বাংলা চলচ্চিত্র প্রযোজক সংগঠন ইমপা-তে তীব্র সংঘাত শুরু হয়েছে। বিরোধীপক্ষ সংগঠনের সভাপতি পিয়া সেনগুপ্তের পদত্যাগ দাবি করে রাজনীতিমুক্ত ইন্ডাস্ট্রির ডাক দিয়েছে।
বাংলা চলচ্চিত্র জগতে এবার প্রকাশ্যে এল তীব্র সংঘাত। সোমবার ভোটের ফল প্রকাশের পর থেকেই প্রযোজক সংগঠন ইমপা-কে ঘিরে শুরু হয়েছে চাপানউতর। বিরোধীপক্ষের প্রযোজকদের দাবি, সংগঠনের সভাপতির পদ থেকে অবিলম্বে সরে দাঁড়াতে হবে পিয়া সেনগুপ্তকে। তাঁদের অভিযোগ, ইমপা-কে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করতে হবে এবং সংগঠনে জরুরি নির্বাচন করাতে হবে।
বুধবার দিনভর উত্তপ্ত পরিস্থিতির পর বিরোধীপক্ষ স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, শুধু গঙ্গাজল ছিটিয়ে প্রতীকী ‘শুদ্ধিকরণ’ নয়, পিয়া সেনগুপ্ত পদত্যাগ না করা পর্যন্ত প্রকৃত পরিবর্তন সম্ভব নয়।
বিরোধীপক্ষের অন্যতম মুখ তথা পরিবেশক ও হলমালিক শতদীপ সাহা জানিয়েছেন, শুক্রবার উভয় পক্ষের প্রতিনিধিদের নিয়ে বৈঠক হবে। সেখানে ১২ জন করে মোট ২৪ জন সদস্য উপস্থিত থাকবেন। তবে তাঁদের মূল দাবি একটাই— পিয়া সেনগুপ্তের পদত্যাগ।
শতদীপ বলেন,
“আমরা সংগঠনকে তৃণমূল কংগ্রেসমুক্ত করতে চাই। বিনোদনদুনিয়া রাজনীতিমুক্ত হোক, এটাই আমাদের লক্ষ্য।”
বিরোধীপক্ষের অভিযোগ, বহিরাগতদের নিয়ে অবৈধভাবে নির্বাচন করিয়ে সভাপতি পদে বসেছেন পিয়া সেনগুপ্ত। যদিও সেই অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছেন তিনি।
বুধবার কার্যনির্বাহী সদস্যদের নিয়ে বৈঠকের পর পিয়া বলেন,
“কলকাতা হাই কোর্টের পর্যবেক্ষণে ইমপা-র নির্বাচন হয়েছিল। প্রচুর সদস্য ভোট দিতে এসেছিলেন। আমাদের কাছে তার ফুটেজ রয়েছে।”
তাঁর দাবি, উচ্চ আদালতের নির্দেশ মেনে বৈধ সদস্যদের তালিকা তৈরি হয়েছিল এবং সমস্ত প্রমাণপত্র যাচাই করেই নির্বাচন সম্পন্ন করা হয়। ফলে ‘বহিরাগত তত্ত্ব’ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন বলেই দাবি করেন তিনি।
পাল্টা বিরোধীপক্ষের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগও তুলেছেন পিয়া সেনগুপ্ত। তাঁর বক্তব্য, মঙ্গলবার থেকে তাঁকে মানসিকভাবে হেনস্থা করা হচ্ছে এবং অকথ্য ভাষায় আক্রমণ করা হচ্ছে।
তিনি অভিযোগ করেন,
“গায়ের জোরে পদত্যাগ দাবি করা হচ্ছে। এতে সংগঠনের অফিসের শান্তি নষ্ট হচ্ছে।”
এছাড়াও সংগঠনের সদস্য শরৎ মুখোপাধ্যায়কে শারীরিকভাবে নিগ্রহ করা হয়েছে বলেও অভিযোগ ওঠে।
পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠায় ইমপা-র পক্ষ থেকে ব্যাঙ্কশাল আদালতে সংগঠনের অফিস ও আশপাশে ১৪৪ ধারা জারির আবেদন করা হয়। পরে আদালতের নির্দেশে বৌবাজার থানার পুলিশ ও আধাসামরিক বাহিনী এলাকায় মোতায়েন করা হয়। জারি হয় ১৬৩ ধারা (সাবেক ১৪৪ ধারা)।
আদালতের তরফে স্পষ্ট নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, অফিস চত্বরে কোনও ধরনের অশান্তি করা যাবে না।
পিয়া সেনগুপ্তের বিরুদ্ধে আরও অভিযোগ ওঠে পরিচালক জয়ব্রত দাসের ছবি ‘দ্য অ্যাকাডেমি অফ ফাইন আর্টস’-এর মুক্তির জন্য আট লক্ষ টাকা দাবি করার।
এই অভিযোগের জবাবে পিয়া জানান, ছবির সঙ্গে যুক্ত কলাকুশলীদের প্রাপ্য অর্থ নিশ্চিত করতেই ওই টাকা ফেডারেশনের হাতে জমা দিতে বলা হয়েছিল।
তাঁর বক্তব্য,
“ছবিটি মুক্তি পেলে প্রযোজক ব্যবসা করবেন। তা হলে কলাকুশলীরা কেন বঞ্চিত থাকবেন?”
পিয়া আরও দাবি করেন, পরে নাকি বিরোধীপক্ষের প্রতিনিধি শতদীপ সাহা ফেডারেশনের সঙ্গে বৈঠক করে ১২ লক্ষ টাকা সংগঠনের হাতে তুলে দেন। ফলে তাঁর বিরুদ্ধে টাকা নেওয়ার অভিযোগ ‘মিথ্যা’ বলেই দাবি করেছেন তিনি।
বুধবার রাত পর্যন্ত দফায় দফায় বৈঠক চলে পুলিশ, বিশেষ অপরাধ দমন শাখা, ইমপা নেতৃত্ব এবং বিরোধীপক্ষের প্রতিনিধিদের মধ্যে। বৈঠক শেষে শতদীপ সাহা দাবি করেন,
“আলোচনায় আমাদের নৈতিক জয় হয়েছে।”
তিনি আরও বলেন, ভবিষ্যতে ইন্ডাস্ট্রিতে কোনও রাজনৈতিক ‘নিষেধাজ্ঞা সংস্কৃতি’ চলবে না এবং কর্মক্ষেত্রে রাজনীতি করার প্রবণতারও অবসান ঘটানো হবে।
সম্ভাব্য নতুন সভাপতি কে হতে পারেন, সেই প্রশ্নে অবশ্য স্পষ্ট কোনও নাম বলতে চাননি শতদীপ। বরং রসিকতার সুরে তিনি বলেন,
“প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর মতো ইনিও তো গদি ছাড়তে চাইছেন না! এখনই কী করে বলি, কাকে সভাপতি করা হবে?”
তবে গোটা ঘটনাকে কেন্দ্র করে বাংলা চলচ্চিত্র জগতে এখন চরম অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। রাজনৈতিক পালাবদলের আবহে ইন্ডাস্ট্রির ভবিষ্যৎ কোন দিকে মোড় নেয়, এখন সেদিকেই নজর সকলের।
