২০০৬ সালে বিধানসভা ভোটের বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য বলেছিলেন, 'আমরা ২৩৫ ওঁরা ৩৫। কী করবে ওরা!' এই আত্মবিশ্বাসের চুনকালি মাখাতে মানুষ সময় নিয়ে ছিল মাত্র ৫ বছর। ভূপতিত হওয়ার আগে সিপিএম সরকারের মেয়াদ ছিল ৩৪ বছর। আর মসনদে বসার মাত্র ৮  বছরের মধ্যেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নৌকা টলোমলো।  কেউ মাঝপথেই নৌকা থেকে নেমে গেছেন, কাউকে আবার নৌকায় তুলে মহা বিপদে পড়েছেন মমতা। মুখে বলছেন 'অল লুজার আর নট লুজারস'। কিন্তু মুখ্যমন্ত্রীর নিজেও জানেন  আগুনে হাত রেখেছেন তিনি।  কোন পথে সিঁদ কাটছে তস্কর, মমতা কি রাখতে পারলেন তার হিসেব?  রাখলে কি এমন দুর্দিন দেখতে হতো? দীনেশ ত্রিবেদীর মত যোগ্য সাংসদকেও যখন উপড়ে ফেলে দিচ্ছে মানুষ, তখন বুঝতে হবে পার্টি নয় মমতাকেই 'ভিলেন' বানিয়েছে সাধারণ মানুষ। তৃণমূল বিরোধী সমস্ত ভোটই আসলে 'মমতা বিরোধী ভোট'। কিন্তু কেন?

তোষণের তাস

ক্ষমতায় আসার আগে থেকেই রাজ্যের ২৭ শতাংশ মুসলিম ভোটকে পাখির চোখ করেছিলেন মমতা। এই ভোটব্যাঙ্ক যেনতেনপ্রকারেণ হাতে রাখার জন্য তোষণের কোন সুযোগই ছাড়েননি। তবে দারিদ্র, বেকারত্ব, কুশিক্ষা, এসবের বিরুদ্ধে মুসলিম জনসমাজকে এগিয়ে নিয়ে আসা নয় বরং ধর্মগুরুর সঙ্গে সরাসরি দিল্লাগির সম্পর্ক তৈরি করেন মমতা। ইফতারে 'বেগম মমতা' সেজে যাওয়া, ইমাম ভাতা চালু করা, ইমামের অঙ্গুলিহেলন মেনে নেওয়া এইসবের মধ্য দিয়ে ক্রমেই বার্গেনিং-এর সম্পর্কের দিকে গেছেন মমতা। অথচ তিন তালাক নামক নামক প্রথাটির বিরুদ্ধে একটিও শব্দ করতে দেখা যায়নি তাঁকে। অর্থাৎ খুব পরিষ্কার রক্ষণশীল মুসলমান সমাজকে ভোটব্যাঙ্ক ভেবে বসে ছিলেন মমতা। তাতে তিনি খেপিয়ে তুলেছেন এক বিরাট সংখ্যক জনতাকে। হিন্দুরা ক্ষমতার হাত ধরতে চেয়েছে। এমন কি যদি গরিব মুসলমানও তৃণমূলের বিপক্ষে ভোট দেন, তবে তার কারণ তৈরি করেছেন মমতা নিজেই।


'শ্রী' বনাম চাকরি

মমতার দ্বিতীয় ভুল তাঁর পাইয়ে দেওয়ার রাজনীতি। কন্যাশ্রী, রূপশ্রী, যুবশ্রী সমস্ত প্রকল্প খুবই ইতিবাচক কিন্তু তা দিনের শেষে পাইয়ে দেওয়া ব্যতীত আর কিছুই নয়। অথচ এসএসসির মতো বিষয়ে তাঁর মুখে রা নেই। দুর্নীতির চরম সীমায় পৌঁছেছে শিক্ষক নিয়োগের মতো স্বাভাবিক যোগ্যতাভিত্তিক বিষয়টি। বিচারপতিকে এসএসসির চেয়ারম্যানকে বলতে হয়েছে, ‘‘মেধাতালিকা প্রকাশ করেছেন তো মামলাকারীদের তা জানাননি কেন? ২৪ ঘণ্টার মধ্যে মেধাতালিকা দাখিল না করলে আদালত অবমাননার দায়ে আপনাকে জেলে পাঠাব।’’

লুকোচুরির খেলা

সারদা কাণ্ডে রাজীব কুমারকে বাঁচাতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের যে নজিরবিহীন তৎপরতাতাও  খুব স্বাভাবিক ভাবে মানুষ  নেয়নি। সিঙ্গুরে কৃষকের জমির অধিকার রক্ষার জন্য অনশন আর একজন সম্ভাব্য অপরাধী যিনি প্রায় তিন হাজার কোটি টাকার দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত তাকে বাঁচাতে মমতা বন্দোপাধ্যায়ের নজিরবিহীন তৎপরতা মানুষের মনে  নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।

পাহাড়-জঙ্গল হাসছে না

পাহাড় হাসছে, জঙ্গল হাসছে, পোস্টার পড়েছে, ফ্লেক্স পড়েছে। মমতা নিজেও ছোটাছুটি কম করেননি। কিন্তু পাহাড়ের মন বুঝতে পারেননি মমতা। এই উন্নয়নই যদি জনতার দাবি হয়ে থাকে তবে দ্বিতীয় দফার ক্ষমতাকালের মাঝখানেও গোর্খাল্যান্ড পাহাড়ে সমান 'হটটপিক' কেন? বিমল গুরুংকে ধরতে কেন ব্যর্থ মমতা? একজন প্রায় বহিরাগত রাজু বিস্ত কীভাবে সুবিধে করেন পাহাড়ে? প্রসঙ্গত পাহাড়ে হ্যাট্রিক করল বিজেপি। অন্য দিকে জঙ্গলমহলেও আদিবাসীদের স্বাধিকার, আত্মপরিচয় দিতে সমর্থ হননি মমতা, করেছেন 'ভিজিবেল ডেভলপমেন্ট'। 

পঞ্চায়েতে পতন

সিপিএম-এর পতনের শুরুটা ছিল পঞ্চায়েতে। মমতারও তাই। হানিমুন পিরিয়ডেও মমতার ক্যাডাররা পঞ্চায়েত ভোট নিয়ে জুলুমবাজি করছে, ভোট মেটার পরে পুরুলিয়া থেকে এসেছে বোর্ড গঠনে বাধা দেওয়ার অভিযোগও। আজ বামেদের যে ব্যাপক পরিমাণ ভোট বিজেপিতে গিয়েছে, তার একটা বড় কারণ হল গ্রামগঞ্জে এই জনতাকে  'টার্গেট' বানিয়ে বয়কট করেছে তৃণমূল, অস্তিত্ব রক্ষার্থে, বা বলা ভাল কাঁটা দিয়ে কাঁটা তুলতেও বিজেপিকেই বেছে নিয়েছেন তাঁরা।

আপাতত ভোটপর্ব শেষ। পাঁচ বছরের জন্যে দেশের ভার ৫৬ ইঞ্চির ছাতিতে। নরেন্দ্র মোদী ভরা জনাসভায় বলেছিলেন ৪০ জন বিধায়ক তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ রাখে। এক হ্যাঁচকা টানে পায়ের তলার অনেকটা মাটি খুইয়ে মমতা নিশ্চয়ই আজ জানেন, যা রটে তাঁর কিছু ঘটেই। আর যদি না জেনে থাকেন, খুব শিগগির তিনি আবিষ্কার করবেন, মাঝ সমুদ্রে ডিঙি নৌকায় তিনি একা।