই সেরকম জায়গায় চলে গিয়েছে। রাজনীতির বাইরের আলোচনাতেও এই স্লোগান উঠে আসছে। আর এর ব্যবহার যত বাড়বে, তত মেরুকরণের রাজনীতির ফায়দা পাবে বিজেপি। মুখ্যমন্ত্রী যদি এই স্লোগানকে উপেক্ষা করতে পারতেন, তাহলে এমনিতেই তার ব্যবহার বন্ধ হয়ে যেত। উল্টে উনি বিজেপি-আরএসএসের পাতা ফাঁদে পা দিলেন।"

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো অভিজ্ঞ এবং দুঁদে রাজনীতিবিদ কী করে বিজেপি-র হাতে এতবড় অস্ত্র তুলে দিলেন তা ভেবেই বিস্মিত বিশ্বনাথবাবু। তবে শুধু জয় শ্রীরাম স্লোগানে বিরক্ত হওয়া নয়, রাজনৈতিকভাবে মুখ্যমন্ত্রী আরও ভুল করছেন বলেই মত অভিজ্ঞ এই রাজনৈতিক বিশ্লেষকের। বিশ্বনাথবাবুর কথায়, "আরএসএস যেটা চাইছে, সেই ভুলই করছেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি যদি আরএসএস, বিশ্ব হিন্দু পরিষদের মাঠে গিয়ে খেলতে চান, তাহলে দশ গোল খাবেন। অথচ সেটাই তিনি করছেন। আরএসএসের মতো সংগঠনের মোকাবিলায় আজাদ হিন্দ বাহিনী, বঙ্গ জননীর মতো বাহিনী তৈরি করছেন। তার থেকে যদি মুখ্যমন্ত্রী আত্মসমীক্ষা করে এর নিজের অসাম্প্রদায়িক ভাবমূর্তি গড়ে তুলতে পারতেন, তাতে তৃণমূলেরই ভাল হতো।" বিশ্বনাথবাবু মনে করছেন, মমতা যেভাবে জয় শ্রীরাম শুনে রেগে যাচ্ছেন, তাতে হিন্দু ভোটারদের কাছে বিরূপ ধারণা যেতে বাধ্য। জয় শ্রীরাম বলা নিয়ে বাঙালি- অবাঙালি বিভেদ করেও নৈহাটিতে মমতা আরও ভুল করেছেন বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা। আবার যেভাবে তিনি আরএসএস-এর কায়দায় হিন্দুত্ববাদী সংগঠন গড়ার চেষ্টা করছেন, তাতে পরবর্তী ভোটগুলিতে সংখ্যালঘু ভোটাররাও মমতার থেকে মুখ ফেরাতে পারে বলে মনে করছেন কেউ কেউ। 

জয় শ্রীরাম নিয়ে চর্চা যতই বাড়ুক না কেন, তাকে আমল দিতে নারাজ তৃণমূলের নেতারা। শনিবার কাঁচরাপাড়ায় দলীয় বৈঠক করতে গিয়ে এই জয় শ্রীরাম স্লোগান শুনতে হয়েছে খাদ্যমন্ত্রী জ্যোতিপ্রিয় মল্লিককেও। তাঁর দাবি, ধর্মীয় উস্কানি দিতেই জয় শ্রীরামকে রাজনীতিতে ব্যবহার করছে বিজেপি। এর দীর্ঘমেয়াদি কোনও প্রভাব পড়বে না বলেই আশাবাদী জ্যোতিপ্রিয়বাবু। তাঁর কথায়, "মা-মাটি-মানুষ ছিল রাজনৈতিক স্লোগান। জয় শ্রীরাম তার ধারেকাছে আসবে না। ধর্মীয় উস্কানিকে মানুষ বেশি দিন মেনে নেবে না।"

জ্যোতিপ্রিয় মল্লিক যাই বলুন না কেন, সদ্য বিজেপি-তে যোগদান করা বীজপুরের বিধায়ক শুভ্রাংশু রায়ের দাবি, জয় শ্রীরামই এখন হিট। তাঁর কথায়, " জ্যোতিপ্রিয় মল্লিক যা বলেছেন, সেটা তাঁর ব্যক্তিগত মতামত। জয় শ্রীরাম এখন মানুষের স্লোগান হয়ে উঠেছে। এখন এটাই চলছে।"

জয় শ্রীরামের রাজনৈতিক প্রভাব কতটা পড়বে, তা ভবিষ্যৎই বলবে। কিন্তু মুখ্যমন্ত্রী প্রতিক্রিয়াই যে জয় শ্রীরাম নিয়ে আমজনতাকে বেশি আগ্রহী করে তুলেছে, বাস, ট্রামের আলোচনা আর সোশ্যাল মিডিয়ার মিম দেখলেই তা স্পষ্ট হয়ে যাচ্ছে। রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অযথা জয় শ্রীরামে কান না দিয়ে বরং আত্মসমীক্ষার পথে হাঁটলে ভাল করতেন মুখ্যমন্ত্রী। অধ্যাপক বিশ্বনাথ চক্রবর্তীর কথায়, পঞ্চায়েতে ভোট না দিতে পারার জন্য আম জনতার রাগ প্রশমন করা, দলীয় নেতাদের দুর্নীতি-দাদাগিরি বন্ধে উদ্যোগী হওয়া, আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতির হাল ফেরাতে করা পদক্ষেপ করলেই বিজেপি-র উত্থানের মোকাবিলা মমতা সহজে করতে পারতেন। এর সঙ্গে সরকারি উন্নয়নমূলক প্রকল্পগুলির আরও প্রচার এবং মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে পারলেই জয় শ্রীরাম নিয়ে মমতাকে মাথা ঘামাতে হত না বলেই মত বিশ্বনাথবাবুর।